সিলেটে ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ, বিদ্যুতের অপচয়
- আপডেট সময় : ৬২ বার পড়া হয়েছে
# অপচয়ে লোডশেডিং, অসহায় বিদ্যুৎ বিভাগ ও গ্রাহক
নিষিদ্ধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টমটম (ইজিবাইক) ব্যাটারি চার্জে বিদ্যুতের অপচয়ে সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগ ও গ্রাহকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নগরীর অলিগলি-পাড়ামহল্লায় গোপনে গড়ে উঠা ব্যাটারি চার্জের গ্যারেজ থাকায় বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ গ্রাহকদের অভিযোগ- এই ব্যাটারি চার্জে প্রতিদিন যেমন বিদ্যুৎ অপচয় হয় তেমনি বিদ্যুৎ বিভাগের বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়। এছাড়া গ্যারেজ মালিকরা বাসা-বাড়ি দেখিয়ে যে লোড নিয়ে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ করেন। সেখানে চার্জের সময় তারা কিছু বিদ্যুৎ কর্মকর্তা ও কিছু পুলিশকে ম্যাসেজ করে বাণিজ্যিকভাবে চার্জে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন গ্যারেজ মালিকরা। ফলে গ্রাহকরা যেমন লোডশেডিংয়ে পড়তে হচ্ছে অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগ হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতিটি ব্যাটারি চার্জের গ্যারেজ এলাকায় হচ্ছে নিয়মিত লোডশেডিং। এসব গচ্ছা যাওয়া বিদ্যুতের ইউনিট পরবর্তীতে গ্রাহকদের বেশী ইউনিট ব্যবহার করা হয়েছে দেখিয়ে বাড়তি বিলও দেওয়া হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিভাগ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে অন্যদিকে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রতিমাসে গুণতে হচ্ছে বাড়তি বিলের টাকা। এসব অবৈধ গ্যারেজের কারনে কিছু বিদ্যুৎ কর্মকর্তার কারসাজিতে জিন্মি হয়ে পড়েছেন বিদ্যৎ গ্রাহকরা। যেন দেখার কেউ নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টমটম (ইজিবাইক) নামে পরিচিত এই যানগুলো মূলত ব্যাটারির মাধ্যমে চালিত হয়ে থাকে এবং চার্জে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। যা বর্তমানে জাতীয় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিলেট মহানগরীতে গড়ে প্রায় ৩০ হাজারের অধিক ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা রয়েছে। প্রত্যেকটি রিকশায় রয়েছে ৪টি ব্যাটারি যা চার্জ দিতে প্রচুর বিদ্যুতের অপচয় হয়। একটি ব্যাটারি চালিত রিকশা চার্জ দিতে চালককে গুনতে হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ও লোডশেডিং হলে ২০০ টাকা এবং বিদ্যুৎ খরচ হয় ১০ থেকে ১২ ইউনিট। সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং সিস্টেম গ্যারেজ করা হয়েছে। তারমধ্যে- সিলেট মহানগরীর আখালিয়া, নেহারীপাড়া, নয়াবাজার, কালিবাড়ি, মদিনা মার্কেট, বাগবাড়ি, কানিশাইল, শেখঘাট, কলাপাড়া, দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের কদমতলী (তৃতীয় তলা মসজিদ গলির কাউছার মিয়ার গ্যারেজ), কদতলী (ফেরিঘাট সুরমা নদীরপাড়ের সুজন মিয়ার গ্যারেজ), আলমপুর (লামারগাঁও পয়েন্টে আলম মিয়ার ২টি গ্যারেজ), গোটারটিকর (খান বাড়ি রোডের পাইপ ফ্যাক্টরীর পাশের মনোহর মিয়ার বড় গ্যারেজ), শাহজালাল উপশহর, তেররতন, সৈদানিবাগ, সবুজবাগ, শিবগঞ্জ, লামাপাড়া, শাহী ঈদগাহ, রায়নগর, মেজরটিলা ও ইসলামপুর এলাকা প্রচুর প্রচলিত। এই এলাকাগুলোতে ৪-৫টি করে বৈধ ও অবৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে। যেখানে প্রত্যেকটি গ্যারেজে প্রতিদিন ১০০-১৫০টি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চার্জ করা হয়। একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় চার্জ দিতে ১০ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়।
নগরীর বিভিন্ন স্থানে গড়েউঠা চার্জিং স্টেশন ঘুরে জানা গেছে, প্রতিটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা দৈনিক ৬-৮ ঘণ্টা চার্জে থাকে এবং একেকটি চার্জিং সেশনে ব্যয় হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ। নগরীতে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেখানে প্রত্যেকটি চার্জিং স্টেশনে প্রতিদিন ১০০-১৫০টি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চার্জ করা হয়। একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় চার্জ দিতে যদি গড়ে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয় তাহলে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার চার্জে। এর মানে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে কেবল এইসব অটোরিকশা চালাতে। যা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে একপ্রকার বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরীতে একজন ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালকের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, তিনি কদমতলী এলাকার একটি গ্যারেজে তার রিকশা চার্জ দেন। প্রতিদিন তিনি রাত্রে গাড়ি নিয়ে চার্জে দেন এবং ভোরে নিয়ে আসেন। তার এই গাড়ি একবার ফুল চার্জ দিতে গ্যারেজের মালিককে দিতে হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। আবার কখনও কখনও লোডশেডিং হলে তখন ২০০ টাকা পর্যন্ত গাড়ি চার্জে গুনতে হয়। তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন ওই গ্যারেজে আনুমানিক ১৫০টির মতো গাড়ি চার্জ করা হয়।
অন্য একজন বৈধ প্যাডেল চালিত রিকশা চালক বলেন, ব্যাটারি চালিত রিকশার জন্য প্রতিদিন নানা দুর্ঘটনা ঘটে। তারা দেখে না দেখে হুটহাট গাড়ি এই রাস্তা থেকে ওই রাস্তায় নিয়ে যায়। কোনো সিগন্যাল ছাড়া যেখানে-সেখানে লোকজন রিকশায় তুলেন। তাদের জন্য নগরীতে দীর্ঘ জ্যামের সৃষ্টি হয়। তাছাড়াও তাদের গাড়ি চার্জ করতে হয় যার জন্য প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। ক্ষোভ নিয়ে তিনি আরো বলেন, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার গ্যারেজের কোনো বৈধতা নেই। তারা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে সেটা কিছু বিদ্যুৎ কর্মকর্তার যোগসাজসে মেইন লাইন থেকে সংযোগ দিয়ে ব্যবহার করছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। দ্রুত এই ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও টমটমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ বলে তিনি মনে করেন।
সিলেট বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার (চঃ দাঃ) মো. আব্দুর রশীদ জানান, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের যে স্টেশনগুলো রয়েছে সেগুলো মহানগরীর ভেতরে পিডিবির আওয়তাধীন পড়ে। তাছাড়া এই চার্জিং স্টেশনের জন্য আমাদের নির্ধারিত লোডের বাইরে বিদ্যুৎ চাপ পড়ছে। এতে অন্য খাতে বিদ্যুৎ বিতরণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমাদের কাছে তো কোনো অভিযোগ আসে না তাই আমরাও এই বিষয়ে অবগত নই। তবে এখন আমরা এই বিষয়টির খোঁজ খবর নেওয় হবে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি মিডিয়া (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মহানগরীতে ব্যাপকহারে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটম বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন মোড়ে অভিযান পরিচালনা করছে। প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫টি নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও টমটমকে জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কখনও কখনও এই অটোরিকশাগুলো রেকার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন- নিষিদ্ধ যানবাহন আইনে একটি নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশাকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে রেকার করা হলে রেকার বিল ২৫০০ টাকা পরিশোধ করে রিকশা ছাড়িয়ে নেওয়া হলোও এখন আর এসব যান ছাড়া হচ্ছে না। তিনি আরোও বলেন, পুলিশ যখন অভিযান পরিচালনা করে তখন অবৈধ এসব যানবাহন চলাচল অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে যায় কিন্তু পরবর্তীতে আবার সেই পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে। মহানগরীর ভেতরে অবৈধ নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকসহ ব্যাটারি চার্জের গ্যারেজেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।












