শীতে কাবু শিশু ও বৃদ্ধরা
- আপডেট সময় : ২৪০ বার পড়া হয়েছে
প্রবাদ রয়েছে মাঘের শীতে বাঘ পালায়। প্রকৃতিতে তীব্র শীতল এ মাস আসতে এখনো অন্তত ৭ দিন বাকি। তার আগেই পৌষের শেষার্ধে সারাদেশে শৈত্য প্রবাহ বইছে। এতে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। শীতে কাবু হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধ। শীতজনিত রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। এবছর মাঘের আগেই বাঘের ভয় পাচ্ছে এদেশের মানুষ।
আবহাওয়া সূত্র বলেছে, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময়ে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র শীতে দেশের সব হাসপাতালে ঠা-াজনিত রোগে আক্রান্তদের ভিড় বাড়ছে। তাদের বেশির ভাগই ডায়রিয়া আক্রান্ত।
চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরাই শীতকালীন রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিজনিত জটিলতা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।
এদিকে শীতে বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজ না পেয়ে অনেকে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কর্মহীন মানুষের খাদ্যাভাব মেটাতে আর্থিক সহায়তার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি বলেও অভিযোগ তাদের। জেলা ও উপজেলা ও পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি থেকে যৎসামান্য কম্বল বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। হাসপাতালগুলোয় বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।
প্রচ- শীতে জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া শীতল পরিস্থিতি আগামী এক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সকল জেলার জেনারেল হাসপাতালে বেড়েছে রোগীর চাপ। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার রোকন উদ দৌলা বলেন, ‘গত কয়েকদিনে ফেনীর হাসপাতালগুলোয় জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্ট রোগীর চাপ বেড়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
অপরদিকে শীতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ঠান্ডা তাপমাত্রায় ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এ সময় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী রাখা অত্যন্ত জরুরি। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঠান্ডায় ভাইরাস খুব সহজেই মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে, তবে সঠিক পুষ্টি ও সচেতনতায় এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
চিকিৎসকদের মতে, শীতকালে শরীর সুস্থ রাখতে নির্দিষ্ট পাঁচটি ভিটামিন ডায়েটে রাখা অপরিহার্য। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে প্রথমত ভিটামিন সি-এর কোনো বিকল্প নেই। এটি শরীরের শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বাড়িয়ে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। লেবু, কমলা, পেঁপে, আনারস এবং সবুজ শাকসবজি ভিটামিন সি-এর চমৎকার উৎস। এছাড়া প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কাঁচা মরিচ বা পুদিনাপাতা রাখলে এই ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
শীতের ছোট দিনে সূর্যের আলোর অভাবে শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা দেয়। অথচ সর্দি-কাশির মতো সংক্রমণ কমাতে এই ভিটামিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাড়ের সুরক্ষা ছাড়াও এটি ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। সূর্যের আলো ছাড়াও ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ এবং মাশরুম থেকে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।
এছাড়াও শরীরের কোষগুলোকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ভিটামিন ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি টি-কোষের সুরক্ষা নিশ্চিত করে শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচায়। বাদাম, উদ্ভিজ তেল, আভোকাডো এবং সামুদ্রিক মাছ ভিটামিন ই-এর প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত।
তীব্র শীতে রোগ বালাই থেকে রেহাই পেতে স্বাস্থ্য অধিদফতর ৭ নির্দেশনা জারি করেছে। দেশের সব হাসপাতালে শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ৭ দফা নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এসব নির্দেশনার আলোকে হাসপাতালগুলোকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত সোমবার অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ ও রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে নিম্নোক্ত সাতটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রথমত, হাসপাতালের ভাঙা জানালা, দরজা বা ঠা-া বাতাস প্রবেশের স্থান পিডব্লিউডি/এইচইডি/নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মেরামত বা সংস্কার করতে হবে। এর মাধ্যমে শীতকালীন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে এবং রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এছাড়া রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় কম্বল ও মশারি সরবরাহ করতে হবে, যাতে শীত ও তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে সংক্রমণ বৃদ্ধি না পায়। তৃতীয়ত, শীতকালীন রোগের চিকিৎসার জন্য নেবুলাইজার সলিউশন, অ্যান্টিবায়োটিক, অক্সিজেন, ওরাল স্যালাইন, আইডি ফ্লুইড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে হাসপাতালে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
অপরদিকে শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে বাধ্যতামূলক বৈকালিক রাউন্ড নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, রোগীর অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের শীতকালীন রোগ এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদান করা যেতে পারে। ষষ্ঠত, প্রতিদিন এমআইএস কন্ট্রোল রুমে হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাসপাতাল প্রধানদের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি রাখা প্রয়োজন, যাতে শীতকালীন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং রোগীরা সঠিক সেবা পায়।
আবহাওয়া সূত্র বলেছে, ঢাকায় শীতের অনুভূতি আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। এখনো চারদিক কুয়াশাচ্ছন্ন। আরও কমে গেছে রাজধানীর তাপমাত্রা। সেমাবার ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পাবনা ও সিলেটসহ দেশের সাতটি জেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে সোমবার থেকে শীতের তীব্রতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাতের দিকে কুয়াশার ঘনত্ব আবারও বাড়বে এবং আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকবে। ঘন কুয়াশার কারণে নৌপথ, আকাশপথ ও সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অফিস। আগামী পাঁচ দিনে তাপমাত্রা বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও জানানো হয়েছে। শনিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে, ৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তরের জনপদসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিমেল হাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘ মেয়াদি পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি মাসেই দুই-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি এবং এক-দুটি মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্য প্রবাহ বয়ে যেতে পারে। কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমে ১০ থেকে আট দশমিক এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, আট থেকে ছয় দশমিক এক ডিগ্রি হলে মাঝারি, ছয় থেকে চার দশমিক এক ডিগ্রি হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং তাপমাত্রা আরও কমে চার ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।





















