সরকার বলছে সংকট নেই, বাস্তবে ভোগান্তি
চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী
- আপডেট সময় : ২৮ বার পড়া হয়েছে
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই সরকারের এমন আশ্বাসের মধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত বিক্রি, আবার কোথাও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা। সরবরাহের অস্বাভাবিকতা ও ভোক্তাদের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এক ধরনের অঘোষিত সংকট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগেও কয়েকবার জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে দেশ। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের বৈশ্বিক তেল সংকটের সময় আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বড় ধরনের চাপে পড়ে। পরবর্তীতে ২০০৭-০৮ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে দেশেও সরবরাহ ও মূল্য সংকট দেখা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২২ সালেও ডলার সংকট ও বৈশ্বিক দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় বাড়ানো হয়, যা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। তবে এখন পর্যন্ত পাম্পগুলোতে তেলের দাম বাড়ানো না হলেও খুচরা বাজারে বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিল, তেজগাঁও, মগবাজার, রাজারবাগসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাম্পেই তেলের সরবরাহ সীমিত। কোথাও শুধু ডিজেল মিলছে, কোথাও আবার অকটেন-পেট্রোল পুরোপুরি বন্ধ। মতিঝিলে দুপুরে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও একেকটি মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা এবং প্রাইভেটকারে ১৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হানিফ মাহমুদ বলেন, কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। শেষে বাইক ঠেলে এখানে এসে দাঁড়িয়েছি। একই অবস্থা তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা এলাকায়। সীমিত বিক্রির কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকরা। অন্যদিকে মগবাজারের একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ, শুধু ডিজেল মিলছে। কর্মচারীরা জানান, ঈদের আগেই পেট্রোল-অকটেন শেষ হয়ে গেছে। মিরপুর থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরেছেন মোটরসাইকেল চালক সুমন।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অনেকেই তেল আসার আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন দীর্ঘ সময়। কোথাও কোথাও মোটরসাইকেলে তেল দেওয়ার পর পুনরায় লাইনে দাঁড়ানো ঠেকাতে চাকায় রং দিয়ে চিহ্নিত করার ঘটনাও ঘটছে।
শুধু রাজধানী নয়, জেলার চিত্রও একই। শরীয়তপুরে ১০টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৭টিতেই শনিবার সকাল থেকে তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, সরবরাহ এলে বিক্রি শুরু করা হবে। জামালপুরে তেল মজুত থাকার অভিযোগে ক্ষুব্ধ বাইকাররা মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ হাজার ৮০০ লিটার তেল মজুত পাওয়া যায়। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক মুদিদোকানির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩৭০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। জানা গেছে, তিনি ৯টি গ্যালনে তেল মজুত করে রেখেছিলেন। বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ও গোয়ালঘরে তেল মজুত করার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
সিলেটে মোটরসাইকেলে তেল বিক্রিতে নতুন শর্ত আরোপ করেছে পুলিশ। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলে তেল দেওয়া যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে কোথাও কোথাও নির্ধারিত মজুত থাকা সত্ত্বেও তেল বিক্রি না করায় জরিমানা করা হয়েছে। একটি ঘটনায় ২ হাজার ৫০০ লিটার তেল বিক্রি না করায় প্রায় অর্ধলাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে অনেকেই কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তুলছেন। ভোক্তাদের দাবি, কিছু অসাধু চক্র মজুতদারি করে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। সরকার এক ধরনের বক্তব্য দিলেও পাম্প মালিকদের অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, কিছু অসাধু চক্র অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। মোটরসাইকেলের ট্যাংকে অতিরিক্ত তেল নিয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগও তোলেন তিনি। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও দাবি করেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে এবং জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারি সূত্রগুলো জানায়, দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানির চাহিদা রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি পুরোপুরি সংকট না হলেও চাপের মধ্যে রয়েছে। তারা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনও স্থিতিশীল থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভরতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশীয় বাজারে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের জ্বালানি ডিপোগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি ঠেকাতে ভিজিল্যান্স টিম কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার লিটার তেল জব্দ করা হচ্ছে। এছাড়া পেট্রোল পাম্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যারা তেল উত্তোলন, মজুদ ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করবেন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে তথ্যদাতাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দিয়েছে সরকার। সরকার সংকট অস্বীকার করলেও মাঠপর্যায়ে ভোগান্তি কমেনি। সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না হলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।























