ঢাকা ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

দাগনভূঞায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি

শাখাওয়াত হোসেন টিপু, দাগনভূঞা (ফেনী)
  • আপডেট সময় : ৬৫ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

* মূর্তিমান আতংক কিশোর গ্যাং, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, মাদকের অবাধ বিচরণ

দাগনভূঞা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে এলাকার জনমনে একদিকে উদ্বেগ-আতংক, অন্যদিকে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। থানা পুলিশের প্রতি মানুষ দিন দিন নিরবরতা হারাচ্ছে। এলাকায় দিনদিন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, মাদক, ইভটিজিং, কিশোরগ্যাং বেড়েই চলেছে।
কিশোর গ্যাং, মাদক ও মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং মাদক কেনা-বেচায় জড়িত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত এবং প্রতিদিন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত উদ্বেগজন। বর্তমান সমাজে প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে কিশোর অপরাধ অন্যতম। জেলা-উপজেলার শহর ও গ্রামীণ জনপদে কিশোর গ্যাংয়ের অসংখ্য ছদ্ম নামে টিম রয়েছে। এরা বিভিন্নস্থানে সংঘবদ্ধ হয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি, চুরি, ছিনতাই, লুটপাট, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, মাদক বাণিজ্য, ইভটিজিং এবং অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দেয়াসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে বখাটে কিশোররা। এদের বয়স ১৪ থেকে ১৮। এরা রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব অপরাধ করে থাকেন। এদের উৎপাতে দাগনভূঞার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। কিশোর গ্যাং এবং মাদক ও মাটির ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং মাদক কেনা-বেচায় জড়িত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত এবং প্রতিদিন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটছে, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
থানা পুলিশের প্রতি অনেকে অভিযোগ করে বলেন, দাগনভূঞার আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ওসির কোন মাথাব্যাথা নেই। যারা এই অপরাধের গডফাদার ওসি রাতভর খোশমেজাজে তাদের সাথে আড্ডা দিয়ে থাকেন। রাতবার তাদের সাথে আড্ডা দিয়ে দিনে নাক ডেকে ঘুমান। দিনের বেলায় কোন অকারেন্স হলে ওসিকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন না।
দাগনভূঞাতে বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকটি সক্রিয় গ্রুপ রয়ছে। যারা বিভিন্ন দেয়ালে গ্রুপভিত্তিক নাম লিখে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ভইরা দে গ্রুপ, ডিকে ২৮, এস২কে ১০, ডিআরবি-জেড। সম্প্রতি র‍্যাব ভইরা দে গ্রুপের সক্রিয় সদস্য রাকিবকে গ্রেফতার করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে, দাগনভূঞা পৌরশহরের ডাক বাংলা রোড় পুকুর পাড়, আতাতুর্ক স্কুল গেইট, মোল্লা বাড়ি রোড়, ইসহাক মার্কেটের দুই পাশে, বসুরহাট রোড়, গজারিয়া রোড় ও স্কুল মার্কেটের দোতলা থেকে ৪র্থ তলা পর্যন্ত আড্ডা দেয় এবং মাদক সেবন করে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব সদস্যরা শুধু মাদক সেবনই নই তারা চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এদের দৌরাত্মে অনেকে ভয়ে তাদের মেয়েকে স্কুলে একা দিতে পারেনা। আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটে ক্রেতাগণ ভয়ে যেতে চায়না। এরা অত্যন্ত ভয়ানক ও হিংস্র। জনসাধারণের নিরাপত্তায় এদের দমন অতিব জরুরি। কিশোর গ্যাং সদস্যরা মাদকের নেশায় পড়ে কতটা হিংস্র হয়ে উঠে তার কয়েকটি ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছে দাগনভূঞা। মাদকের জন্য টাকা না পেলে এরা এমন কোন অপরাদ নেই যে করতে পারেনা। নিজের মাকেও হত্যা করতে দ্বীধা করেনি মাদক সেবক রাফি।
গত রবিবার রাতে উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের দিলপুর গ্রামে মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মায়ের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে এক মাদকাসক্ত যুবক। ছেলের ছুরিকাঘাতে মা লাকি বেগম (৪৫) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত বাবা ও বোনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পরপরই ঘাতক ছেলে মোহাম্মদ রাফিককে (২১) রক্তমাখা ছুরিসহ আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত রাফি দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। রোববার রাতে সে বাড়িতে এসে মাদক সেবনের জন্য মায়ের কাছে টাকা চায়। মা টাকা দিতে অস্বীকার করলে এবং তার বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ে শাসন করলে রাফি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে অনলাইনে অর্ডার করে কেনা ধারালো ছুরি দিয়ে সে মায়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। মাকে বাঁচাতে বোন মিথিলা মোস্তফা (১৮) এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা (৫৫) তাদের রক্ষা করতে গেলে ঘাতক রাফি তাকেও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।
এদিকে দাগনভূঞা পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড আমানউল্লাহপুরে গত ৯ মে নিখোঁজ হয়১৮ মাস বয়সী শিশু হাসান। নিখোঁজের পর হাসানের পরিবারের কাছে অপরিচিত নাম্বার থেকে প্রথমে ১২ হাজার পরবর্তীতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ দিতে না পারায় শিশু হাসানকে হত্যা করে লাশ তার বাসার পাশে ড্রেনে ফেলে যায়। সোমবার সকালে ওই ড্রেন থেকে হাসানের লাশ উদ্ধার করা হয়।
অপরদিকে গত ২২ এপ্রিল রাতে সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজের ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাসুম এর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দলীয় প্রতিপক্ষ গ্রুপ। মাসুম জানান, তাদের জমি থেকে মাটি কেটে পুকুর ভরাট করছিলো। ওইদিন রাতে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কৃত ফটিকের লোকজন এসে মাটি কাটার জন্য ১০হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে। এবিষয়ে মাসুমের বড় ভাই মামুনের সঙ্গে কথাকাটাকাটির জেরে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে তার চাচার ঘর পুড়ে প্রায় ১০লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের পরে পৌরশহর সহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি উন্নয়ন কাজে চাঁদাদাবী করে একটি চক্র। দাবীকৃত চাঁদা না পেয়ে ওই চক্র ট্রাকসহ নির্মাণ সামগ্রী লুট এমনকি কাজে বাঁধা দিয়ে মারধরসহ হুমকি-ধামকি দেয়। এসব ঘটনায় থানায় একাধিক অভিযোগ দেয়া হয়।
ছাত্রদল নেতা, শাহীনের নেতৃত্বে ২ নং রাজাপুর ইউনিয়ন ৮ নং ওয়ার্ড গত ৯ই মেন বিএনপি নেতা মাহবুবুল হকের ছেলের উপর হা*ম*লা! নাজিম, রিসাদ, সম্রাট নামক কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা। এই হামলার সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
সম্প্রতি ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের দুধমুখা বাজারে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আজাদ আলি ও সারোয়রের নির্দেশনায় ওই ছেলেকে দুধমুখা বাজারে মারধর ও পরবর্তিতে রাতে তার বাড়ীঘর ভাংচুর করে। দাগনভূঞার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে কোন না কোন অপ্রীতিকর ঘটণা। এসব নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের ব্যবসায়ী ও আইবিডব্লিউএফের উপজেলা সভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন, দাগনভূঞাতে কিশোর গ্যাং ও মাদক এক ভয়াবহ আতংকের নাম। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত ১২/১৭ বা ১৮ বছরের কিছু উশৃংখল কিশোর দাগনভূঞার কিছু পয়েন্টে আড্ডা দিয়ে মাদক সেবন করে। স্কুলের ছাত্রীদের ইভটিজিং করে। এবং কি ছিনতাইও করে থাকে। বিশেষ করে দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের কিছু চা দোকানে তাদের আড্ডা জমে। বসে বসে ধুমপান এবং টার্গেট করে ছিনতাই করে থাকে। তাদের কারনে এ মার্কেটে কাস্টমার আসতে চায়না। কারন কাস্টমারদের সাথে এরা বাজে ব্যবহার করে, বিশেষ করে মহিলা কাস্টমার। এদের এসব বেপরোয়া আচরণ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকাও নিস্ক্রিয়।
অপরদিকে মাটি কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্ধ্যা নামলেই দাগনভূঞা বাজারের উপর যে বেপরোয়াভাবে মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে তাতে যে কোন সময় বড় দূর্ঘটণা গড়তে পারে। মাটি কাটা অবৈধ তারপরেও প্রকাশ্যে মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা।
দাগনভূঞা বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন লিটন বলেন, কিশোরগ্যাং এর কারণে দাগনভূঞা বাজারের ব্যাবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত, কিশোরগ্যাং এর বিভিন্ন গ্রুপের মারামারির কারণে ব্যাবসায়ীরা আতংকে থাকে। বিশেষ করে মহিলা ক্রেতারা আতংকিত হয়ে বাজারমুখী কম হয়। কিশোরগ্যাং দমনে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়।
দাগনভূঞা উপজেলা জামায়াতের আমীর গাজী সালেহ্ উদ্দিন বলেন, বর্তমানে মহামারীরমতোই দাগনভূঞার বড় সমস্যা মাদক ও কিশোরগ্যাং। কিশোরগ্যাং ও মাদক দাগনভূঞার এখন সবচেয়ে বড় অভিশাপ। কিশোরগ্যাংয়ের সদস্যরাই মাদক বিক্রির সাথে জড়িত, এবং সেবনও করে। আর এই মাদকের টাকা না পেলে আবার বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের আচরণ এতোই বেপরোয়া যে তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরাও ভয়ে তাদের কিছু বলতে পারেন না। মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী ও কিশোরগ্যাং এদের নির্দিষ্ট কোন দল নেই। যে দলই ক্ষমতায় আসে তারা সে দলের কতিপয় কিছু নেতার ছত্রছায়ায় থেকে এসব অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে যায়। তাই এদের প্রতিহত করা একা কারো পক্ষে সম্ভব নই। তার জন্য প্রশাসনসহ সকল রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে এদের দমন অসম্ভব।
দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন বলেন, কিশোরগ্যাং, মাদক ব্যবসা ও মাটি ব্যবসা কোনটার সাথেই দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির কোন সম্পৃক্ততা নেই। এই কিশোরগ্যাং দমন ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ৫ ই আগস্টের পর থেকেই বলে আসছি। প্রশাসনকে শতবার বলেছি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছি কিশোরগ্যাংয়ের নাম পরিচয় দিয়ে। তারপরেও প্রশাসন কিশোরগ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। আমি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আমি বারবার বলার পরেও প্রশাসন কোন কিশোরগ্যাং সদস্য বা কোন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেনি। কেন করেনি, বা কোন কারনে করেনি তা দাগনভূঞার জনগন বুঝে নিবে। তবে কিশোরগ্যাং, মাদক এসবের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান সবসময়ই অনড় আছে, থাকবে।
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সোনাগাজী সার্কেল) সৈয়দ মুমিদ রায়হান বলেন, কিশোরগ্যাং দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। এছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অথ্যাৎ যে কোন অপরাধদমনে পুলিশ কঠোর আইনীব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অপরাধী যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

দাগনভূঞায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি

আপডেট সময় :

* মূর্তিমান আতংক কিশোর গ্যাং, বেপরোয়া চাঁদাবাজি, মাদকের অবাধ বিচরণ

দাগনভূঞা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে এলাকার জনমনে একদিকে উদ্বেগ-আতংক, অন্যদিকে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। থানা পুলিশের প্রতি মানুষ দিন দিন নিরবরতা হারাচ্ছে। এলাকায় দিনদিন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, মাদক, ইভটিজিং, কিশোরগ্যাং বেড়েই চলেছে।
কিশোর গ্যাং, মাদক ও মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং মাদক কেনা-বেচায় জড়িত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত এবং প্রতিদিন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত উদ্বেগজন। বর্তমান সমাজে প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে কিশোর অপরাধ অন্যতম। জেলা-উপজেলার শহর ও গ্রামীণ জনপদে কিশোর গ্যাংয়ের অসংখ্য ছদ্ম নামে টিম রয়েছে। এরা বিভিন্নস্থানে সংঘবদ্ধ হয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারি, চুরি, ছিনতাই, লুটপাট, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, মাদক বাণিজ্য, ইভটিজিং এবং অবৈধ অস্ত্রের মহড়া দেয়াসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে বখাটে কিশোররা। এদের বয়স ১৪ থেকে ১৮। এরা রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব অপরাধ করে থাকেন। এদের উৎপাতে দাগনভূঞার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। কিশোর গ্যাং এবং মাদক ও মাটির ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কিশোর অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং মাদক কেনা-বেচায় জড়িত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত এবং প্রতিদিন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সংঘর্ষ ও রক্তপাতের ঘটনাও ঘটছে, যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
থানা পুলিশের প্রতি অনেকে অভিযোগ করে বলেন, দাগনভূঞার আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ওসির কোন মাথাব্যাথা নেই। যারা এই অপরাধের গডফাদার ওসি রাতভর খোশমেজাজে তাদের সাথে আড্ডা দিয়ে থাকেন। রাতবার তাদের সাথে আড্ডা দিয়ে দিনে নাক ডেকে ঘুমান। দিনের বেলায় কোন অকারেন্স হলে ওসিকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন না।
দাগনভূঞাতে বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকটি সক্রিয় গ্রুপ রয়ছে। যারা বিভিন্ন দেয়ালে গ্রুপভিত্তিক নাম লিখে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে ভইরা দে গ্রুপ, ডিকে ২৮, এস২কে ১০, ডিআরবি-জেড। সম্প্রতি র‍্যাব ভইরা দে গ্রুপের সক্রিয় সদস্য রাকিবকে গ্রেফতার করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব গ্রুপের সদস্যরা দলবদ্ধ হয়ে, দাগনভূঞা পৌরশহরের ডাক বাংলা রোড় পুকুর পাড়, আতাতুর্ক স্কুল গেইট, মোল্লা বাড়ি রোড়, ইসহাক মার্কেটের দুই পাশে, বসুরহাট রোড়, গজারিয়া রোড় ও স্কুল মার্কেটের দোতলা থেকে ৪র্থ তলা পর্যন্ত আড্ডা দেয় এবং মাদক সেবন করে। কিশোর গ্যাংয়ের এসব সদস্যরা শুধু মাদক সেবনই নই তারা চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এদের দৌরাত্মে অনেকে ভয়ে তাদের মেয়েকে স্কুলে একা দিতে পারেনা। আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটে ক্রেতাগণ ভয়ে যেতে চায়না। এরা অত্যন্ত ভয়ানক ও হিংস্র। জনসাধারণের নিরাপত্তায় এদের দমন অতিব জরুরি। কিশোর গ্যাং সদস্যরা মাদকের নেশায় পড়ে কতটা হিংস্র হয়ে উঠে তার কয়েকটি ঘটনার স্বাক্ষী হয়েছে দাগনভূঞা। মাদকের জন্য টাকা না পেলে এরা এমন কোন অপরাদ নেই যে করতে পারেনা। নিজের মাকেও হত্যা করতে দ্বীধা করেনি মাদক সেবক রাফি।
গত রবিবার রাতে উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের দিলপুর গ্রামে মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মায়ের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে এক মাদকাসক্ত যুবক। ছেলের ছুরিকাঘাতে মা লাকি বেগম (৪৫) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত বাবা ও বোনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পরপরই ঘাতক ছেলে মোহাম্মদ রাফিককে (২১) রক্তমাখা ছুরিসহ আটক করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত রাফি দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। রোববার রাতে সে বাড়িতে এসে মাদক সেবনের জন্য মায়ের কাছে টাকা চায়। মা টাকা দিতে অস্বীকার করলে এবং তার বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ে শাসন করলে রাফি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে অনলাইনে অর্ডার করে কেনা ধারালো ছুরি দিয়ে সে মায়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। মাকে বাঁচাতে বোন মিথিলা মোস্তফা (১৮) এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা (৫৫) তাদের রক্ষা করতে গেলে ঘাতক রাফি তাকেও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।
এদিকে দাগনভূঞা পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড আমানউল্লাহপুরে গত ৯ মে নিখোঁজ হয়১৮ মাস বয়সী শিশু হাসান। নিখোঁজের পর হাসানের পরিবারের কাছে অপরিচিত নাম্বার থেকে প্রথমে ১২ হাজার পরবর্তীতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণ দিতে না পারায় শিশু হাসানকে হত্যা করে লাশ তার বাসার পাশে ড্রেনে ফেলে যায়। সোমবার সকালে ওই ড্রেন থেকে হাসানের লাশ উদ্ধার করা হয়।
অপরদিকে গত ২২ এপ্রিল রাতে সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজের ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল্লাহ আল মাসুম এর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দলীয় প্রতিপক্ষ গ্রুপ। মাসুম জানান, তাদের জমি থেকে মাটি কেটে পুকুর ভরাট করছিলো। ওইদিন রাতে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কৃত ফটিকের লোকজন এসে মাটি কাটার জন্য ১০হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে। এবিষয়ে মাসুমের বড় ভাই মামুনের সঙ্গে কথাকাটাকাটির জেরে বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে তার চাচার ঘর পুড়ে প্রায় ১০লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের পরে পৌরশহর সহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি উন্নয়ন কাজে চাঁদাদাবী করে একটি চক্র। দাবীকৃত চাঁদা না পেয়ে ওই চক্র ট্রাকসহ নির্মাণ সামগ্রী লুট এমনকি কাজে বাঁধা দিয়ে মারধরসহ হুমকি-ধামকি দেয়। এসব ঘটনায় থানায় একাধিক অভিযোগ দেয়া হয়।
ছাত্রদল নেতা, শাহীনের নেতৃত্বে ২ নং রাজাপুর ইউনিয়ন ৮ নং ওয়ার্ড গত ৯ই মেন বিএনপি নেতা মাহবুবুল হকের ছেলের উপর হা*ম*লা! নাজিম, রিসাদ, সম্রাট নামক কিশোর গ্যাং এর সদস্যরা। এই হামলার সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
সম্প্রতি ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের দুধমুখা বাজারে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে আজাদ আলি ও সারোয়রের নির্দেশনায় ওই ছেলেকে দুধমুখা বাজারে মারধর ও পরবর্তিতে রাতে তার বাড়ীঘর ভাংচুর করে। দাগনভূঞার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে কোন না কোন অপ্রীতিকর ঘটণা। এসব নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের ব্যবসায়ী ও আইবিডব্লিউএফের উপজেলা সভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন, দাগনভূঞাতে কিশোর গ্যাং ও মাদক এক ভয়াবহ আতংকের নাম। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত ১২/১৭ বা ১৮ বছরের কিছু উশৃংখল কিশোর দাগনভূঞার কিছু পয়েন্টে আড্ডা দিয়ে মাদক সেবন করে। স্কুলের ছাত্রীদের ইভটিজিং করে। এবং কি ছিনতাইও করে থাকে। বিশেষ করে দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের কিছু চা দোকানে তাদের আড্ডা জমে। বসে বসে ধুমপান এবং টার্গেট করে ছিনতাই করে থাকে। তাদের কারনে এ মার্কেটে কাস্টমার আসতে চায়না। কারন কাস্টমারদের সাথে এরা বাজে ব্যবহার করে, বিশেষ করে মহিলা কাস্টমার। এদের এসব বেপরোয়া আচরণ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকাও নিস্ক্রিয়।
অপরদিকে মাটি কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সন্ধ্যা নামলেই দাগনভূঞা বাজারের উপর যে বেপরোয়াভাবে মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে তাতে যে কোন সময় বড় দূর্ঘটণা গড়তে পারে। মাটি কাটা অবৈধ তারপরেও প্রকাশ্যে মাটিবাহী ট্রাক চলাচল করে কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা।
দাগনভূঞা বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন লিটন বলেন, কিশোরগ্যাং এর কারণে দাগনভূঞা বাজারের ব্যাবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত, কিশোরগ্যাং এর বিভিন্ন গ্রুপের মারামারির কারণে ব্যাবসায়ীরা আতংকে থাকে। বিশেষ করে মহিলা ক্রেতারা আতংকিত হয়ে বাজারমুখী কম হয়। কিশোরগ্যাং দমনে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়।
দাগনভূঞা উপজেলা জামায়াতের আমীর গাজী সালেহ্ উদ্দিন বলেন, বর্তমানে মহামারীরমতোই দাগনভূঞার বড় সমস্যা মাদক ও কিশোরগ্যাং। কিশোরগ্যাং ও মাদক দাগনভূঞার এখন সবচেয়ে বড় অভিশাপ। কিশোরগ্যাংয়ের সদস্যরাই মাদক বিক্রির সাথে জড়িত, এবং সেবনও করে। আর এই মাদকের টাকা না পেলে আবার বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের আচরণ এতোই বেপরোয়া যে তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকরাও ভয়ে তাদের কিছু বলতে পারেন না। মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী ও কিশোরগ্যাং এদের নির্দিষ্ট কোন দল নেই। যে দলই ক্ষমতায় আসে তারা সে দলের কতিপয় কিছু নেতার ছত্রছায়ায় থেকে এসব অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়ে যায়। তাই এদের প্রতিহত করা একা কারো পক্ষে সম্ভব নই। তার জন্য প্রশাসনসহ সকল রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে এদের দমন অসম্ভব।
দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আকবর হোসেন বলেন, কিশোরগ্যাং, মাদক ব্যবসা ও মাটি ব্যবসা কোনটার সাথেই দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির কোন সম্পৃক্ততা নেই। এই কিশোরগ্যাং দমন ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ৫ ই আগস্টের পর থেকেই বলে আসছি। প্রশাসনকে শতবার বলেছি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছি কিশোরগ্যাংয়ের নাম পরিচয় দিয়ে। তারপরেও প্রশাসন কিশোরগ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। আমি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আমি বারবার বলার পরেও প্রশাসন কোন কিশোরগ্যাং সদস্য বা কোন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেনি। কেন করেনি, বা কোন কারনে করেনি তা দাগনভূঞার জনগন বুঝে নিবে। তবে কিশোরগ্যাং, মাদক এসবের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান সবসময়ই অনড় আছে, থাকবে।
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সোনাগাজী সার্কেল) সৈয়দ মুমিদ রায়হান বলেন, কিশোরগ্যাং দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। এছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অথ্যাৎ যে কোন অপরাধদমনে পুলিশ কঠোর আইনীব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অপরাধী যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।