ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক অভূতপূর্ব উত্তেজনায়
- আপডেট সময় : ৭২২ বার পড়া হয়েছে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে, তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন এখন দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে। এতদিন নীরবতা ও কৌশলগত সংযমের আড়ালে থাকা দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, হাইকমিশনার তলব ও রাজপথের কড়া বক্তব্য-সব মিলিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কূটনৈতিক সৌজন্যের সীমা ছাপিয়ে বিষয়টি এখন সরাসরি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে রূপ নিয়েছে।
গত রোববার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তলবকালে বাংলাদেশ সরকার জানায়, ভারতে অবস্থানরত পলাতক শেখ হাসিনা নিয়মিতভাবে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তার সমর্থকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াতে আহ্বান জানাচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, এসব বক্তব্য বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার এসব কর্মকাণ্ড আসন্ন সংসদ নির্বাচন ভণ্ডুল করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। তবে বাংলাদেশের এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেয় ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন। তারা দাবি করে, এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত।
এই কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই রাজপথে আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার প্রতিবাদে ইনকিলাব মঞ্চের আয়োজনে রাজধানীতে একটি সর্বদলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ভারতের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য দেন।
সমাবেশে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রকারীদের ভারত আশ্রয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সন্ত্রাস চালায়, ভোটচুরি করে এবং হাদিকে হত্যা করেছে-তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ভারত। এর মাধ্যমে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে।
ভারতকে সরাসরি উদ্দেশ করে তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভোটাধিকার ও মানবাধিকারকে বিশ্বাস করে না-তাদেরকে আশ্রয় দিলে আমরাও বাংলাদেশে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দিয়ে সেভেন সিস্টার্স আলাদা করে দেব। তার এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এরই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনাসহ জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে এবং ভারতীয় প্রক্সি রাজনৈতিক দল, মিডিয়া লীগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ‘মার্চ টু হাইকমিশন’ কর্মসূচি পালন করে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণকারী ঐক্যবদ্ধ মোর্চা ‘জুলাই ঐক্য’। গতকাল বুধবার আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গতকাল বুধবার দুপুর ২টা থেকে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা সেন্টার বন্ধ ঘোষণা করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এটিকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন।
ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার তলবের চার দিনের মাথায় নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বুধবার দুপুরে তাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। এই পাল্টা তলব কূটনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তার রাজনৈতিক তৎপরতাই এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে বাংলাদেশ দাবি করছে, শেখ হাসিনার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অংশ। অন্যদিকে ভারত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখার চেষ্টা করছে।
কূটনৈতিক তলব, রাজপথের কড়া বক্তব্য, আন্দোলন ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্ক এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। এই টানাপোড়েন কতদূর গড়ায় এবং তা দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে-সেদিকেই এখন নজর দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহলের।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত নসিহত করছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, ভারতের এই অযাচিত নসিহত অগ্রহণযোগ্য। আমরা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এর জন্য প্রতিবেশীদের থেকে কোনো নসিহত গ্রহণের প্রয়োজন নেই। বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্প্রতি ভারতের সেভেন সিস্টারস নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করে না। আমরা কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদীকে আমাদের ভূমিতে আমরা আশ্রয় দেব না। একজন রাজনৈতিক নেতা বলতে পারেন। কিন্তু এদেশের কোনো সরকারই এটাকে সমর্থন করবে না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ভারত সব সময় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ভূমিকাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।




















