ঢাকা ১০:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫

বৃদ্ধাশ্রমে চোখের জলে বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গ ঈদ

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১১:০০:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ এপ্রিল ২০২৫ ৫২ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

স্বজনদের না জানিয়ে নাক ফুল বিক্রির টাকায় কাফনের কাপড় কেনার আবেদন

বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে প্রিয় সন্তানের জন্য মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদছেন বাবা-মা! অতীতের সুখ-গল্প আঁকড়ে ধরে বুকে পাথর চেপে জীবনযাপন করছেন। আজ বড় অসহায় তারা। ঈদের দিনও খোঁজ নেয়নি সন্তানরা। অথচ জীবনের সব সুখ তারা বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের জন্য। বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে প্রিয় সন্তানের জন্য মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদছেন বাবা-মা! সেই সন্তান ছাড়া বৃদ্ধাশ্রমে যতেœ থাকলেও ভালো নেই বাবা-মা। বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্ব জীবন কাটছে তাদের। ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে চোখের জলে নিঃসঙ্গ ঈদ কাটছে বাবা-মার।
আরজিনা বেগম। বয়স ৬০ বছর। চেহারায় বয়সের ছাপ। দুই বছর ধরে শান্তি নিবাসে জীবন কাটছে। দুই পুত্র সন্তানের মা তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পরই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। ছেলেদের নিয়ে কোনোমতে দিন কাটছিল আরজিনা বেগমের। বিপত্তি ঘটল বড় ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পর। ছেলের বউ সংসারে আসার পরই তার ওপর শুরু হয় অত্যাচার। বাড়ি থেকে বের হয়ে পথে পথে কাটছিল তার দিন, এক পর্যায়ে ঠাঁই হয় শান্তি নিবাসে।
আরজিনা বেগম বলেন, ‘বড় ছেলে শ্বশুর বাড়ি থাকে। ছোট ছেলে বাড়িতে থাকে। ভালোই ছিলাম, কিন্তু ছেলে বিয়ে দেয়ার পরই আমার জীবনে নেমে এলো অন্ধকার। অনেক কাজ করাতো ছেলে বউ। মুখ বুজে কাজ করতাম। বয়সের কারণে যখন কাজ করতে পারতাম না, তখনই আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। ছেলেকে বললাম, আমি কোথায় যাব। ছেলে বলল, যেদিকে চোখ যায় সেখানে যাও। স্থানীয় এক লোকের মাধ্যমে ঠাঁই হলো শান্তিনিবাসে। সাদা ধূতী কাপড় পরনে আঁচলে গিঠ দেয়া ছিল। জিজ্ঞাসা করতেই কান্না শুরু করে দিল আরজিনা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, আমার নাকের ফুলটি কাপড়ের আঁচলে কাগজে মুড়িয়ে গিঠ দিয়ে রেখেছি। শান্তি নিবাসের সুপার স্যারকে বলেছি, আমি মরে গেলে আমার স্বর্নের নাকফুলটি বিক্রি করে কাফনের কাপড় কেনার জন্য। আমার আত্মীয় স্বজন কাউকে খবর দেয়ার প্রয়োজন নেই।

 


সংশ্লিষ্ট বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এ বাবাদের জীবনের গল্প একেকজনের একেকরকম। ঈদের দিনে নাতি-নাতনী ও সন্তানদের কথাই বেশি মনে পড়ছে তাদের। কথাগুলো বলছিলেন আর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল আরজিনা বেগমের। কান্না করতে করতে বলছিলেন, ‘আজ ঈদের দিন, ছেলে, নাতি নিয়ে কতো আনন্দ করার কথা, সেখানে একাই ঈদ করতে হচ্ছে। এখানে অনেক ভালো আছি। সবার সঙ্গে মিলে মিশে ঈদের আনন্দ করতেছি। কিন্তু ছেলের জন্য খারাপ লাগছে।’
সরকারি চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত আরেকজন সাজ্জাদ হোসেন। স্ত্রী, সন্তানরা সবকিছু লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সব হারিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন তিনি। এরপর ভবঘুরে সাজ্জাদের ঠাঁই হয় শান্তি নিবাসে। আগের মতো আর সন্তানদের হাতে হাত রেখে যেতে পারেন না ঈদের কেনাকাটা করতে। শান্তি নিবাসের চার দেয়ালের মাঝে মুখ লুকিয়ে নীরবে ফেলেন চোখের পানি। গত ৬ বছর ধরে আছেন শান্তি নিবাসে।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘সবই আমার কপাল। বিয়ে করার পর স্ত্রীর নামে সব সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলাম। স্ত্রী ও সন্তানরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করি, সেই স্ত্রীও সম্পত্তি লিখে নিয়ে আমাকে বের করে দিল। পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে ঠাঁই হলো শান্তি নিবাসে। তিনি বলেন, সন্তান জন্ম দিয়ে ভুল করেছি, সম্পত্তি করেও ভুল করেছি। এত সম্পদ না থাকলে আমার সাথে এমনটি হতো না। এখন আমার কেউ খোঁজ নেয় না। তারা অনেক ভালো আছে। আমিও এখানে ভালো থাকার চেষ্টা করি। ভালোই আছি, ভুলের খেসারত দিচ্ছি।
সাজ্জাদ হোসেন, আরজিনা বেগমই নন, শান্তি নিবাসে রয়েছেন শাহাদাত খান, আয়শা বেগম, তাসলিমাসহ আরও অনেকেই। সবারই কথা একই রকম।

শান্তিনিবাসে পরিবারহীন বাবা-মায়ের সংখ্যা ১৯ জন। তাদের সবার ঈদ কাটছে পরিবারহীন। যাদের জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে এসেছেন সন্তানের জন্য। সেই সন্তানদের ছাড়া শান্তিনিবাসে যতেœ থাকলেও ভালো নেই বাবা-মা।
ঈদের দিনের সকালে ছেলে, নাতি, নাতনী ছাড়া খাবার মুখে তোলাও যে কতটা কষ্টের, তা একজন মা ছাড়া কেউ বোঝে না। সোমবার ঈদের দিন সকালে ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় অবস্থিত সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত শান্তি নিবাসে গিয়ে দেখা যায় মলিন মুখে ঈদ উদযাপন করছেন তারা। ঈদের দিন সকালে তাদের দেয়া হয়েছে উন্নত মানের খাবার। সকালে খিচুড়ি, সেমাই ও ডিম। দুপুরে পোলাও, গরুর মাংস, রোস্ট ও মিষ্টি। রাতেও রয়েছে উন্নতমানের খাবার। দেয়া হয়েছে নতুন পোশাক।
শান্তি নিবাসে বর্তমানে ১২ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে দুইজন খুবই অসুস্থ। তাদের চিকিৎসাও দেয়া হচ্ছে এখানে। এর মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ কথা বলতে পারেন না।
শান্তি নিবাসের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জীবনে অনেক ভুল করেছি, তাই আমি আজ এখানে। আমি চাকরি করতাম। চাকরির সুবাদে বাইরে বেশি থাকতাম। হঠাৎ দুর্ঘটনায় আমার পায়ের সমস্যা হয়। চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। স্ত্রী পরকীয়া করে টাকা পয়সা নিয়ে চলে যায় অন্যের হাত ধরে। এরপর আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। শান্তি নিবাসেই হলো শেষ ঠিাকানা। এখানে ভালোই আছি, খাওয়া দাওয়া চিকিৎসা সবই দেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, এখানকার সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছি। সবকিছু ভুলে গিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছি। শুধু ভুলতে পারিনা স্ত্রী সন্তানদের।
আয়শা বেগম বলেন, থেকেও কেউ নেই আমার। এখানে আছি অনেকদিন। ঈদের আনন্দ এখানকার সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিই। সকালে নতুন পোশাক দিয়েছে, তা পরেছি। সেমাই দিয়েছে, খিচুরি ও ডিম খেয়েছি। দুপুরে মাংস, ভাত, মিষ্টি দিয়েছে। রাতেও ভালো খাবার আছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু ঈদের দিনই নয়, সারা বছরই এখানে খাবার দেয়, যতœ করে। অনেক ভালো আছি। কেউ নেই মনে হয় না। শান্তি নিবাসের বাসিন্দাদের দেখভাল করেন শাহানাজ বেগম। তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন সকলের সমানভাবে যতœ করা হয়। আব্বা-আম্মার মতো করে সকলের খেয়াল রাখি। অনেকেই অসুস্থ আছেন, তাদের দিকে বেশি নজর দিতে হয়।
সমাজসেবা পরিচালিত শান্তি নিবাসের উপ তত্ত্বাবধায়ক তাহসিনা জামান জানান, শান্তি নিবাসে ১২ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ খুবই অসুস্থ, তাদের সুস্থ করতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যারা রয়েছেন তাদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসাসহ সব ব্যবস্থা এখান থেকেই করা হয়।
তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে সব নিবাসীকে নতুন কাপড় দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদের দিন সকালে রুটি-সেমাই, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুপুরে ও রাতে পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। তাহসিনা জামান বলেন, চাকরির পেশাগত দায়িত্ব পালনই নয়, এ মা-বাবাদের সেবা করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।
এদিকে গাজীপুর সদর উপজেলায় ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের বিশিয়া কুড়িবাড়ী (বি. কে. বাড়ি) এলাকায় ৭২ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত বেসরকারি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র। এর বাসিন্দা দু’শতাধিক। আশাভঙ্গের যন্ত্রণা আর হারানো দিনের সুখস্মৃতি বয়ে বেড়ানো বাবা-মা তারা। আপন সন্তানরা ভুলে যায় তাদের, কিন্তু তারা ভুলতে পারেন না কিছুতেই। তাই বৃদ্ধাশ্রমে নিয়মিত কাঁদেন তারা। এমনকি ঈদের দিনেও তাদের চোখে থাকে অশ্রুবন্যা।
বৃদ্ধাশ্রমের কর্মকর্তা জানান, ঈদুল ফিতরে সকালে মুড়ি ও সেমাই দেয়া হয় তাদের। সেগুলো খেয়েই ঈদের নামাজ পড়তে যান তারা । বৃষ্টি থাকলে বয়স্করা আশ্রয়কেন্দ্রের মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজের পর ভুনা খিচুড়ি খেতে দেওয়া হয়েছে তাদের। ঈদ উপলক্ষে পুরুষদের ফতুয়া, লুঙ্গি এবং মহিলাদের শাড়ি দেওয়া হচ্ছে। যারা ফতুয়া নিতে রাজি নন তাদের দেওয়া হয় পাঞ্জাবি। এই ঈদের দিনেও তারা সাধারণ খাবার ও পোশাকে পার করে দেন, যেখানে তাদের সন্তানরা আয়েশ করে কোরমা পোলাও খায়। যে সন্তানরা অভাবের দোহাই দিয়ে, লজ্জা শরম উপেক্ষা করে মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসে, পরিবারের বোঝা মনে করে যে সন্তানরা, তাদের সম্মানের দিকে তাকিয়েই এই পিতা মাতারা নিজেদের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেন না। আহ! সন্তানের অবহেলা সত্বেও কারা সন্তানের মুখপানে চেয়ে থাকেন। সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। এত নির্দয় আচরণের পরও তারা সন্তানদের ভুলতে পারেন না। অশ্রুসজল চোখে পথপানে তাকিয়ে থাকেন, এই বুঝি সন্তান এসে তাদের নিয়ে যাবে। কিন্তু না! সন্ধেবেলা নিরাশ হয়ে ওয়ার্ডে ফিরে যেতে হয় তাদের। এভাবে আর কতো! কবে বোধোদয় হবে এ সন্তানদের! কবে তারা মুক্তি পাবেন মানবেতর জীবন থেকে? আছে কোনো জবাব বা প্রত্যাশা?

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

বৃদ্ধাশ্রমে চোখের জলে বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গ ঈদ

আপডেট সময় : ১১:০০:১২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ এপ্রিল ২০২৫

স্বজনদের না জানিয়ে নাক ফুল বিক্রির টাকায় কাফনের কাপড় কেনার আবেদন

বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে প্রিয় সন্তানের জন্য মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদছেন বাবা-মা! অতীতের সুখ-গল্প আঁকড়ে ধরে বুকে পাথর চেপে জীবনযাপন করছেন। আজ বড় অসহায় তারা। ঈদের দিনও খোঁজ নেয়নি সন্তানরা। অথচ জীবনের সব সুখ তারা বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের জন্য। বৃদ্ধাশ্রমের চার দেয়ালের মাঝে প্রিয় সন্তানের জন্য মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদছেন বাবা-মা! সেই সন্তান ছাড়া বৃদ্ধাশ্রমে যতেœ থাকলেও ভালো নেই বাবা-মা। বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্ব জীবন কাটছে তাদের। ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে চোখের জলে নিঃসঙ্গ ঈদ কাটছে বাবা-মার।
আরজিনা বেগম। বয়স ৬০ বছর। চেহারায় বয়সের ছাপ। দুই বছর ধরে শান্তি নিবাসে জীবন কাটছে। দুই পুত্র সন্তানের মা তিনি। স্বামী মারা যাওয়ার পরই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। ছেলেদের নিয়ে কোনোমতে দিন কাটছিল আরজিনা বেগমের। বিপত্তি ঘটল বড় ছেলেকে বিয়ে দেয়ার পর। ছেলের বউ সংসারে আসার পরই তার ওপর শুরু হয় অত্যাচার। বাড়ি থেকে বের হয়ে পথে পথে কাটছিল তার দিন, এক পর্যায়ে ঠাঁই হয় শান্তি নিবাসে।
আরজিনা বেগম বলেন, ‘বড় ছেলে শ্বশুর বাড়ি থাকে। ছোট ছেলে বাড়িতে থাকে। ভালোই ছিলাম, কিন্তু ছেলে বিয়ে দেয়ার পরই আমার জীবনে নেমে এলো অন্ধকার। অনেক কাজ করাতো ছেলে বউ। মুখ বুজে কাজ করতাম। বয়সের কারণে যখন কাজ করতে পারতাম না, তখনই আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। ছেলেকে বললাম, আমি কোথায় যাব। ছেলে বলল, যেদিকে চোখ যায় সেখানে যাও। স্থানীয় এক লোকের মাধ্যমে ঠাঁই হলো শান্তিনিবাসে। সাদা ধূতী কাপড় পরনে আঁচলে গিঠ দেয়া ছিল। জিজ্ঞাসা করতেই কান্না শুরু করে দিল আরজিনা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, আমার নাকের ফুলটি কাপড়ের আঁচলে কাগজে মুড়িয়ে গিঠ দিয়ে রেখেছি। শান্তি নিবাসের সুপার স্যারকে বলেছি, আমি মরে গেলে আমার স্বর্নের নাকফুলটি বিক্রি করে কাফনের কাপড় কেনার জন্য। আমার আত্মীয় স্বজন কাউকে খবর দেয়ার প্রয়োজন নেই।

 


সংশ্লিষ্ট বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এ বাবাদের জীবনের গল্প একেকজনের একেকরকম। ঈদের দিনে নাতি-নাতনী ও সন্তানদের কথাই বেশি মনে পড়ছে তাদের। কথাগুলো বলছিলেন আর চোখ দিয়ে জল পড়ছিল আরজিনা বেগমের। কান্না করতে করতে বলছিলেন, ‘আজ ঈদের দিন, ছেলে, নাতি নিয়ে কতো আনন্দ করার কথা, সেখানে একাই ঈদ করতে হচ্ছে। এখানে অনেক ভালো আছি। সবার সঙ্গে মিলে মিশে ঈদের আনন্দ করতেছি। কিন্তু ছেলের জন্য খারাপ লাগছে।’
সরকারি চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত আরেকজন সাজ্জাদ হোসেন। স্ত্রী, সন্তানরা সবকিছু লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। সব হারিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন তিনি। এরপর ভবঘুরে সাজ্জাদের ঠাঁই হয় শান্তি নিবাসে। আগের মতো আর সন্তানদের হাতে হাত রেখে যেতে পারেন না ঈদের কেনাকাটা করতে। শান্তি নিবাসের চার দেয়ালের মাঝে মুখ লুকিয়ে নীরবে ফেলেন চোখের পানি। গত ৬ বছর ধরে আছেন শান্তি নিবাসে।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘সবই আমার কপাল। বিয়ে করার পর স্ত্রীর নামে সব সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলাম। স্ত্রী ও সন্তানরা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করি, সেই স্ত্রীও সম্পত্তি লিখে নিয়ে আমাকে বের করে দিল। পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে ঠাঁই হলো শান্তি নিবাসে। তিনি বলেন, সন্তান জন্ম দিয়ে ভুল করেছি, সম্পত্তি করেও ভুল করেছি। এত সম্পদ না থাকলে আমার সাথে এমনটি হতো না। এখন আমার কেউ খোঁজ নেয় না। তারা অনেক ভালো আছে। আমিও এখানে ভালো থাকার চেষ্টা করি। ভালোই আছি, ভুলের খেসারত দিচ্ছি।
সাজ্জাদ হোসেন, আরজিনা বেগমই নন, শান্তি নিবাসে রয়েছেন শাহাদাত খান, আয়শা বেগম, তাসলিমাসহ আরও অনেকেই। সবারই কথা একই রকম।

শান্তিনিবাসে পরিবারহীন বাবা-মায়ের সংখ্যা ১৯ জন। তাদের সবার ঈদ কাটছে পরিবারহীন। যাদের জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে এসেছেন সন্তানের জন্য। সেই সন্তানদের ছাড়া শান্তিনিবাসে যতেœ থাকলেও ভালো নেই বাবা-মা।
ঈদের দিনের সকালে ছেলে, নাতি, নাতনী ছাড়া খাবার মুখে তোলাও যে কতটা কষ্টের, তা একজন মা ছাড়া কেউ বোঝে না। সোমবার ঈদের দিন সকালে ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকায় অবস্থিত সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত শান্তি নিবাসে গিয়ে দেখা যায় মলিন মুখে ঈদ উদযাপন করছেন তারা। ঈদের দিন সকালে তাদের দেয়া হয়েছে উন্নত মানের খাবার। সকালে খিচুড়ি, সেমাই ও ডিম। দুপুরে পোলাও, গরুর মাংস, রোস্ট ও মিষ্টি। রাতেও রয়েছে উন্নতমানের খাবার। দেয়া হয়েছে নতুন পোশাক।
শান্তি নিবাসে বর্তমানে ১২ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে দুইজন খুবই অসুস্থ। তাদের চিকিৎসাও দেয়া হচ্ছে এখানে। এর মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ কথা বলতে পারেন না।
শান্তি নিবাসের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জীবনে অনেক ভুল করেছি, তাই আমি আজ এখানে। আমি চাকরি করতাম। চাকরির সুবাদে বাইরে বেশি থাকতাম। হঠাৎ দুর্ঘটনায় আমার পায়ের সমস্যা হয়। চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। স্ত্রী পরকীয়া করে টাকা পয়সা নিয়ে চলে যায় অন্যের হাত ধরে। এরপর আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। শান্তি নিবাসেই হলো শেষ ঠিাকানা। এখানে ভালোই আছি, খাওয়া দাওয়া চিকিৎসা সবই দেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, এখানকার সবার সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছি। সবকিছু ভুলে গিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছি। শুধু ভুলতে পারিনা স্ত্রী সন্তানদের।
আয়শা বেগম বলেন, থেকেও কেউ নেই আমার। এখানে আছি অনেকদিন। ঈদের আনন্দ এখানকার সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিই। সকালে নতুন পোশাক দিয়েছে, তা পরেছি। সেমাই দিয়েছে, খিচুরি ও ডিম খেয়েছি। দুপুরে মাংস, ভাত, মিষ্টি দিয়েছে। রাতেও ভালো খাবার আছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু ঈদের দিনই নয়, সারা বছরই এখানে খাবার দেয়, যতœ করে। অনেক ভালো আছি। কেউ নেই মনে হয় না। শান্তি নিবাসের বাসিন্দাদের দেখভাল করেন শাহানাজ বেগম। তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন সকলের সমানভাবে যতœ করা হয়। আব্বা-আম্মার মতো করে সকলের খেয়াল রাখি। অনেকেই অসুস্থ আছেন, তাদের দিকে বেশি নজর দিতে হয়।
সমাজসেবা পরিচালিত শান্তি নিবাসের উপ তত্ত্বাবধায়ক তাহসিনা জামান জানান, শান্তি নিবাসে ১২ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ খুবই অসুস্থ, তাদের সুস্থ করতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যারা রয়েছেন তাদের থাকা-খাওয়া, চিকিৎসাসহ সব ব্যবস্থা এখান থেকেই করা হয়।
তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে সব নিবাসীকে নতুন কাপড় দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদের দিন সকালে রুটি-সেমাই, মিষ্টিসহ বিভিন্ন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুপুরে ও রাতে পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। তাহসিনা জামান বলেন, চাকরির পেশাগত দায়িত্ব পালনই নয়, এ মা-বাবাদের সেবা করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।
এদিকে গাজীপুর সদর উপজেলায় ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের বিশিয়া কুড়িবাড়ী (বি. কে. বাড়ি) এলাকায় ৭২ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত বেসরকারি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র। এর বাসিন্দা দু’শতাধিক। আশাভঙ্গের যন্ত্রণা আর হারানো দিনের সুখস্মৃতি বয়ে বেড়ানো বাবা-মা তারা। আপন সন্তানরা ভুলে যায় তাদের, কিন্তু তারা ভুলতে পারেন না কিছুতেই। তাই বৃদ্ধাশ্রমে নিয়মিত কাঁদেন তারা। এমনকি ঈদের দিনেও তাদের চোখে থাকে অশ্রুবন্যা।
বৃদ্ধাশ্রমের কর্মকর্তা জানান, ঈদুল ফিতরে সকালে মুড়ি ও সেমাই দেয়া হয় তাদের। সেগুলো খেয়েই ঈদের নামাজ পড়তে যান তারা । বৃষ্টি থাকলে বয়স্করা আশ্রয়কেন্দ্রের মসজিদেই ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজের পর ভুনা খিচুড়ি খেতে দেওয়া হয়েছে তাদের। ঈদ উপলক্ষে পুরুষদের ফতুয়া, লুঙ্গি এবং মহিলাদের শাড়ি দেওয়া হচ্ছে। যারা ফতুয়া নিতে রাজি নন তাদের দেওয়া হয় পাঞ্জাবি। এই ঈদের দিনেও তারা সাধারণ খাবার ও পোশাকে পার করে দেন, যেখানে তাদের সন্তানরা আয়েশ করে কোরমা পোলাও খায়। যে সন্তানরা অভাবের দোহাই দিয়ে, লজ্জা শরম উপেক্ষা করে মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসে, পরিবারের বোঝা মনে করে যে সন্তানরা, তাদের সম্মানের দিকে তাকিয়েই এই পিতা মাতারা নিজেদের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেন না। আহ! সন্তানের অবহেলা সত্বেও কারা সন্তানের মুখপানে চেয়ে থাকেন। সন্তানের কল্যাণ কামনা করেন। এত নির্দয় আচরণের পরও তারা সন্তানদের ভুলতে পারেন না। অশ্রুসজল চোখে পথপানে তাকিয়ে থাকেন, এই বুঝি সন্তান এসে তাদের নিয়ে যাবে। কিন্তু না! সন্ধেবেলা নিরাশ হয়ে ওয়ার্ডে ফিরে যেতে হয় তাদের। এভাবে আর কতো! কবে বোধোদয় হবে এ সন্তানদের! কবে তারা মুক্তি পাবেন মানবেতর জীবন থেকে? আছে কোনো জবাব বা প্রত্যাশা?