পুরনো ধাঁচেই প্রশাসন
- আপডেট সময় : ১৩০ বার পড়া হয়েছে
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা। ক্ষমতার পালাবদলের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে দলীয় আনুগত্যের ছায়া দূর হবে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আসবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের ভেতরে পুরনো বাস্তবতা প্রায় অপরিবর্তিতই থেকে গেছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বারবার ঘোষণা দেয়, তারা দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনকে জনগণের সেবামুখী ও নিরপেক্ষ কাঠামোয় ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার দুই-তিন মাস পার হতে না হতেই পদায়ন, বদলি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক সামনে আসে। প্রশাসনের উচ্চ ও মধ্যপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা আগের মতোই রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে সমালোচিত হচ্ছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে সরকার কি আদৌ প্রশাসনিক সংস্কারে আন্তরিক, নাকি সময়ক্ষেপণের কৌশল নিচ্ছে?
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো জবাবদিহি। অথচ বর্তমানে সেই জবাবদিহির কাঠামো কার্যকরভাবে দৃশ্যমান নয়। বিভিন্ন দপ্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কেন নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা মিলছে না। প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। এতে প্রশাসনের ভেতরে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
এ সময় পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোখলেসুর রহমানের পদায়ন ও বদলি নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর একাধিক দায়িত্ব পরিবর্তন এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে এমন অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) পর্যায়ের নিয়োগ ও বদলিকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বড় পরিসরে ডিসি বদলির ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কিছু জেলায় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের দায়িত্বে রাখা হয়েছে, যা নির্বাচনী পরিবেশের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করছে পারে।
এছাড়া পদায়ন ও বদলিতে ‘ট্রান্সফার ট্রেডিং’বা প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি ফের সক্রিয় হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী পদে বদলি বা বহাল থাকার পেছনে নীতিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও লবিং বেশি কার্যকর হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্বচ্ছ তদন্ত বা ব্যাখ্যা এখনো সামনে আসেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়েও প্রশাসনে সচিব পদোন্নতিতে আবারো ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। গত ১৬ বছর প্রশাসনে যেসব কর্মকর্তা আওয়ামীপন্থি হিসেবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারে আমলে অনুগত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, এসব কর্মকর্তা বর্তমান সরকারে সময়ে ভোল পাল্টে আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারে এমন রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত এক বছর ১৫ মাসে প্রশাসনজুড়ে ফ্যাসিবাদী আমলাদের জয়জয়কার। আবার বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা বঞ্চিত ছিলেন এসব কর্মকর্তা বঞ্চিত থাকছেন। আবার বঞ্চিত অনেককেই বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে পদোন্নতির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের অবস্থান শক্ত করা হচ্ছে। এতে করে যোগ্য কর্মকর্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। মেধার অগ্রভাবে থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ পড়াটা প্রশাসনে বার্তা দিচ্ছে যে, সম্পর্কই এখন দক্ষতার চেয়ে বড়। যোগ্যতা-ভিত্তিক প্রশাসন গড়তে হলে এমন পদক্ষেপ উল্টো ফল দেবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে প্রশাসনে এই পদোন্নতি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক আবারো প্রমাণ করেছে।
পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে প্রশাসনের ভেতরে হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি হয়। যোগ্য কর্মকর্তারা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করেন, আর এতে রাষ্ট্রীয় সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার এই জায়গায় একটি নিরপেক্ষ ও নীতিভিত্তিক কাঠামো দাঁড় করাতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই মনে করছেন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। শুধু ব্যক্তিবিশেষের বদলি বা রদবদল দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কার সম্ভব নয় এই বাস্তবতা নতুন নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, যেখানে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও মূল্যায়নের একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এখনো এমন কোনো দৃশ্যমান কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে পুরনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি বহাল থাকছে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল এই প্রবণতায় ছেদ পড়বে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক কর্মকর্তা আগের মতোই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতার বদলে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাচ্ছে এমন অভিযোগে প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে। ক্ষমতা গ্রহণের সময় অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অন্যতম ছিল একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির ফারাক দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক চাপ থেকে প্রশাসনকে মুক্ত রাখার কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও সংকটে পড়বে। কারণ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসন অপরিহার্য। এখনই যদি কাঠামোগত সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল কেবল আরেকটি ব্যর্থ অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারে।




















