গলার কাটা বিদ্রোহী প্রার্থী
- আপডেট সময় : ২৮ বার পড়া হয়েছে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অমান্য করে একাধিক আসনে দলের প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। এতে একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে ভোটের সমীকরণে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।
বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী দিয়েছে ২৯২টি আসনে এবং জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে ৮টি আসন। এই ২৯২ জন প্রার্থীর মধ্যে আবার বিভিন্ন দল থেকে আসা ৬ জন নেতাকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ৮২টি আসনে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে নামেন। পরবর্তীতে ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপির দুই বিদ্রোহী, নাটোর-১ আসনে দুই বিদ্রোহী এবং শেরপুর-৩ ও কুমিল্লা-৯ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলীয় প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এছাড়া রংপুর-৩ আসনের এক বিদ্রোহী প্রার্থী কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। এসব বাদ দিয়েও বর্তমানে ৭৮টি আসনে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয় রয়েছেন। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ায় ৯৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর নাম ও প্রতীকই ব্যালটে থাকছে।
দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় অনেক আসনে নব্য, বিগত দিনের সুবিধাভোগী, আন্দোলন-সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় এমনকি প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও জনপ্রিয় নেতারা বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি ক্ষুব্ধ ও জনপ্রিয় স্থানীয় নেতারাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। দল থেকে একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি, এমনকি সর্বোচ্চ সাংগঠনিক শাস্তি বহিষ্কার করেও অনেক বিদ্রোহী প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরানো যায়নি।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে বিদ্রোহীদের দ্বন্দ্ব সরাসরি বিএনপির ভোটব্যাংককে বিভক্ত করছে। ঢাকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। মনোনয়ন না পেলেও তৃণমূলের বড় অংশ তাদের পাশে থাকায় ধানের শীষের প্রার্থীদের জন্য লড়াই কঠিন হয়ে উঠেছে।
দেখা যায়, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মলের বিপক্ষে চাপ তৈরি করেছেন দুই বিদ্রোহী-স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খায়রুল হক শিমুল ও ব্যারিস্টার রেজাউল করিম। বহিষ্কৃত হলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় অংশ তাদের পাশে থাকায় ভোটের সমীকরণ জটিল হয়েছে। সাতক্ষীরা-৩ আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ডা. মো. শহিদুল ইসলাম। সেখানে বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য কাজী আলাউদ্দিন। পটুয়াখালী-৩ আসনে জোট চুক্তি অনুযায়ী বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। সেখানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রার্থী হলেও বিএনপির বিদ্রোহী হাসান মামুন নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন রুমিন ফারহানা। এই আসনটি জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা কামরুজ্জামান রতন দলীয় প্রার্থী হলেও একই আসনে জেলা বিএনপির সদস্য-সচিব মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে শেখ মো. আব্দুল্লাহ দলীয় মনোনয়ন পেলেও মোমিন আলী ও মীর শরাফত আলী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ ও ১৬, সিলেট-৫, নাটোর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ময়মনসিংহের একাধিক আসন, জয়পুরহাট-২, মাদারীপুর-১, হবিগঞ্জ-১, নারায়ণগঞ্জ-২, ৩ ও ৪, গোপালগঞ্জ-২, বাগেরহাট-২, ঝালকাঠি-১, চাঁদপুর-২, টাঙ্গাইল-১ ও ২ আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয়।
বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছেন। এখানে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংকের বড় অংশ বিদ্রোহীদের দিকে ঝুঁকতে পারে। বরিশাল বিভাগের কয়েকটি আসনে বিদ্রোহীরা কিংমেকার ভূমিকা রাখতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এক বিদ্রোহী প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি দলের জন্য বহু বছর কাজ করেছি। এলাকায় আমার গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু মনোনয়নের সময় সেই বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি। তাই জনগণের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছেন। নির্বাচন শেষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে একই সঙ্গে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছু আসনে সমঝোতার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে-বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তিতে ১১ দলের জোট ও জামায়াতে ইসলামী কতটা সুবিধা পাবে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভোট বিভক্ত হলে বিরোধী শক্তিগুলো পরোক্ষভাবে লাভবান হতে পারে, বিশেষ করে যেসব আসনে জামায়াত বা জোটের প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন দলের জন্য বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ। শেষ মুহূর্তের সমঝোতা, ভোটের হিসাব ও মাঠের বাস্তবতার ওপর নির্ভর করবে এর প্রভাব। তবে এটুকু নিশ্চিত-বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে এবারের নির্বাচনী পথে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ যে অনেক বেশি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
















