ঢাকা ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

জয়পুরহাটে আলুর বাম্পার ফলনেও হতাশা, আশার বাণী শুনালেন প্রতিমন্ত্রী

এম.এ.জলিল রানা, জয়পুরহাট
  • আপডেট সময় : ৩৯ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জয়পুরহাটে আলুর বাম্পার ফলনের মুখেও হতাশায় চাষিরা, আশার বাণী শুনালেন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। রমজানের শুরু থেকেই জয়পুরহাটের দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠে ধুম পড়েছে আলু তোলার। নারী কিষাণ-কিষাণীরা যেন ফসলী মাটির বুক চিরে বের কনে আনছে আলু। প্রতি শতকে বিভিন্ন জাতের আলুতে ফলন হচ্ছে চার থেকে সাড়ে চার মণ। কিন্তু বাজারে আলুর দাম না থাকায় আলু চাষিরা চোখে মুখে যেন সরিষার ফুল দেখছে। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে এক রকম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ জেলার আলুর চাষিরা। দিন যতই গড়াচ্ছে, বাজারে আলুর দর পতন ততই হচ্ছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, বিঘাপ্রতি মোটা অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে চাষিদের। ভালো ফলনের মুখেও দামের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় কৃষি বিভাগও।
সরেজমিন বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, জমি থেকে আলু তোলার পরিপক্ক বয়স হওয়ায় চাষিরা আলু তুলছেন, কিন্তু দাম কম হওয়ায় বিক্রি না করে এসব আলু রাস্তার দু’পাশে স্তূপ করে রাখছেন। বিক্রির করতে গেলেই তাদের নি:শ্বাস যেন ভারী হয়ে আসছে।
আলু চাষিদের তথ্যমতে, চলতি রবি চাষাবাদ মৌসুমে প্রতি বিঘায় আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানি, ও শ্রমিক খরচ সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে যে বাজার দর যা তাতে করে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। এ অবস্থায় বিঘা প্রতি তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকারও বেশি।
স্থানীয় বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সাদা জাতের ডায়মন্ড আলু এবং লাল স্টিক জাতের প্রতি মণ (৪০ কেজি) আলু ২০০ থেকে ২২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর গ্যানোলা জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা। সিন্ডিকেট নাকি চাহিদার অভাব, ঠিক কী কারণে এই আকস্মিক দরপতন, তা নিয়ে চাষিদের মনে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। চাষিরা বলছেন, সরকারিভাবে আলু রফতানি করা গেলে এমন বিপর্যয়ের মুখে হয়তো পড়তে হতো না তাদের।
জেলার কালাই উপজেলার সড়াইল মাঠে নারী কিষাণীদের নিয়ে আলু তুলছেন আলু চাষি সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, কয়েকদিন আগেও প্রতি মণ আলু ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছি। আর আজ সেই আলুই ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এসময় আলুর দাম বেশি থাকার কথা,কারণ হিমাগারগুলোতে আলু কিনছেন। অথচ দাম আরও এইন কমেই যাচ্ছে। আমরা চাষিরা এখন কোথায় যাবো ?
এইক মাঠেই আরেক আলু চাষি আব্দুল লতিফ বলেন,‘বর্তমান সরকারকে আমাদের মতো চাষিদের কথা চিন্তা করে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে চাষিদের চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে আর এভাবে লোকসান চলতে থাকলে পথে বসতে আমাদের আর খুব বেশি সময় লাগবে না।
সবজি রফতানিকারক আব্দুল বাসেদ জানান, বিগত বছরগুলোতে প্রচুর পরিমাণ আলু রফতানি করা হলেও এবার এখনও শুরুই হয়নি। অন্যান্য সবিজ রপ্তানি করা হলেও আলু রফতানি নেই বললেই চলে। আর এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গত দুই বছর আগে রফতানিতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হলেও এবার তা কমে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, এর ফলে রফতানি কম হচ্ছে।
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ারুল হক বলছেন, সরকার যদি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে , তবে এখানে নতু নতুন অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এতে করে আলু বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হবে এবং চাষিরাও লোকসানের হাত থেকে বাঁচবেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন,‘এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষাবাদ হয়েছে। এ জেলায় যদি আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায় তাহলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনি অন্যদিকে চাষিরা আলুর ন্যায্যমূল্য পাবেন। আর এতে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে।
আলুর ন্যায্যমূল্য ও বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে উল্লেখ করে জয়পুরহাট-১ আসনের সাংসদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেছেন, কৃষক যেন আলুর ন্যায্যমূল্য পায় ও আলুর বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে চাষিরা যাতে স্বস্তিতে থাকতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও উত্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ দ্রুতই এর স্থায়ী সমাধান করা হবে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি-২০২৬) জেলার কালাই উপজেলা মডেল মসজিদ মিলনায়তনে উপজেলা বিএনপি আয়োজিত নেতাকর্মীদের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

জয়পুরহাটে আলুর বাম্পার ফলনেও হতাশা, আশার বাণী শুনালেন প্রতিমন্ত্রী

আপডেট সময় :

জয়পুরহাটে আলুর বাম্পার ফলনের মুখেও হতাশায় চাষিরা, আশার বাণী শুনালেন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। রমজানের শুরু থেকেই জয়পুরহাটের দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠে ধুম পড়েছে আলু তোলার। নারী কিষাণ-কিষাণীরা যেন ফসলী মাটির বুক চিরে বের কনে আনছে আলু। প্রতি শতকে বিভিন্ন জাতের আলুতে ফলন হচ্ছে চার থেকে সাড়ে চার মণ। কিন্তু বাজারে আলুর দাম না থাকায় আলু চাষিরা চোখে মুখে যেন সরিষার ফুল দেখছে। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে এক রকম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ জেলার আলুর চাষিরা। দিন যতই গড়াচ্ছে, বাজারে আলুর দর পতন ততই হচ্ছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, বিঘাপ্রতি মোটা অঙ্কের লোকসান গুণতে হচ্ছে চাষিদের। ভালো ফলনের মুখেও দামের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় কৃষি বিভাগও।
সরেজমিন বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, জমি থেকে আলু তোলার পরিপক্ক বয়স হওয়ায় চাষিরা আলু তুলছেন, কিন্তু দাম কম হওয়ায় বিক্রি না করে এসব আলু রাস্তার দু’পাশে স্তূপ করে রাখছেন। বিক্রির করতে গেলেই তাদের নি:শ্বাস যেন ভারী হয়ে আসছে।
আলু চাষিদের তথ্যমতে, চলতি রবি চাষাবাদ মৌসুমে প্রতি বিঘায় আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানি, ও শ্রমিক খরচ সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে যে বাজার দর যা তাতে করে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। এ অবস্থায় বিঘা প্রতি তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকারও বেশি।
স্থানীয় বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সাদা জাতের ডায়মন্ড আলু এবং লাল স্টিক জাতের প্রতি মণ (৪০ কেজি) আলু ২০০ থেকে ২২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর গ্যানোলা জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা। সিন্ডিকেট নাকি চাহিদার অভাব, ঠিক কী কারণে এই আকস্মিক দরপতন, তা নিয়ে চাষিদের মনে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। চাষিরা বলছেন, সরকারিভাবে আলু রফতানি করা গেলে এমন বিপর্যয়ের মুখে হয়তো পড়তে হতো না তাদের।
জেলার কালাই উপজেলার সড়াইল মাঠে নারী কিষাণীদের নিয়ে আলু তুলছেন আলু চাষি সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, কয়েকদিন আগেও প্রতি মণ আলু ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছি। আর আজ সেই আলুই ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এসময় আলুর দাম বেশি থাকার কথা,কারণ হিমাগারগুলোতে আলু কিনছেন। অথচ দাম আরও এইন কমেই যাচ্ছে। আমরা চাষিরা এখন কোথায় যাবো ?
এইক মাঠেই আরেক আলু চাষি আব্দুল লতিফ বলেন,‘বর্তমান সরকারকে আমাদের মতো চাষিদের কথা চিন্তা করে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে চাষিদের চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে আর এভাবে লোকসান চলতে থাকলে পথে বসতে আমাদের আর খুব বেশি সময় লাগবে না।
সবজি রফতানিকারক আব্দুল বাসেদ জানান, বিগত বছরগুলোতে প্রচুর পরিমাণ আলু রফতানি করা হলেও এবার এখনও শুরুই হয়নি। অন্যান্য সবিজ রপ্তানি করা হলেও আলু রফতানি নেই বললেই চলে। আর এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গত দুই বছর আগে রফতানিতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হলেও এবার তা কমে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, এর ফলে রফতানি কম হচ্ছে।
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ারুল হক বলছেন, সরকার যদি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে , তবে এখানে নতু নতুন অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এতে করে আলু বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হবে এবং চাষিরাও লোকসানের হাত থেকে বাঁচবেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন,‘এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষাবাদ হয়েছে। এ জেলায় যদি আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায় তাহলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনি অন্যদিকে চাষিরা আলুর ন্যায্যমূল্য পাবেন। আর এতে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে।
আলুর ন্যায্যমূল্য ও বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে উল্লেখ করে জয়পুরহাট-১ আসনের সাংসদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেছেন, কৃষক যেন আলুর ন্যায্যমূল্য পায় ও আলুর বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে চাষিরা যাতে স্বস্তিতে থাকতে পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েও উত্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ দ্রুতই এর স্থায়ী সমাধান করা হবে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি-২০২৬) জেলার কালাই উপজেলা মডেল মসজিদ মিলনায়তনে উপজেলা বিএনপি আয়োজিত নেতাকর্মীদের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।