খালেদা জিয়ার জানাজায় নজিরবিহীন জনসমুদ্র, অশ্রুসিক্ত চোখে নীরব শ্রদ্ধা # শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে সমাহিত
হৃদয়ে চিরস্থায়ী দেশনেত্রী
- আপডেট সময় : ৪৫১ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচিত হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাকে ঘিরে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত এই জানাজা স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ জড়ো হন। সকাল থেকেই জানাজাস্থল ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে, যা ক্রমেই রূপ নেয় নজিরবিহীন জনসমুদ্রে। রাজনৈতিক বিভাজন ছাড়িয়ে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জানাজাকে পরিণত করে এক আবেগঘন জাতীয় বিদায়ে। অশ্রুসিক্ত চোখে, নীরব শ্রদ্ধায় ও দোয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ স্মরণ করেন সাহসী, আপসহীন ও গণতন্ত্রের সংগ্রামে অগ্রণী এই নেত্রীকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এমন বিশাল জনসমাগম ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেকের ইমামতিত্বে বেলা বুধবার বেলা ৩টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাবৃন্দ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানগণ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। মুসলিম দেশগুলোর কূটনীতিকরা জানাজায় অংশ নেন।
খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল। এ ছাড়া জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে অংশ নেন ঢাকায় নিযুক্ত লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালিব এস এম সোলায়মান, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রিলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মেগান বোল্ডিন, রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত একেতেরিনা সেমনোভা, সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার মিশেল লি, ফিলিস্তিনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জিয়াদ এম হামাদ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, দক্ষিণ কোরিয়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জিনহি ব্যাক, বৃটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং, ইরানের রাষ্ট্রদূত মানসুর চাভেশি প্রমুখ।
এছাড়া বিশিষ্ট নাগরিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বিএনপির শীর্ষ নেতারা ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপস্থিতি হন। এ সময় তারা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম ও অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরিবারের সদস্যদের প্রতিনিধি, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবীসহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অংশ নেন। ধর্মীয় নেতারাও জানাজায় অংশ নিয়ে প্রয়াত নেত্রীর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় মানুষের ঢল নামে সকাল থেকেই। রাস্তা, ফুটপাত, পার্শ্ববর্তী এলাকা-সবখানেই ছিল মানুষের ভিড়। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ, বয়স্ক নাগরিক সব শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি জানাজাকে পরিণত করে এক ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে। জাতীয় নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই বিশাল সমাবেশে।
জানাজার আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে যানজট সৃষ্টি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ রাতেই ঢাকায় এসে পৌঁছান। অনেকেই হাতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা, ব্যানার ও পোস্টার নিয়ে নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। কেউ কেউ আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। এমন সাহসী ও আপসহীন নেত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে আবার আসবেন কি না জানি না এমন মন্তব্য শোনা যায় সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
জানাজা উপলক্ষে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। নির্ধারিত স্থানে কফিন স্থাপন, মাইকিং ব্যবস্থা, কাতারবদ্ধভাবে নামাজ আদায়ের আয়োজনসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয় যথাযথভাবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত কফিনে জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সাহসী ও দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের প্রতীক। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আপসহীন অবস্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তার অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা শুধু একটি দাফন অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে-তিনি শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, ছিলেন একটি সময়ের প্রতীক। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, এমন জনসমাগম ও আবেগঘন বিদায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার আবির্ভাব এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর আশির দশকের শুরুতে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে আরও দুই দফা দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্ষমতায় থাকাকালীন যেমন তিনি দৃঢ় নেতৃত্ব দেখিয়েছেন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন আপসহীন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাকে একাধিক মামলায় কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার সময়েই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা ও গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও তিনি রাজনৈতিকভাবে ছিলেন অবিচল।
শেষ জীবনে দীর্ঘ অসুস্থতার পর এই সাহসী নেত্রী বিদায় নেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন ও নজিরবিহীন জানাজা প্রমাণ করে-বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী নন, তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্ব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।





















