সংবাদ শিরোনাম ::
রাস্তায় উত্তেজনা-বাজারে উদ্বেগ নির্বাচন ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা
এ এইচ ইমরান
- আপডেট সময় : ২৮৮ বার পড়া হয়েছে
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বায়ুমণ্ডল ততই ভারী হয়ে উঠছে। সুপ্রিম কোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ক্ষমতার কেন্দ্র যেন শূন্য হয়ে গেছে। সেই শূন্যতায় বিএনপি-জামায়াতের পালে হাওয়া লাগলেও এনসিপি, চরমোনাই গ্রুপসহ অন্যান্য শক্তি নিজেদের মেরুকরণ ঘটিয়ে মাঠ ছেয়ে ফেলছে। ফলে নির্বাচনী সমীকরণ শুধু দ্বিমুখী নয়, বহুমুখী ও বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় এখন একটিই সুর—দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সাম্প্রদায়িকতার পুরোনো ক্ষত স্পর্শ করে দেশকে আবারও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
রাজধানীর রাস্তা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, মিছিল ও পাল্টা মিছিলের শব্দে এখন আর স্বাভাবিক জনজীবনের ছন্দ পাওয়া যায় না। বিএনপি-জামায়াতের শোডাউনে যখন হাজারো সমর্থকের পদচারণা, তখনই এনসিপির কর্মীরা পাশের সড়কে বিক্ষোভ সমাবেশ ডেকে তোল। চরমোনাই গ্রুপের ইসলামী স্লোগান আর হেফাজত-সমর্থকদের কালো পতাকা একই মাঠে মুখোমুখি হয়ে উত্তেজনার তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এই অবিরাম রাজনৈতিক শোরগোলের ফাঁকে সাধারণ মানুষ নিজেদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ হারিয়ে ফেলছে; দোকান খোলার সময় পিছিয়ে যাচ্ছে, স্কুল-কলেজে উপস্থিতি কমছে, রাত নেমে আসলেই মুখে কালো কাপড় বেঁধে পাড়া-মহল্লায় পাহারার দায়িত্ব নিতে হচ্ছে স্থানীয় যুবসমাজকে।
সড়কে যানবাহনের চাকা যেন আজ আগুনের ওপর ঘুরছে। হঠাৎ অবরোধের ডাক এলেই ট্রাক-কাভার্ডভ্যান রাস্তায় ফেলে রেখে চালকরা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন; পরিবহন মালিকরা গ্যারেজে গাড়ি রেখে চাবি গলায় ঝুলিয়ে বসে থাকেন। এই অচলাবস্থায় পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে—চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকামুখী ট্রাক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, খালি হয়ে যায় কাঁচাবাজার; পেঁয়াজের কেজি একশো পার হয়ে যায়, ভোজ্যতেলের বোতলের দামে লাগে অতিরিক্ত পঞ্চাশ টাকা। ছোট ব্যবসায়ীরা বলেন, বিক্রি নেই বললেই চলে; পাইকারি দোকানে মাল ধরে রাখার ঘর নেই। আর খুচরা দোকানে ক্রেতা নেই। বড় শিল্প গ্রুপগুলো তাদের নতুন প্রকল্প স্থগিত রাখছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার না কমায় বিনিয়োগ আরও মন্থর হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রিমিয়াম এখন প্রতিটি লেনদেনের ওপর যোগ হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের চোখে এখন প্রতিটি ভোটকেন্দ্র একটা সম্ভাবনাময় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। গত সপ্তাহে সিলেটের এক উপজেলায় প্রার্থীর গাড়িবহরে ইট ছোড়ার ঘটনার পর থেকে র্যাব ও বিজিবি সদস্যরা রাতারাতি পাহারা বাড়িয়েছে; পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে জানা গেছে, নাশকতার পরিকল্পনা হিসেবে ইতিমধ্যে কয়েকটি অস্ত্রের চালান সীমান্ত পথে ধরা পড়েছে। সীমান্তে বিএসএফ-বিজিবির যৌথ টহল বাড়ানো হলেও মাদক ও অস্ত্র পাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, চরমপন্থী কয়েকটি গোষ্ঠী নির্বাচনী সহিংসতার আড়ালে তাদের পুরোনো নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। ভোটারদের মনে এখন একটিই প্রশ্ন—কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে গেলে জীবন নিয়ে ফিরে আসা যাবে কি না।
সহিংসতার হার- পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে সারাদেশে ২৪১টি পাল্টা-পাল্টি সমাবেশ হয়েছে, যার মধ্যে ৩২টিই শেষ পর্যন্ত সংঘাতে রূপ নেয়। এসব ঘটনায় ৪৬৭টি মামলা হয়েছে ও ১ হাজার ৯৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। ঢাকা মহানগরে একক দিনে সর্বোচ্চ ১৩৭টি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া অর্থনীতির চাপ- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত এক মাসে পেঁয়াজের দাম ৮২%, ভোজ্যতেল ১৪%, ডাল ১৮% ও পরিবহন ভাড়া গড়ে ২৬% বেড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাক চলাচল কমেছে ৪০%। গত সপ্তাহে ১ হাজার ১০০ টন পেঁয়াজ-আলু বোঝাই ট্রাক আটকা পড়ে সীতাকু-ণ্ড-সালখালী সড়কে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাইনাস ০.৮% যা গত ১৪ বছরের সর্বনিম্ন রেকর্ড।
এদিকে নির্বাচন কমিশন ভবনের করিডোরে এখন দিনরাত চলছে জরুরি বৈঠক। ভোটকেন্দ্র পুনর্বিন্যাস নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে চলছে আপিল-পাল্টা আপিল। কমিশনাররা বলছেন, রোডম্যাপ অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু মাঠে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তো আর কেবল আমাদের নয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইভিএমের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ভালো হলেও নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে প্রযুক্তির কোনো মূল্য থাকে না। কমিশনকে এখন প্রতিটি উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে, যাতে অস্ত্রধারী বাহিনী ভোটকেন্দ্রের আশপাশ ঘুরঘুর করতে না পারে।
সাধারণ মানুষের দিনচর্যায় এখন অজানা আতঙ্কের ছায়া। ভোরে বাজারে গেলে দাম শুনে হাতের ব্যাগটা শক্ত করে ধরতে হয়, সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে টেলিভিশন খুললেই সংঘর্ষের লাইভ ফুটেজ চোখে পড়ে। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, কৃষক থেকে গার্মেন্টস শ্রমিক—সবার মুখে একই কথা, রাজনৈতিক নেতারা যদি শেষ পর্যন্ত সংযত না হন, তবে জীবনযাত্রার চাকাটা আরও খারাপ হবে। দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা শিক্ষাব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে—বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেমিস্টার পিছিয়ে যাচ্ছে। অভিভাবকরা বলছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন আর রাজনীতির বাইরে থাকা যায় না।
রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা একই সুরে বলছেন, দেশ এখন এক সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে। যার শেষ প্রান্তে আলো আছে কি না তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিপক্কতার ওপর। বিএনপি-জামায়াত যদি মনে করে কেবল রাস্তা দখল করলেই জয় নিশ্চিত, আর এনসিপি-চরমোনাই গ্রুপ যদি প্রতিটি আসনে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তবে নির্বাচনের দিনটি হবে এক ভয়াবহ অধ্যায়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রশাসনকে এখনই সব দলের সঙ্গে সীমিত পরিসরে ‘কনফিডেন্স বিল্ডিং’ বৈঠক করতে হবে। যাতে কমপক্ষে ভোটের দিন পর্যন্ত সহিংসতার ঘোষণা না আসে। নির্বাচন কমিশনকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে, যাতে ভোটাররা দেখতে পান রাষ্ট্রের বলয় তাদের পাশে আছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ এখন এক অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে রাজনৈতিক উত্তাপ, অর্থনৈতিক সংকোচন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা কেবল নির্বাচন কমিশনের নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের, প্রশাসনের এবং সাধারণ নাগরিকেরও দায়িত্ব। দেশের স্থিতিশীলতা এখন এক মসৃণ সূতোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যে সূতো ছিঁড়ে গেলে অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সবকিছুই হারিয়ে যেতে পারে গভীর অস্থিরতার গর্তে।



















