ঢাকা ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

তিস্তায় পাথর উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় সশস্ত্র হামলা, আহত ৩

ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১০৯ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

উত্তরের প্রাণ প্রবাহ তিস্তা নদী এখন ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মূখে। তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে, অর্ধশতাধিক সিক্স-সিলিন্ডার বোমা মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ খুঁড়ে পাথর উত্তোলন চলছে। এক মাস আগেও যেখানে ১৫–২০টি মেশিন ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০টির বেশি। সবচেয়ে বেশি উত্তোলন হচ্ছে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি ও দোহলপাড়া এলাকায়।
ডিমলা ও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে বোমা মেশিন দিয়ে লাগামহীনভাবে চলছে অবৈধ পাথর উত্তোলন। এতে নদীর তলদেশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে তৈরি হচ্ছে গভীর খাদ, বদলে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক গতিপথ—যার পরিণতিতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের নদীভাঙনের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় তিন ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। গত সোমবার (১৬ মার্চ) টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি এলাকায় পাথর উত্তোলনকারী চক্রের হামলায় যাদু মিয়া (৪০), এমদাদুল হক (২৭) ও সামসুল হক (৬০) গুরুতর আহত হন। তাদের ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো,শওকত আলী সরকার ।
পাথর পরিবহনের জন্য নদীর বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী সড়ক। এসব সড়ক দিয়ে দিন-রাত চলছে শত শত ট্রলি। ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক স্থানে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, পাশাপাশি সড়ক সংস্কারে বাড়ছে সরকারি ব্যয়।
শুধু অবকাঠামো নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে। রাতভর বোমা মেশিনের বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনপদ। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে। শব্দদূষণে ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর তলদেশ থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর ভারসাম্য নষ্ট হয়, গভীর খাদ সৃষ্টি হয় এবং স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। এতে নদীপাড়ের বসতভিটা, ফসলি জমি ও অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১২ সালে হাইকোর্ট দেশের নদ-নদী থেকে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দিলেও তিস্তা নদীতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার করা রিটের পরও বাস্তবতা রয়ে গেছে অপরিবর্তিত।
নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সাত্তার জানান, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিস্তা নদী হতে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে যৌথ অভিযানে কয়েকটি মেশিন ধ্বংস ও ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরকে ‘ম্যানেজ’ করে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি বোমা মেশিন থেকে প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হওয়ায় পাথর উত্তোলনকারীরা যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয় এবং অভিযান শেষ হলেই আবার শুরু করে কার্যক্রম।
কৃষকরা যখন সেচের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না, তখন পাথর উত্তোলনকারীরা নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছে শত শত লিটার জ্বালানি। এতে জ্বালানির উৎস ও বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান জানান, ইতোমধ্যে কয়েক দফা অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং শিগগিরই আরও বড় পরিসরে অভিযান চালানো হবে।
তিস্তাপাড়ের মানুষ বলছেন, দ্রুত এই অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ না হলে আসন্ন বর্ষায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেবে এবং বহু পরিবার নতুন করে গৃহহীন হবে।
তিস্তা নদী রক্ষায় এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ নদী ও তার তীরবর্তী জনপদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

তিস্তায় পাথর উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় সশস্ত্র হামলা, আহত ৩

আপডেট সময় :

উত্তরের প্রাণ প্রবাহ তিস্তা নদী এখন ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মূখে। তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে, অর্ধশতাধিক সিক্স-সিলিন্ডার বোমা মেশিন দিয়ে নদীর তলদেশ খুঁড়ে পাথর উত্তোলন চলছে। এক মাস আগেও যেখানে ১৫–২০টি মেশিন ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০টির বেশি। সবচেয়ে বেশি উত্তোলন হচ্ছে টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের বার্নির ঘাট, তেলীর বাজার, তিস্তা বাজার, চরখড়িবাড়ি ও দোহলপাড়া এলাকায়।
ডিমলা ও লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে বোমা মেশিন দিয়ে লাগামহীনভাবে চলছে অবৈধ পাথর উত্তোলন। এতে নদীর তলদেশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে তৈরি হচ্ছে গভীর খাদ, বদলে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক গতিপথ—যার পরিণতিতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের নদীভাঙনের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় তিন ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন। গত সোমবার (১৬ মার্চ) টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ি এলাকায় পাথর উত্তোলনকারী চক্রের হামলায় যাদু মিয়া (৪০), এমদাদুল হক (২৭) ও সামসুল হক (৬০) গুরুতর আহত হন। তাদের ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো,শওকত আলী সরকার ।
পাথর পরিবহনের জন্য নদীর বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী সড়ক। এসব সড়ক দিয়ে দিন-রাত চলছে শত শত ট্রলি। ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনেক স্থানে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, পাশাপাশি সড়ক সংস্কারে বাড়ছে সরকারি ব্যয়।
শুধু অবকাঠামো নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে। রাতভর বোমা মেশিনের বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনপদ। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে। শব্দদূষণে ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর তলদেশ থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর ভারসাম্য নষ্ট হয়, গভীর খাদ সৃষ্টি হয় এবং স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। এতে নদীপাড়ের বসতভিটা, ফসলি জমি ও অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১২ সালে হাইকোর্ট দেশের নদ-নদী থেকে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দিলেও তিস্তা নদীতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার করা রিটের পরও বাস্তবতা রয়ে গেছে অপরিবর্তিত।
নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সাত্তার জানান, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিস্তা নদী হতে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে যৌথ অভিযানে কয়েকটি মেশিন ধ্বংস ও ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরকে ‘ম্যানেজ’ করে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি বোমা মেশিন থেকে প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের আগেই তথ্য ফাঁস হওয়ায় পাথর উত্তোলনকারীরা যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেয় এবং অভিযান শেষ হলেই আবার শুরু করে কার্যক্রম।
কৃষকরা যখন সেচের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না, তখন পাথর উত্তোলনকারীরা নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছে শত শত লিটার জ্বালানি। এতে জ্বালানির উৎস ও বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান জানান, ইতোমধ্যে কয়েক দফা অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং শিগগিরই আরও বড় পরিসরে অভিযান চালানো হবে।
তিস্তাপাড়ের মানুষ বলছেন, দ্রুত এই অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ না হলে আসন্ন বর্ষায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দেবে এবং বহু পরিবার নতুন করে গৃহহীন হবে।
তিস্তা নদী রক্ষায় এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ নদী ও তার তীরবর্তী জনপদের জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়।