নিভে গেলো আশার বাতি
- আপডেট সময় : ২৩৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহনশীলতা, শালীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী নন, বরং দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতিতে ভারসাম্য, ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রতিকূল পরিবেশ এবং নানা সংকটের মধ্যেও তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিরোধী দলের প্রতি শালীন ভাষা ব্যবহার এবং সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে আন্দোলনে বিশ্বাস ছিল তার রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য। সংসদীয় গণতন্ত্র, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি বরাবরই সোচ্চার ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে নানা কষ্ট ও রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে চাপের মুখে থেকেও তিনি সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির বদলে রাজনৈতিক সমাধান ও সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার তুলে ধরেছেন। এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া শালীন ও সহনশীল নেতৃত্বের এক স্মরণীয় নাম হয়ে আছেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদে বাংলাদেশ আজ শোকে স্তব্ধ। দেশের শীর্ষ অভিভাবক ছিলেন তিনি। এমন মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা দেশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে গভীর শোকের ছায়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকা, গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয় এলাকায় অগণিত নেতা-কর্মীকে আহাজারি করতে দেখা গেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করে বার্তা দিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে কখনোই পরাজিত হননি। বগুড়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনায় ভোটের মাঠ বদলেছে, কিন্তু ফলাফল বদলায়নি। পাঁচ নির্বাচনে মোট ২৩টি আসন থেকে প্রার্থী হয়ে প্রতিটিতেই জিতেছেন। ব্যালট পেপারে তাঁর নাম মানেই যেন জয়ের নিশ্চয়তা। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী রেকর্ডের সঙ্গে কেউ পাল্লা দিতে পারেনি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি কখনো পরাজয়ের মুখ দেখেননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি করে আসনে প্রার্থী হয়ে জয় পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই বিজয়ী হন।
১৯৮০-এর দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশকে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ সময় নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য তিনি ২০০৫ সালে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী’ তালিকায় স্থান পান, যেখানে তিনি ২৯তম স্থানে ছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯০-এর দশকে প্রমাণ করেছেন যে, নারী নেতৃত্ব শুধু দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্ভবই নয়, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুরুষশাসিত সমাজকেও পাল্টে দিতে পারে। তাঁর যাত্রা কেবল অর্জনের গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বেগম খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক জীবন সংগ্রাম, গণআন্দোলন, নির্বাচনী জয়, রাজনৈতিক দমন এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা মাধ্যমে চিহ্নিত। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে সামরিক শাসনের কঠিন সময়ে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
খালেদা জিয়া তাঁর এক ঐতিহাসিক বক্তব্যে বলেছিলেন, ডান কিংবা বামপন্থী আমরা নই। আমাদের ডানে যাদের অবস্থান তারা ডানপন্থী, আমাদের বামে যাদের অবস্থান তারা বামপন্থী। আমাদের অবস্থান ডানপন্থীর বামে এবং বামপন্থীর ডানে। অর্থাৎ বিএনপিকে তিনি মধ্যমপন্থী উদার একটি ধারার দল হিসেবেই গড়ে তুলেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের গড়া বাকশাল নামক একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসানের পর বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ ও ইসলামপন্থী দলের রাজনীতি ফিরিয়ে আনেন। তিনিই এই মধ্যম ধারার দৃষ্টিভঙ্গির সফল বাস্তবায়ন ঘটান। জিয়াউর রহমান যেমন ছিলেন চুপচাপ স্বভাবের খালেদা জিয়াও তাই। তাদের নীতি ছিল, কথা কম কাজ বেশি। এই বিরল যুগলের মধ্যে খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক নীপিড়ন, হয়রানি, প্রপাগান্ডার শিকারও হয়েছেন বেশি খালেদা জিয়া। আবার মধ্যপন্থী উদার ধারা প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদানও সবচেয়ে বেশি।
সম্মান মানুষের কাজ, আদর্শ ও চরিত্রের নিরব মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জোর করে আদায় করা শ্রদ্ধা স্থায়ী হয় না, কিন্তু প্রকৃত সম্মান ঠিকই থেকে যায়। বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক জীবন এই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। প্রতিকূলতার মুখেও খালেদা জিয়ার অঙ্গীকার, সাহস ও দৃঢ়তা তাঁকে কোটি মানুষের হৃদয়ে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। তাঁর সমর্থক ও লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কাছে খালেদা জিয়া গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের এক মূর্ত প্রতীক। কারাজীবন, আইনি লড়াই এবং ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টের মুখেও তিনি কখনো দমে যাননি। তাঁর সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গড়ে তুলতে, কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে এবং নারী নেতৃত্বে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার তাঁর এই যাত্রা স্থিতিস্থাপকতা, সাহস ও দৃঢ়তার এক গল্প। রাজনৈতিক উপাধির বাইরে তাঁর উত্তরাধিকার হলো-তিনি এই বার্তা রেখে গেছেন যে, সততা, অধ্যবসায় এবং সত্যের অন্বেষণ সবচেয়ে কঠিন ঝড়কেও মোকাবিলা করতে পারে।





















