ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু
- আপডেট সময় : ৯১ বার পড়া হয়েছে
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বহুল কাঙ্খিত জাতীয় নির্বাচনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আজ। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ ভবনের মূল কক্ষে এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন। বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ শুরু হচ্ছে নতুন সংসদের যাত্রা। প্রথা অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মধ্য দিয়ে সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। এছাড়া বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও ১০ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে দলটির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, তাদের মধ্য থেকেই কাউকে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
দীর্ঘ সময় পর এবার প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। অধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই আন্দোলন ছিল রক্তক্ষয়ী। ফলে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। ক্ষমতার চর্চার পরিবর্তে মানবকল্যাণে একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলবেন তারা—এমন প্রত্যাশাই করছেন নাগরিকরা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের লক্ষ্যে গঠন করা হয় বিভিন্ন সংস্কার কমিশন। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সুপারিশে খাতভিত্তিক আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠে আসে। সেইসব সুপারিশ ও সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নতুন সংসদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে নির্বাচন সঠিকভাবে হয়নি এবং কার্যকর বিরোধী দলও ছিল না। এখন মানুষের প্রত্যাশার জায়গায় পরিবর্তন এসেছে। ‘আমরাই সব, আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ’-এমন মনোভাব পরিহার করে যদি সংসদ পরিচালিত হয়, তবে এখান থেকেই দেশের গণতন্ত্রের একটি শুভ সূচনা হতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, বর্তমান সংসদের প্রায় ৭০ শতাংশ সদস্য নতুন। তাদের অনেকেরই সংসদীয় অভিজ্ঞতা নেই। আবার প্রায় ৭০ শতাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী পটভূমির। অতীতে সংসদে প্রায়শই দেখা গেছে—সরকার যা করে তা ‘অতি ভালো’ এবং বিরোধীরা ‘অতি খারাপ’-এমন সরলীকৃত অবস্থান। এর বাইরে কেন ভালো বা কেন খারাপ—সে ধরনের বিশ্লেষণমূলক আলোচনা কমই হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সংসদ এ দিক থেকে ভিন্নতা দেখাবে। তিনি আরও বলেন, সংস্কার কমিশনের অনেক সুপারিশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাস্তবায়ন করেনি। ভবিষ্যতে নতুন সরকার কতটা বাস্তবায়ন করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এছাড়া জুলাই সনদের কিছু ধারা বর্তমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংসদ যদি সংবিধানবিরোধী কোনো সংশোধন পাশ করে, তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে প্রায় নয় মাস আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জুলাই সনদ’। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এ সনদের প্রতি জনগণের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এর চূড়ান্ত কাঠামো কার্যকর করতে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মেনেই সরকার পরিবর্তন ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। তাই সংস্কারকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। অন্যদিকে এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ইতোমধ্যে জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেগুলোর কতটুকু গৃহীত হবে এবং কতটুকু বাতিল হবে—তার ওপরই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। এ নিয়ে এখনই হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি মনে করেন। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রশ্নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে তাই গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচনা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।























