ক্যামেরার পেছনে এক মানবিক যোদ্ধা
- আপডেট সময় : ৪১ বার পড়া হয়েছে
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাটি ও মানুষের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা শামসুল হুদা আজ রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যস্ত জীবনের এক অতি পরিচিত মুখ। পেশাগত জীবনে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ সংবাদ ক্যামেরা পারসন, লেন্সের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো খবর উঠে আসে তার হাতধরে। কিন্তু ক্যামেরার সেই ফ্রেমের বাইরেও তার একটি বিশাল জগৎ আছে। সেখানে তিনি সাংবাদিক নন, বরং এক নিঃস্বার্থ মানবসেবক। পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় ধরে রাজধানীতে বসবাস করলেও তার মন পড়ে থাকে সমাজের অবহেলিত, নিঃস্ব ও বিপন্ন মানুষের কাছে। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির মতো সৃজনশীল পেশার আড়ালে মানবিক কাজই যেন এখন তার জীবনের মূল অনুপ্রেরণা।
নেশা যখন মানবতা দৈনন্দিন পেশাগত ব্যস্ততার চাপে আমরা যখন নিজেকে নিয়ে মগ্ন, তখন শামসুল হুদা খুঁজে বেড়ান নিখোঁজ বা বিপদগ্রস্ত মানুষকে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের আপনজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজটিকে তিনি নিজের নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সময়ের আবর্তে এই সেবামূলক কাজ এখন তার কাছে এক পরম নেশায় পরিণত হয়েছে। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ভিনদেশে হারিয়ে যাওয়া বা আটকে পড়া মানুষদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতেও তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী মানবিক নেটওয়ার্ক।
সুভাষের ফিরে আসা: একটি অসম্ভব জয় শামসুল হুদার মানবিক সংগ্রামের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবক সুভাষ। ২০২১ সালে নীলফামারীতে এক রিকশাচালক তাকে রাস্তার পাশে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সুভাষ ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না, তবে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে নিজের এলাকার নাম বলার চেষ্টা করতেন। ভাষাগত জটিলতার কারণে কেউ তার সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে পারছিল না। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল তার ভবিষ্যৎ।
খবরটি পাওয়ার পর শামসুল হুদা স্থির থাকতে পারেননি। দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান তিনি। শুরু হয় সুভাষকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার এক কঠিন সংগ্রাম। দীর্ঘ সাত মাসের নিরলস প্রচেষ্টা, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও তথ্য অনুসন্ধানের পর কোনো পাসপোর্ট ছাড়াই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুভাষকে তার নিজ দেশে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন তিনি। দীর্ঘদিন পর হারানো সন্তানকে ফিরে পেয়ে সুভাষের পরিবারে যে আনন্দ বয়ে গিয়েছিল, তা কোনো শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এ পর্যন্ত ৬৪টি বিচ্ছিন্ন পরিবারকে একত্রিত করে তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন শামসুল হুদা। তার এই কাজগুলো কেবল জীবিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২১ সালে নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় আটক হওয়া ভারতীয় নাগরিক বিজলি রায় কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা যান। মৃত্যুর পর তার মরদেহ নিজ দেশে পাঠানোর জন্য কেউ যখন এগিয়ে আসছিল না, তখন শামসুল হুদা দায়িত্ব নেন। নানা দপ্তরে যোগাযোগ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবশেষে মরদেহটি তার স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২০১৯ সালে ভারতের বিহারের মানসিক ভারসাম্যহীন দীপক, যিনি পাঁচ বছর বাংলাদেশে কারাভোগ করেছিলেন তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সেই আবেগঘন মুহূর্ত আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার করে তিনি ভারতীয় নাগরিক অভিষেক কুমারকে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে শনাক্ত করেন এবং দীর্ঘ ছয় মাসের প্রচেষ্টায় তার মা পুষ্পা দেবীর কাছে ফিরিয়ে দেন।
দেশের ভেতরেও আশার আলো শামসুল হুদার মমতা কেবল সীমান্তকেন্দ্রিক নয়। ২০২০ সালে কেরানীগঞ্জের মানসিক ভারসাম্যহীন নাসির, যিনি ১০ বছর আগে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন, তাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া ছিল তার আরেকটি বড় সাফল্য। আবার নাটোর পুলিশের হাতে আটক হওয়া ভারতীয় নাগরিক শেভরনকেও অভিভাবকহীনতার কারণে যখন আবার কারাগারে যেতে হচ্ছিল, তখন শামসুল হুদা এক মাসের প্রচেষ্টায় তার পরিবারকে খুঁজে বের করেন। তিনি কেবল নিখোঁজদেরই খোঁজেন না, বরং অসহায়দের বাঁচার অবলম্বনও তৈরি করে দেন। ২০১৮ সালে সৈয়দপুরের এক অসচ্ছল নারীকে হুইল চেয়ার দেওয়া থেকে শুরু করে কিশোরগঞ্জের সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো শিশু হাবিবার মনে সাহস জোগানো—সবখানেই তার পদচারণা। হাবিবা যখন জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল, তখন শামসুল হুদা তার অভিভাবক হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
একটি অনন্য দৃষ্টান্ত শামসুল হুদার এই উদ্যোগ কেবল ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নয়, বরং তা সমাজে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সচেতন মহলের মতে, তার মতো মানুষদের কারণেই সমাজে আজও মনুষ্যত্ব বেঁচে আছে। ক্যামেরা আর কলমের বাইরেও তিনি হয়ে উঠেছেন অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। অনেকেই তার কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আজ মানবিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসছেন।
শামসুল হুদার প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও তিনি তার এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন মমত্ববোধ ছড়িয়ে পড়ুক এটাই তার একান্ত চাওয়া। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের ভালোবাসা আর দোয়াই তাকে আগামীর পথ চলতে শক্তি জোগাবে।

















