ঢাকা ১২:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

গণভোটে আগ্রহ নেই দলগুলোর

মহিউদ্দিন তুষার, সিনিয়র রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ২৪০ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

২৪-এ গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্র সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংস্কারের লক্ষ্যে একাধিক কমিশন গঠন করে। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা এমন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কমিশনগুলো ধারাবাহিকভাবে সুপারিশ তৈরি করে। এই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করতে সরকার হ্যাঁ-না গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী সরকার বাধ্য থাকবে। অন্যদিকে ‘না’ ভোটে জয়ী হলে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। রাজধানী ঢাকাসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, গণসংযোগ, মিছিল ও সভা-সমাবেশে মুখর হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। তবে এই নির্বাচনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হ্যাঁ-না গণভোট বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায় তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রয়েছে প্রার্থী পরিচিতি, স্থানীয় উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি, অতীত সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা তুলে ধরা এবং ভোটারদের মন জয় করার কৌশলে। গণভোট কিংবা রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নটি অধিকাংশ দলের প্রচারণায় প্রায় অনুপস্থিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট ইস্যুতে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া অনেক দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কাই তাদের নীরবতার প্রধান কারণ। সংস্কার প্রশ্নে দলগুলোর ভেতরেই রয়েছে মতভেদ ও দ্বিধা। কোনো কোনো সংস্কার প্রস্তাব ভবিষ্যতে দলীয় রাজনীতির ক্ষমতা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিলে ভোটের অঙ্কে প্রভাব পড়তে পারে এই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকেই বিষয়টি পিছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এই নীরবতার ভিড়েও ব্যতিক্রম হিসেবে সামনে এসেছে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি প্রকাশ্যেই গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের সভা-সমাবেশে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, গণভোটের তাৎপর্য এবং জনগণের ম্যান্ডেটের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। দলটির নেতারা বলছেন, সংস্কার ছাড়া নতুন বাংলাদেশের কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার টেকসই হবে না বলেও তারা মত দেন।

সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দিতে নয়, বরং জনগণের মতামতকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে আনতেই নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় ভোটাররা সরকার গঠন এবং রাষ্ট্র সংস্কার—দুই বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে গণভোট নিয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। নগর এলাকার অনেক ভোটার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও বিস্তারিত ব্যাখ্যার অভাবের কথা বলছেন। এক নগর ভোটার বলেন, আমরা সংস্কার চাই, কিন্তু কোন সংস্কার কীভাবে হবে তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। গ্রামাঞ্চলের ভোটারদের একাংশের মতে, নির্বাচনী আলোচনায় সংসদ ও সরকার গঠনই মুখ্য হয়ে থাকায় গণভোটের বিষয়টি তাদের কাছে এখনও অস্পষ্ট।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণভোট একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তারা সতর্ক করে বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণভোটকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে জনগণের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অধিকাংশ দলের নেতারা সরাসরি প্রচারে না যাওয়ার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কৌশলগত বাস্তবতার কথা বলে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনই এখন জনগণের কাছে মুখ্য বিষয়। তাদের মতে, ভোটারদের মূল আগ্রহ সরকার গঠন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। গণভোট ইস্যুটি তুলনামূলকভাবে জটিল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হওয়ায় প্রচারের কেন্দ্রে আনা কঠিন।

একটি বড় দলের শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের অগ্রাধিকার সংসদে যাওয়ার লড়াই। গণভোট নিয়ে আলাদা প্রচারে গেলে মূল নির্বাচনী বার্তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মধ্যম ও ছোট দলগুলোর মতামত, কিছু মধ্যম ও ছোট দলের নেতারা বলছেন, তারা গণভোটের বিরোধিতা করছেন না, তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও নির্দেশনা প্রয়োজন। তাদের দাবি, জনগণের কাছে সংস্কারের বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন না হলে প্রচার চালানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

একটি ছোট দলের নেতারা বলেন, সংস্কার দরকার এতে আমরা একমত। কিন্তু কোন সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা পরিষ্কার না হলে আমরা কীভাবে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে বলব? বিরোধী ধারার কয়েকটি দল মনে করছে, গণভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাড়তি বাধ্যবাধকতা আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, জনগণের নির্বাচিত সংসদই সংস্কার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখে। একজন বিরোধী দলের নেতা বলেন, গণভোটের নামে নির্বাচিত সরকারের হাত বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা হলে সেটি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে হ্যাঁ-না গণভোট একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অনাগ্রহে তা অনেকটাই ছায়ার আড়ালে রয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জনগণ কতটা সচেতনভাবে এই প্রশ্নে ভোট দেবেন, সেটিই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ পথ। একদিকে ক্ষমতার লড়াই, অন্যদিকে রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত— এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় ভোটের দিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় রচিত হওয়ার অপেক্ষায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

গণভোটে আগ্রহ নেই দলগুলোর

আপডেট সময় :

২৪-এ গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্র সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এই সরকার রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংস্কারের লক্ষ্যে একাধিক কমিশন গঠন করে। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা এমন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কমিশনগুলো ধারাবাহিকভাবে সুপারিশ তৈরি করে। এই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করতে সরকার হ্যাঁ-না গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী সরকার বাধ্য থাকবে। অন্যদিকে ‘না’ ভোটে জয়ী হলে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী উত্তাপ। রাজধানী ঢাকাসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, গণসংযোগ, মিছিল ও সভা-সমাবেশে মুখর হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। তবে এই নির্বাচনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হ্যাঁ-না গণভোট বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায় তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রয়েছে প্রার্থী পরিচিতি, স্থানীয় উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি, অতীত সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা তুলে ধরা এবং ভোটারদের মন জয় করার কৌশলে। গণভোট কিংবা রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নটি অধিকাংশ দলের প্রচারণায় প্রায় অনুপস্থিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোট ইস্যুতে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া অনেক দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এই আশঙ্কাই তাদের নীরবতার প্রধান কারণ। সংস্কার প্রশ্নে দলগুলোর ভেতরেই রয়েছে মতভেদ ও দ্বিধা। কোনো কোনো সংস্কার প্রস্তাব ভবিষ্যতে দলীয় রাজনীতির ক্ষমতা কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিলে ভোটের অঙ্কে প্রভাব পড়তে পারে এই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকেই বিষয়টি পিছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এই নীরবতার ভিড়েও ব্যতিক্রম হিসেবে সামনে এসেছে ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি প্রকাশ্যেই গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের সভা-সমাবেশে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, গণভোটের তাৎপর্য এবং জনগণের ম্যান্ডেটের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। দলটির নেতারা বলছেন, সংস্কার ছাড়া নতুন বাংলাদেশের কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার টেকসই হবে না বলেও তারা মত দেন।

সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দিতে নয়, বরং জনগণের মতামতকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে আনতেই নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় ভোটাররা সরকার গঠন এবং রাষ্ট্র সংস্কার—দুই বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে গণভোট নিয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। নগর এলাকার অনেক ভোটার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও বিস্তারিত ব্যাখ্যার অভাবের কথা বলছেন। এক নগর ভোটার বলেন, আমরা সংস্কার চাই, কিন্তু কোন সংস্কার কীভাবে হবে তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। গ্রামাঞ্চলের ভোটারদের একাংশের মতে, নির্বাচনী আলোচনায় সংসদ ও সরকার গঠনই মুখ্য হয়ে থাকায় গণভোটের বিষয়টি তাদের কাছে এখনও অস্পষ্ট।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণভোট একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তারা সতর্ক করে বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণভোটকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে জনগণের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও অধিকাংশ দলের নেতারা সরাসরি প্রচারে না যাওয়ার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কৌশলগত বাস্তবতার কথা বলে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, সংসদ নির্বাচনই এখন জনগণের কাছে মুখ্য বিষয়। তাদের মতে, ভোটারদের মূল আগ্রহ সরকার গঠন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। গণভোট ইস্যুটি তুলনামূলকভাবে জটিল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হওয়ায় প্রচারের কেন্দ্রে আনা কঠিন।

একটি বড় দলের শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের অগ্রাধিকার সংসদে যাওয়ার লড়াই। গণভোট নিয়ে আলাদা প্রচারে গেলে মূল নির্বাচনী বার্তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মধ্যম ও ছোট দলগুলোর মতামত, কিছু মধ্যম ও ছোট দলের নেতারা বলছেন, তারা গণভোটের বিরোধিতা করছেন না, তবে বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও নির্দেশনা প্রয়োজন। তাদের দাবি, জনগণের কাছে সংস্কারের বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন না হলে প্রচার চালানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

একটি ছোট দলের নেতারা বলেন, সংস্কার দরকার এতে আমরা একমত। কিন্তু কোন সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা পরিষ্কার না হলে আমরা কীভাবে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে বলব? বিরোধী ধারার কয়েকটি দল মনে করছে, গণভোটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বাড়তি বাধ্যবাধকতা আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, জনগণের নির্বাচিত সংসদই সংস্কার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখে। একজন বিরোধী দলের নেতা বলেন, গণভোটের নামে নির্বাচিত সরকারের হাত বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা হলে সেটি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে হ্যাঁ-না গণভোট একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অনাগ্রহে তা অনেকটাই ছায়ার আড়ালে রয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জনগণ কতটা সচেতনভাবে এই প্রশ্নে ভোট দেবেন, সেটিই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ পথ। একদিকে ক্ষমতার লড়াই, অন্যদিকে রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত— এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় ভোটের দিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় রচিত হওয়ার অপেক্ষায়।