অনিয়মই যেন নিয়ম
ইসকন সদস্য বিনোদ কুমারে জিম্মি নারায়ণগঞ্জ মর্গ্যান স্কুল
- আপডেট সময় : ৫৪৮ বার পড়া হয়েছে
নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ বর্তমানে প্রশাসনিক সংকট, অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার অভিযোগে উত্তপ্ত। প্রতিষ্ঠানটির বহু শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের অভিযোগ—এরজন্য সহকারী শিক্ষক বিনোদ কুমার দেবনাথ দায়ী। তিনি স্থানীয়ভাবে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ইসকনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে তিনি নিষিদ্ধ ইসকনের কার্যক্রম চালান বলে অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন। এমনকি অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে অস্বাভাবিক প্রভাব খাটাচ্ছেন তিনি। শিক্ষকদের দাবি, বিনোদের একচ্ছত্র আচরণে শিক্ষার পরিবেশ বিপর্যস্ত এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
অভিযোগ অনুসারে, স্কুলের রুটিন দায়িত্ব মৌখিকভাবে পাওয়ার সুযোগে বিনোদ নিজেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে পরিচিত করছেন। সাংবাদিকরা তার কাছে লিখিত অনুমোদন চাইলে তিনি জেলা প্রশাসক বা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির কোনো রেজুলেশন দেখাতে পারেননি। তবুত্ত তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষক পদবি উল্লেখ করে নেইমপ্লেট ব্যবহার, প্রশাসনিক চিঠি জারি ও বিভিন্ন কমিটির ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক কর্মরত থাকা অবস্থায়ও তার এই আচরণ শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বিনোদ কুমার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদের সুবিধা প্রদান, এবং পরীক্ষার খাতা বিক্রির অর্থ ব্যবহারে গুরুতর অনিয়মে সঙ্গে জড়িত। অভিভাবকদের একটি অংশ সাংবাদিকদের বিভিন্ন অডিও-ভিডিও ক্লিপ, ভাউচার এবং অন্যান্য কাগজপত্র দেখিয়েছেন যা এসব অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, পাশের কলরব কিল্ডারগার্টেনের কিছু অর্থও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের এডহক কমিটি গঠন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিনোদের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগও নতুন নয়। স্থানীয়দের একটি অংশ জানান—গোপন নথিপত্র বহিরাগতদের হাতে দেওয়া, হল সুপারশিপে নিজের অনুগতদের বসানোসহ একাধিক কাজ তিনি করেছিলেন, যার ভিডিও ও স্থিরচিত্র অভিভাবকরা সংরক্ষণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসনের এক সহকারী কমিশনার পরিদর্শনে গেলে কিছু শিক্ষক বিক্ষোভে উত্তেজনা সৃষ্টি করলে ছয়জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়। পরে তারা দোষ স্বীকার করে মুচলেকা দিয়ে অব্যাহতি পান।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বিনোদ কক্ষের তালা ভেঙে দখল, অনুমতি ছাড়া রুম ব্যবহার, সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেয়ার চাপ ও হুমকি দিয়েছেন। বরখাস্ত থাকা অবস্থায়ও তিনি সিসিটিভি ক্যামেরার পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে মনিটরিং করতেন এবং পরীক্ষা কমিটি ও ডিউটি বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করতেন।
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—বিনোদের রুমে স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের প্রবেশ এবং তাদের কাছে গোপন নথি প্রদর্শন। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনার ভিডিও ও ছবি সংরক্ষিত আছে। এছাড়া প্রাক–নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করানোর পর বোর্ড পরীক্ষায় হঠাৎ শতাধিক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনায় অভিভাবকরা শিক্ষার গুণগত অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এসব অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকরা যখন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নুসরাত রেবেকার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন তিনি কোনো লিখিত ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া দিতে পারেননি। অভিভাবকরা মনে করেন, অধ্যক্ষের নীরবতা প্রশাসনিক পদক্ষেপকে বিলম্বিত করছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্বচ্ছতা রক্ষায় জেলা প্রশাসন, শিক্ষা বোর্ড ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। তাদের দাবি—অডিও, ভিডিও, ভাউচার কপি ও লিখিত অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
মর্গ্যান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ বহু প্রজন্মের কাছে একটি ঐতিহ্য। এক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানটি অচল হয়ে পড়লে তা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক—এমনই মনে করছেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা। তারা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রত্যাশা করছেন। যাতে স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকে।


















