ঈদে বেপরোয়া বাইক দুর্ঘটনা
৪৮ ঘন্টায় পঙ্গু হাসপাতালে সাড়ে ৫ শতাধিক রোগী

- আপডেট সময় : ০১:৪৬:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৫ ৪৮ বার পড়া হয়েছে
পঙ্গুত্ব পরিবারের জন্য হুমকি
ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই ভয়াবহ আকারে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। বেপরোয়া চলাচলের কারণে ঘটা এসব সড়ক দুর্ঘটনার বেশিরভাগই মোটর সাইকেল বা বাইক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব রোগী এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বা পঙ্গু হাসপাতালে (নিটোর)। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদ ঘিরে বেপরোয়া বাইক চালানোর ফলে গত ৪৮ ঘন্টা বা দুইদিনে সাড়ে ৫ শতাধিক রোগী পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাড়তি রোগী আসায় ওয়ার্ডে বারান্দায় করিডোরসহ পুরো হাসপাতালই এখন রোগীতে ঠাসা। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বা পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে ও রোগী-চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে ঈদের দিনেই নিটোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৪১ জন, পরদিন এসে ভর্তি হয়েছেন ৩৩০ জন। তবে গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত রোগীর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই দিনের তুলনায় আজ রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। আর আহত এসব রোগীদের মধ্যে বেশি রয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার রোগী, এরপর প্রাইভেটকার, ট্রাক-বাস দুর্ঘটনার রোগী।
অপরদিকে হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় রফিকুল ইসলাম নামের রোগীর এক স্বজনের সঙ্গে। তিনি জানান, ঈদের পরদিন মোটরসাইকেলে করে মামার বাড়ি যাচ্ছিল ৮ বছরের জিহাদ হোসেন। কিন্তু ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় মামার বাড়ি যাওয়ার বদলে এখন রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় শুয়ে কাতরাচ্ছে সে। তার হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যান্ডেজ। তার চিৎকারে হাসপাতালের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
জানা গেছে, দুর্ঘটনায় তার বাবা রফিকুল ইসলামও সামান্য আহত হন, তবে সামান্য চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি সুস্থ হলেও এবার সন্তানকে নিয়ে চলছে চিকিৎসার লড়াই।
এদিকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বাসিন্দা নাহিদুল ইসলাম জানান, সোমবার রাতে মোটরসাইকেলে তিনি তার ভাইসহ বাজারে আসছিলেন, তখন পেছন দিক থেকে একটি বাস ধাক্কা দিলে তারা দুইজনই গুরুতর আহত হন। তবে তার ভাইয়ের আঘাত কিছুটা কম হলে তার অবস্থা খুবই খারাপ। হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে ফ্লোরে শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তিনি জানান, গতকাল দুই পায়েই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখন পা হারানোর শঙ্কায় আছেন তিনি। চিকিৎসকের মতে, অপারেশন সফল হলে ঠিক হয়ে যাবে। তা না হলে পা কেটে ফেলতে হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের আগে বা পরে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া রোগীদের হৃদয়বিদারক ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের দৃশ্য। আহত রোগী ও স্বজনদের আহাজারিতে যেন ভারি হয়ে উঠছে হাসপাতালের আকাশ-বাতাস। বাইক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কারও কারও এক পা কিংবা দুই পা ভেঙে গেছে। কারও এক হাত বা দুই হাতেই গুরুতর আঘাত রয়েছে। হাতে-পায়ে লোহার বড় রড লাগানো হয়েছে। আবার কারও কারও হাত-পায়ের পাশাপাশি বুকে, পেটে ও মাথাসহ বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর জখম হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদের আগের দিন রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত এই চার দিনে জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৯৭৫ জন। এর মধ্যে গত ৩০ মার্চ ২৩৯ জন, তার মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮০ জন। গত ৩১ মার্চ ২৪১ জন আহতের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৭৬ জন। আর ১ এপ্রিল ৩৩০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৩ জন। আর বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত আহত ১৬৫ জন চিকিৎসা নিতে আসেন যাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৬ জন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ঈদের আগের দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পর দিন—এই তিন দিনে ৮১০ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৬০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। যা মোট রোগীর ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ বাস, অটোরিকশা ও সিএনজি দুর্ঘটনা। ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আহত। এ ছাড়া উপর থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন ২৮২ জন। যা মোট রোগীর ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বিভিন্নভাবে আঘাত পেয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন ১১৮ জন বা ১৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মারামারি করে আহত হয়েছেন ৫৩ জন বা ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। মেশিন চালাতে গিয়ে আহত হয়ে ২৩ জন বা ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ভারি জিনিস ওঠাতে গিয়ে হাতে আঘাত পেয়েছেন ৪ জন বা শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ। পরিসংখ্যানে প্রতিবার ঈদে প্রায় ৪৮ শতাংশ রোগী মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, বাইক দুর্ঘটনায় আহতদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এর একটি বড় অংশ বয়সে তরুণ। তারা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। এই রোগীদের কেউ বাইক দুর্ঘটনার শিকার, কেউ গাড়ি দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে আহত হয়েছেন। কোনো কোনো রোগীর হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থাও রয়েছে।
চিকিৎসকরা বলেন, মূলত ঈদের সময় সড়ক ফাঁকা থাকে। ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনা বাড়ে। তাই ঈদের এই সময়ে রোগীর চাপ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতি বছরই সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনিভাবে মানুষ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। ফলে পরিবারের যে সদস্য দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে বা পঙ্গুত্ব বরণ করছে, সেই পরিবারে অতিরিক্ত একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি দুর্ঘটনা যেমন সারাজীবনের কান্না, তেমনই সেই দুর্ঘটনার ফলে একটি পরিবারের সব সদস্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আবার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু কিংবা পঙ্গু হওয়ায় একটি পরিবারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দুর্ঘটনা রোধে চালকদের সচেতনতা ও গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে যেসব নিয়মকানুন এবং দিকনির্দেশনা আছে, সেগুলো মেনে চলার চলার পরামর্শ দেন তারা।
এদিকে রোগীদের সেবায় ঈদের সরকারি ছুটিতেও রোস্টার অনুযায়ী হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরা। এবিষয়ে জানতে চাইলে নিটোর পরিচালক ডা. আবুল কেনান বলেন, ঈদকেন্দ্রীক যারা এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে, তাদের মধ্যে অন্তত শ’খানেক আছেন সিরিয়াস ইনজুরড (মারাত্মক আহত)।
তিনি বলেন, ঈদের ছুটিতে আসা রোগীদের সেবায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত যেন না ঘটে সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে রোস্টার অনুযায়ী টিম গঠন করা দেওয়া হয়েছে। ১০০ চিকিৎসক ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন। হাসপাতালের সক্ষমতা অনুযায়ী রোগীরা সেবা পাচ্ছেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর চিকিৎসকসহ বিভিন্ন সেবা বেশি রাখা হয়েছে।
চিকিৎসক আরও বলেন, হাসপাতালটিতে ঈদের ছুটিতে নিয়মিত ওটি ২৮টি, জরুরি বিভাগে ওটি ৮টি খোলা থাকছে। সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে আটটি ওটি। এছাড়া প্রয়োজনে অন্যান্য সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বেশি হবে, তা যেন সামাল দেওয়া যায়, এ ধারনা থেকেই আমরা আগে থেকেই ব্যবস্থা নিয়েছি। কেননা সবাই প্রত্যাশা নিয়ে সেবা নিতে আসেন। তবে সবাইকে অনুরোধ চলাচলে সাবধান থাকার জন্য। তাতে রোগী সংখ্যা কমবে। ঈদের গাড়িগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাফেরা করে, এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকা প্রয়োজন।