ঢাকা ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

সরকারি মূল্যতালিকা থাকলেও তদারকি নেই

এলপিজির দামে নৈরাজ্য

মহিউদ্দিন তুষার, সিনিয়র রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ৫৯৩ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের বাজারে চলছে চরম মূল্য নৈরাজ্য। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যতালিকা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না খুচরা বাজারে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে বোতলপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ ভোক্তাদের।
গত রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি মাসের জন্য এলপিজি গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১,২০০ টাকার আশপাশে। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্য সমন্বয় করে এই দাম নির্ধারণ করা হয় বলে জানায় বিইআরসি। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে দাম ঘোষণা করা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা কার্যকর করতে কোনো কঠোর নজরদারি বা মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। ফলে কাগজে-কলমে নির্ধারিত দাম থাকলেও বাস্তব বাজারে চলছে ভিন্ন চিত্র।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেখানে সরকারি নির্ধারিত দামে ১২ কেজির একটি ফ্রেশ এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ার কথা প্রায় ১,২৫০ টাকায়, সেখানে তা বিক্রি হচ্ছে ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকায়। অনেক দোকানদার আবার পরিবহন খরচ, ডিলার সংকট কিংবা কোম্পানির সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। একজন ভোক্তা বলেন, সরকার যদি দাম নির্ধারণই করে, তাহলে সেটা কার্যকর করার দায়িত্ব কার? আমরা দোকানে গেলে বলছে এই দামে নিতে হলে নেন, না হলে অন্য জায়গায় যান। কিন্তু সব জায়গার অবস্থাই একই। শুধু যাত্রাবাড়িই নয়, রাজধানীর ফার্মগেট, উত্তরা, মিরপুর, ডেমরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফার্মগেটে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১,৭০০ থেকে ১,৮৫০ টাকায়। উত্তরা ও ডেমরায় দাম আরও বেশি, কোথাও কোথাও তা ১,৯০০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা নিজেরাও নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। ডিলাররা বেশি দামে সরবরাহ করায় বাধ্য হয়েই তারা ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। তবে ডিলার পর্যায়ে কীভাবে দাম বাড়ছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান তদারকি নেই।

রাজধানীর বাইরে জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আরও বেশি। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় বোতলপ্রতি ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গাজীপুরের এক বাসিন্দা বলেন, ঢাকায় যেটা ১,৭০০ টাকায় পাওয়া যায়, এখানে সেটা ১,৯৫০ টাকা নিচ্ছে। অভিযোগ করার কোনো জায়গা নেই।

জেলা পর্যায়ে পরিবহন খরচ কিছুটা বেশি হলেও ৫০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি স্পষ্টতই বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্বল তদারকির ফল। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি বাজারে বর্তমানে এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছে। সরকারি সংস্থার নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকায় তারা নির্বিঘ্নে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিইআরসি দাম ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই। ফলে কমিশনের ঘোষণা কার্যত কাগুজে সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সীমিত হওয়ায় এলপিজির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এখন এলপিজিই প্রধান রান্নার জ্বালানি। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একজন গৃহিণী বলেন, প্রতি মাসে গ্যাসেই বাড়তি ৫০০-৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে। বাজার-খরচ কমিয়ে এই টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এলপিজি বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বিইআরসির সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই নৈরাজ্য বন্ধ হবে না। সরকারি দামের সঙ্গে বাজারের দামের এই বিশাল ব্যবধান ভোক্তাদের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্রুত কার্যকর তদারকি না হলে এলপিজি বাজারে নৈরাজ্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের ব্যাপক পার্থক্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী মাসভিত্তিক এলপিজির দাম নির্ধারণ করি। কমিশনের নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কেউ বেশি দামে বিক্রি করলে সেটি স্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, খুচরা বাজারে তদারকির দায়িত্ব শুধু বিইআরসির নয়। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা অভিযোগ পেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। তবে এলপিজির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া সব এলাকায় একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট দোকানিকে জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে এলপিজি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা দায় চাপাচ্ছেন সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। রাজধানীর এক এলপিজি ডিলার বলেন, কোম্পানি থেকে আমরা অনেক সময় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস পাই। পরিবহন খরচ, শ্রমিক খরচ যোগ হলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ে। শুধু দোকানিদের দোষ দিলে পুরো চিত্রটা বোঝা যাবে না।

একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, আমরা চাইলে কম দামেও বিক্রি করতে পারি না। ডিলার যেদামে দেয়, তার নিচে গেলে লোকসান হবে। সরকার যদি সত্যিই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে সরবরাহ পর্যায় থেকেই নজরদারি বাড়াতে হবে। ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠনের নেতা বলেন, এটা পুরোপুরি তদারকির ব্যর্থতা। সরকার দাম ঘোষণা করলেও মাঠে তার বাস্তবায়ন নেই। ফলে ভোক্তারা জিম্মি হচ্ছে সিন্ডিকেটের কাছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই পরিস্থিতি বদলাবে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

সরকারি মূল্যতালিকা থাকলেও তদারকি নেই

এলপিজির দামে নৈরাজ্য

আপডেট সময় :

দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের বাজারে চলছে চরম মূল্য নৈরাজ্য। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যতালিকা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না খুচরা বাজারে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে বোতলপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ ভোক্তাদের।
গত রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি মাসের জন্য এলপিজি গ্যাসের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১,২০০ টাকার আশপাশে। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্য সমন্বয় করে এই দাম নির্ধারণ করা হয় বলে জানায় বিইআরসি। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে দাম ঘোষণা করা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা কার্যকর করতে কোনো কঠোর নজরদারি বা মনিটরিং ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। ফলে কাগজে-কলমে নির্ধারিত দাম থাকলেও বাস্তব বাজারে চলছে ভিন্ন চিত্র।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেখানে সরকারি নির্ধারিত দামে ১২ কেজির একটি ফ্রেশ এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ার কথা প্রায় ১,২৫০ টাকায়, সেখানে তা বিক্রি হচ্ছে ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকায়। অনেক দোকানদার আবার পরিবহন খরচ, ডিলার সংকট কিংবা কোম্পানির সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। একজন ভোক্তা বলেন, সরকার যদি দাম নির্ধারণই করে, তাহলে সেটা কার্যকর করার দায়িত্ব কার? আমরা দোকানে গেলে বলছে এই দামে নিতে হলে নেন, না হলে অন্য জায়গায় যান। কিন্তু সব জায়গার অবস্থাই একই। শুধু যাত্রাবাড়িই নয়, রাজধানীর ফার্মগেট, উত্তরা, মিরপুর, ডেমরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকাতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফার্মগেটে ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১,৭০০ থেকে ১,৮৫০ টাকায়। উত্তরা ও ডেমরায় দাম আরও বেশি, কোথাও কোথাও তা ১,৯০০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা নিজেরাও নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। ডিলাররা বেশি দামে সরবরাহ করায় বাধ্য হয়েই তারা ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। তবে ডিলার পর্যায়ে কীভাবে দাম বাড়ছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান তদারকি নেই।

রাজধানীর বাইরে জেলা শহর ও উপজেলা পর্যায়ে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম আরও বেশি। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় বোতলপ্রতি ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গাজীপুরের এক বাসিন্দা বলেন, ঢাকায় যেটা ১,৭০০ টাকায় পাওয়া যায়, এখানে সেটা ১,৯৫০ টাকা নিচ্ছে। অভিযোগ করার কোনো জায়গা নেই।

জেলা পর্যায়ে পরিবহন খরচ কিছুটা বেশি হলেও ৫০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি স্পষ্টতই বাজার সিন্ডিকেট ও দুর্বল তদারকির ফল। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি বাজারে বর্তমানে এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছে। সরকারি সংস্থার নিয়মিত বাজার তদারকি না থাকায় তারা নির্বিঘ্নে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিইআরসি দাম ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই। ফলে কমিশনের ঘোষণা কার্যত কাগুজে সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ সীমিত হওয়ায় এলপিজির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এখন এলপিজিই প্রধান রান্নার জ্বালানি। এমন পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। একজন গৃহিণী বলেন, প্রতি মাসে গ্যাসেই বাড়তি ৫০০-৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে। বাজার-খরচ কমিয়ে এই টাকা জোগাড় করতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এলপিজি বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বিইআরসির সঙ্গে সমন্বয় করে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রি করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই নৈরাজ্য বন্ধ হবে না। সরকারি দামের সঙ্গে বাজারের দামের এই বিশাল ব্যবধান ভোক্তাদের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দ্রুত কার্যকর তদারকি না হলে এলপিজি বাজারে নৈরাজ্য আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের দামের ব্যাপক পার্থক্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক বাজারদর ও আমদানি ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী মাসভিত্তিক এলপিজির দাম নির্ধারণ করি। কমিশনের নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কেউ বেশি দামে বিক্রি করলে সেটি স্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, খুচরা বাজারে তদারকির দায়িত্ব শুধু বিইআরসির নয়। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা অভিযোগ পেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। তবে এলপিজির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া সব এলাকায় একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট দোকানিকে জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে এলপিজি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা দায় চাপাচ্ছেন সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। রাজধানীর এক এলপিজি ডিলার বলেন, কোম্পানি থেকে আমরা অনেক সময় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস পাই। পরিবহন খরচ, শ্রমিক খরচ যোগ হলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ে। শুধু দোকানিদের দোষ দিলে পুরো চিত্রটা বোঝা যাবে না।

একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, আমরা চাইলে কম দামেও বিক্রি করতে পারি না। ডিলার যেদামে দেয়, তার নিচে গেলে লোকসান হবে। সরকার যদি সত্যিই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে সরবরাহ পর্যায় থেকেই নজরদারি বাড়াতে হবে। ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠনের নেতা বলেন, এটা পুরোপুরি তদারকির ব্যর্থতা। সরকার দাম ঘোষণা করলেও মাঠে তার বাস্তবায়ন নেই। ফলে ভোক্তারা জিম্মি হচ্ছে সিন্ডিকেটের কাছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এই পরিস্থিতি বদলাবে না।