×
  • প্রকাশিত : ২০২২-০৫-০৯
  • ৪৯ বার পঠিত
ফিচার ডেস্ক : কোন তেল রান্নায় ব্যবহার করবেন তার ওপর স্বাস্থ্য অনেকখানি নির্ভর করে। রান্নাঘরে স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহারে যেমন হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায় তেমনি অস্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রতিদিনের রান্নায় তেলের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া ভীষণ জরুরি ও অত্যাবশ্যক। সেক্ষেত্রে অন্যান্য সকল প্রকারের তেলের মাঝে রাইস ব্র্যান অয়েল সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর তেল। বাজারে প্রচলিত অন্যসব ভোজ্যতেলের তুলনায় চালের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেল রাইস ব্র্যান অয়েল বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। বিশ্বের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর তেল হিসেবেও এর স্বীকৃতি আছে।

রাইস ব্রান অয়েল সয়াবিন তেলের মতো একটি ভোজ্য তেল কোলেস্ট্রেরলমুক্ত ও প্রাকৃতিক ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। ‘রাইস ব্রান’ হচ্ছে ধানের ওপরের শক্ত আবরণের নিচে চালের ওপরের পাতলা ‘মেমব্রেন’ যা আমাদের দেশে চালের কুড়া নামে পরিচিত। অথার্ৎ ধান ভাঙলে ধানের ওপরের শক্ত আবরণ থেকে বের হয় ভুসি এবং মেমব্রেন থেকে বের হয় কুড়া। রাইস ব্রান থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত ও পরিশোধিত ভোজ্য তেলই হচ্ছে ‘রাইস ব্রান অয়েল। ২০০৬ সালে নিউজিল্যান্ডে প্রথম এই তেলের উৎপাদন শুরু করে। এখন অনেক দেশেই জনপ্রিয়। বাংলাদেশেও এর ব্যবহার বেড়েছে।

ধানের কুঁড়া থেকে তেল উৎপাদন করা যায় বা কুঁড়ায় তেল আছে তা আমাদের দেশের মানুষের ধারণায় ছিল না। ব্রেনের পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে রাইস ব্র্যান অয়েল। নিউরোনের উপকার থেকে ভিটামিনের অভাব অনায়াসে পূরণ করে এই তেল। ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। এই তেলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। তাই শরীরে ফাইবারের অভাব হলে প্রতিদিনের রান্নায় এই তেল ব্যবহার করা যেতেই পারে।
ডায়েট কন্ট্রোলে বিশেষ ভূমিকা নেয় রাইস ব্র্যান অয়েল। পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামের পাশাপাশি এই তেলে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন। রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৫ ও বি-৬।
বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার মতে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, তা জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাইস ব্র্যান অয়েলে। এতে আছে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট।

তাছাড়া, এই তেল শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, নানা ধরনের রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, রোগ প্রতিরোধী শক্তিকে উন্নত করে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
সয়াবিন, সরিষা, সূর্যমুখী ও পাম অয়েলসহ এখন পর্যন্ত যত রকমের ভোজ্যতেল ব্যবহার হচ্ছে, তার কোনোটির কাঁচামালেই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় বাংলাদেশ। ফলে চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্যতেলের সরবরাহ সচল রাখতে এসব তেলের কাঁচামাল অথবা ক্রুড বিদেশ থেকে আনতে হয়। এর বিপরীতে রাইস ব্র্যান অয়েলের কাঁচামাল অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই পুরোপুরি জোগান পাওয়া যায়। দেশের ধানকলগুলোয় উপজাত হিসেবে এটি তৈরি হয়।

বাংলাদেশে রাইস ব্রান অয়েল বা চালের কুড়ায় তেল উৎপাদন শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে। বাংলাদেশে ১৫টি রাইস ব্রান অয়েল মিলের মধ্যে বতর্মানে চালু ১৩টির উৎপাদন মতো। এর উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন হলেও বতর্মানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন রাইস ব্রান অয়েল।
স্বাভাবিক তাপে সয়াবিন তেল ব্যবহারে তেমন ক্ষতি না হলেও ভাজাপোড়ায় ব্যবহারের সময় তেলটি দীর্ঘ সময় ধরে চড়া তাপে গরম করলে এর মধ্যে থাকা ‘আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড’ রূপান্তরিত হয় ‘ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিডে’। এটি শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে রাইস ব্রান অয়েলের ‘ফ্যাটি অ্যাসিড কম্পাউন্ড’ শরীরের জন্য বেশ উপকারী। বিশেষত এ তেলের ঔষধি গুণ শরীর সুস্থ রাখে। এই তেল রক্তনালি পরিষ্কার করে এবং পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখে। শুধু তা-ই নয়, রাইস ব্রান অয়েল মরণব্যাধি ক্যানসার প্রতিরোধেও সহায়তা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নার্ভাস সিস্টেমকে আরও কার্যকর করে তোলে রাইস ব্রান অয়েল। ফলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল তৈরি হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তাই কোনো উপলক্ষ কিংবা দাওয়াতে বিশেষ খাবারের পাশাপাশি ভাজি, ভর্তা, আচার ও চাটনিতেও আজকাল এ তেলের ব্যবহার লক্ষণীয়। আর বিকেলের নাশতাকে আরও মুখরোচক করে তুলতে এর যেন কোনো বিকল্প নেই।
নিয়মিত স্বাস্থ্যকর এই তেল ব্যবহারে বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যাবে। এখানে প্রধান কয়েকটি উপকারিতা তুলে ধরা হলো।

হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখে
রাইস ব্র্যান অয়েল হার্ট-ফ্রেন্ডলি অয়েল হিসেবেও পরিচিত। কেননা অন্যান্য তেলের মতো এই তেল রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করে না। বরং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে কাজ করে। কয়েকটি পরীক্ষা থেকে দেখা গেছে, অন্যান্য ভেজিটেবল অয়েলের চাইতে রাইস ব্র্যান অয়েলের মনোআনস্যাচুরেটেড, পলিআনস্যাচুরেটেড ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমন্বয় সবচেয়ে ভালো।

ডায়বেটিসের মাত্রা কমায়
একটি গবেষণার তথ্য জানাচ্ছে, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে রাইস ব্র্যান অয়েলের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ডায়বেটিস কমিয়ে থাকে।

উচ্চতাপে গুণ অটুট
রাইস ব্র্যান অয়েলের স্মোক পয়েন্ট ২৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে এটি উচ্চতাপে রান্না করলেও সহজে গুণাগুণ নষ্ট হয় না। এ ছাড়া একই কারণে এটি রান্নায় কম ব্যবহার করলেও চলে।

কম আঠাল
রাইস ব্র্যান অয়েলের আঠাল ভাব কম। এ কারণে এটি খাবারে আটকে থাকে না। ফলে খাবারের তৈলাক্ত ভাব কম হয় এবং সহজে তেল ঝরানো যায়।

ভিটামিন-ই
রাইস ব্র্যান অয়েলে রয়েছে ভিটামিন-ই। এতে ক্যান্সারসহ শরীরের রোগ প্রতিরোধক উপাদান রয়েছে।

ত্বকের জন্য উপকারী
রাইস ব্র্যান অয়েলে স্কুয়ালেন নামে একটি উপাদান থাকায় এটি খাওয়া ত্বকের জন্য উপকারী।

ওজন কমাতে সাহায্য করে
যেহেতু রাইস ব্র্যান অয়েল কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে কাজ করে, এই তেল ওজন কমাতেও সাহায্য করে। এছাড়া অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর এই তেল মেটাবলিজমের মাত্রা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে। যা ওজন কমাতে কাজ করে।

বয়স বৃদ্ধির হার স্লথ করে
রাইস ব্র্যান অয়েল ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে এবং ত্বককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ফলে ত্বকে সহজে বলীরেখা দেখা দেয় না এবং ত্বকের আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় বজায় থাকে।

চুলের জন্য উপকারী
রাইস ব্র্যান অয়েলে রয়েছে আইনোসিটল নামক একটি কার্বোহাইড্রেট উপাদান, যা খুশকি ও চুলের আগা ভাঙা রোধ করতে কার্যকর। পাশাপাশি এই তেলে রয়েছে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডস। এই অপরিণত বয়সে চুল পাকা রোধ করে।

ক্যানসার প্রতিরোধ করে
অন্যান্য ভোজ্যতেলের তুলনায় রাইস ব্রান অয়েলের গুণগতমান ভালো। নিউইয়র্কের রোচেস্টার ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাইস ব্রান অয়েলে এন্টি-অক্সিডেন্টগুলো কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে শরীরের ভালো কোলেস্টেরল বাড়ায়, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। রাইস ব্রান অয়েল ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এককথায় বলা যায়, রাইস ব্রান অয়েল নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat