ঢাকা ০২:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন, বদলে যাচ্ছে প্রচারের ধরণ

প্রচারযুদ্ধ শুরু আজ

মহিউদ্দিন তুষার, সিনিয়র রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ৫১৭ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর গতকাল বুধবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রতীক হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মাঠে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। ইসির ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ভিন্ন ব্যালটে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, স্বচ্ছ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে দেশের প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি প্রার্থী বৈধ তালিকায় রয়েছেন। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। তবে নিবন্ধিত আটটি দল এবারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। এছাড়া আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্যমতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভাগভিত্তিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে ব্যাপক প্রতিযোগিতার চিত্র উঠে এসেছে। দেশের আটটি বিভাগে বিভিন্ন সংখ্যক আসনে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে ৩৩টি সংসদীয় আসনে মোট ২৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। রাজশাহী বিভাগে ৩৯টি আসনে ১৯৮ জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে ২৪টি আসনে ১৩৭ জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে মোট ৭০টি আসনে ৫৫৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, যা সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। অপরদিকে, খুলনা বিভাগে ৩৬টি আসনে ২০০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া, সিলেট বিভাগে ১৯টি আসনে ৯৪ জন প্রার্থী, বরিশাল বিভাগে ২১টি আসনে ১২৪ জন প্রার্থী এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টি আসনে ৪১২ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভাগভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে তীব্র হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের আসনগুলোতে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোটের লড়াই আরও জমজমাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, শহরকেন্দ্রিক আসনগুলোতে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি হবে।

প্রতীক বরাদ্দের পরপরই মাঠে নামবেন প্রার্থীরা। কেউ এলাকায় গণসংযোগ করবেন, কেউ উঠান বৈঠক ও পথসভা আয়োজন। ঢাকার একটি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, প্রতীক পাওয়ার পরই আমাদের কর্মীরা এলাকায় নেমে পড়েছে। মানুষের কাছে গিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছি।

রাজশাহীর এক প্রার্থী জানান, ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও তারা প্রার্থীদের কর্মসূচি ও অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা চান। তিনি বলেন, মানুষ এখন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব কাজ দেখতে চায়। কে এলাকার জন্য কী করেছে সেটাই ভোটের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ঢাকার মিরপুর এলাকার ভোটার রেহানা বেগম বলেন, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। যাকে ভোট দেব, সে যেন এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করে।

চট্টগ্রামের এক তরুণ ভোটার ইমরান হোসেন বলেন, চাকরির সুযোগ, প্রযুক্তি শিক্ষা ও উদ্যোক্তা সহায়তা আমাদের প্রধান চাওয়া। প্রার্থীরা যদি এসব নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা দেয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। গ্রামীণ এলাকার ভোটাররাও কৃষি, সেচব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চান বলে জানিয়েছেন।

সাধারণ মানুষ নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দিচ্ছেন। বরিশালের এক ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন,
নির্বাচন যেন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়, সেটাই সবচেয়ে জরুরি। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে। সিলেটের এক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই তরুণবান্ধব নীতি ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ। সংসদে এমন প্রতিনিধি দরকার যারা তরুণদের কথা বলবে।

আসন্ন গণভোটকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়ছে। অনেক তরুণ মনে করছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে। আবার কেউ কেউ ‘না’ ভোটের মাধ্যমে বিদ্যমান কাঠামো বজায় রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও তরুণ ভোটাররা বলছেন, তারা আবেগ নয়, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান। স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি কোন পক্ষ দিচ্ছে তা বিশ্লেষণ করেই তারা ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। তরুণদের মতে, গণভোটের ফল ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি। দলের নেতারা বলছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, স্বচ্ছ প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী হবে। রাজধানীতে আয়োজিত এক সমাবেশে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা তরুণ ভোটারদের গণভোটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তরুণ সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এনসিপির দাবি, ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গণভোটে জনগণের সমর্থন প্রয়োজন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, দ্রুত ফলাফল সংগ্রহ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হটলাইন চালু থাকবে। এবার একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় ভোটারদের জন্য আলাদা ব্যালট পেপার ও বুথের ব্যবস্থা রাখা হবে। ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়াতে প্রচারপত্র ও গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামীলীগের মত বড় দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ছোট দলগুলোর জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় ইস্যুগুলোই এবার ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।

প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী প্রচারযুদ্ধ আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ এবং ডিজিটাল প্রচারণা ক্রমেই বাড়বে। ভোটারদের মন জয় করতে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সামনে আনছেন প্রার্থীরা। পাশাপাশি নির্বাচনী আচরণবিধি মানা, সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা এবং সহিংসতা এড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন, বদলে যাচ্ছে প্রচারের ধরণ

প্রচারযুদ্ধ শুরু আজ

আপডেট সময় :

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর গতকাল বুধবার প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রতীক হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মাঠে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। ইসির ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে ভিন্ন ব্যালটে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, স্বচ্ছ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে দেশের প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি প্রার্থী বৈধ তালিকায় রয়েছেন। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। তবে নিবন্ধিত আটটি দল এবারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। এছাড়া আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্যমতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভাগভিত্তিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে ব্যাপক প্রতিযোগিতার চিত্র উঠে এসেছে। দেশের আটটি বিভাগে বিভিন্ন সংখ্যক আসনে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে ৩৩টি সংসদীয় আসনে মোট ২৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। রাজশাহী বিভাগে ৩৯টি আসনে ১৯৮ জন প্রার্থী নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন। ময়মনসিংহ বিভাগে ২৪টি আসনে ১৩৭ জন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ঢাকা বিভাগে। এই বিভাগে মোট ৭০টি আসনে ৫৫৮ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, যা সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। অপরদিকে, খুলনা বিভাগে ৩৬টি আসনে ২০০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া, সিলেট বিভাগে ১৯টি আসনে ৯৪ জন প্রার্থী, বরিশাল বিভাগে ২১টি আসনে ১২৪ জন প্রার্থী এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টি আসনে ৪১২ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভাগভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এবারের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে তীব্র হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের আসনগুলোতে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোটের লড়াই আরও জমজমাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, শহরকেন্দ্রিক আসনগুলোতে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি হবে।

প্রতীক বরাদ্দের পরপরই মাঠে নামবেন প্রার্থীরা। কেউ এলাকায় গণসংযোগ করবেন, কেউ উঠান বৈঠক ও পথসভা আয়োজন। ঢাকার একটি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, প্রতীক পাওয়ার পরই আমাদের কর্মীরা এলাকায় নেমে পড়েছে। মানুষের কাছে গিয়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছি।

রাজশাহীর এক প্রার্থী জানান, ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও তারা প্রার্থীদের কর্মসূচি ও অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা চান। তিনি বলেন, মানুষ এখন প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব কাজ দেখতে চায়। কে এলাকার জন্য কী করেছে সেটাই ভোটের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ঢাকার মিরপুর এলাকার ভোটার রেহানা বেগম বলেন, আমরা চাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। যাকে ভোট দেব, সে যেন এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করে।

চট্টগ্রামের এক তরুণ ভোটার ইমরান হোসেন বলেন, চাকরির সুযোগ, প্রযুক্তি শিক্ষা ও উদ্যোক্তা সহায়তা আমাদের প্রধান চাওয়া। প্রার্থীরা যদি এসব নিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা দেয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। গ্রামীণ এলাকার ভোটাররাও কৃষি, সেচব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চান বলে জানিয়েছেন।

সাধারণ মানুষ নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দিচ্ছেন। বরিশালের এক ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন,
নির্বাচন যেন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়, সেটাই সবচেয়ে জরুরি। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে। সিলেটের এক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা চাই তরুণবান্ধব নীতি ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ। সংসদে এমন প্রতিনিধি দরকার যারা তরুণদের কথা বলবে।

আসন্ন গণভোটকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়ছে। অনেক তরুণ মনে করছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে। আবার কেউ কেউ ‘না’ ভোটের মাধ্যমে বিদ্যমান কাঠামো বজায় রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও তরুণ ভোটাররা বলছেন, তারা আবেগ নয়, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান। স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ডিজিটাল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি কোন পক্ষ দিচ্ছে তা বিশ্লেষণ করেই তারা ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন। তরুণদের মতে, গণভোটের ফল ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি। দলের নেতারা বলছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, স্বচ্ছ প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী হবে। রাজধানীতে আয়োজিত এক সমাবেশে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা তরুণ ভোটারদের গণভোটে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তরুণ সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এনসিপির দাবি, ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গণভোটে জনগণের সমর্থন প্রয়োজন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ ও আলোচনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, দ্রুত ফলাফল সংগ্রহ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য হটলাইন চালু থাকবে। এবার একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় ভোটারদের জন্য আলাদা ব্যালট পেপার ও বুথের ব্যবস্থা রাখা হবে। ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়াতে প্রচারপত্র ও গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামীলীগের মত বড় দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ছোট দলগুলোর জন্য এটি একটি বড় সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় ইস্যুগুলোই এবার ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।

প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী প্রচারযুদ্ধ আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের গণসংযোগ, পথসভা, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ এবং ডিজিটাল প্রচারণা ক্রমেই বাড়বে। ভোটারদের মন জয় করতে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সামনে আনছেন প্রার্থীরা। পাশাপাশি নির্বাচনী আচরণবিধি মানা, সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা এবং সহিংসতা এড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।