পঙ্গু দশা দাগনভূঞা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের
চিকিৎসক ও জনবল সংকট, ভোগান্তিতে রোগীরা
- আপডেট সময় : ১০৭ বার পড়া হয়েছে
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, উপ-সহকারি মেডিকেল অফিসার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর লোকবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। চিকিৎসক সংকটে বাড়তি চাপে হিমশিম পোহাতে হচ্ছে কর্মরত চিকিৎসকদের। এতে সঠিক সেবা নিশ্চিত করণে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অন্যদিকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে শুরু করে সীমানা প্রাচীরের নড়বড়ে পরিস্থিতিতে উৎকণ্ঠিত আন্তঃবিভাগে ভর্তি রোগী সহ আবাসিক এলাকা। এমন পরিস্থিতিতে বহিঃ বিভাগ ও আন্তঃবিভাগে চিকিৎসাসেবায় নেমে এসেছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
এই দিকে গত ২১ শে ডিসেম্বর রোববার বেলা সা্রে এগারোটায় রোগী হয়রানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে কর্তব্যরতদের বিরুদ্ধে। এ সময় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ফটকে তালা দিয়ে সাংবাদিকদের আটকিয়ে মোবাইলে ধারণকৃত ফুটেজ ডিলেট সহ মোবাইল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার নিউজ স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়েছে।
দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগে জনগনের সঠিক সেবা নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি স্থানীয়দের।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রাপ্ত তথ্যমতে, উপজেলা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৩৪জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ১৮জন। মেডিকেল অফিসার ১৫ জনের মধ্যে ১ জন সদর হাসপাতালে, ১ জন জেলা কারাগার সংযুক্ত, মাতৃত্বজনিত ছুটিতে ১ জন, অননুমোদিত অনুপস্থিত (২৬ জুলাই থেকে) ডা. মোহাম্মদ আমির ইনতিসার সায়িম ছাড়া কর্মরত রয়েছেন ১১ জন। এছাড়া আবাসিক মেডিকেল অফিসার, জুনিয়র কনসালটেন্ট গাইনী ও অবস, জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, জুনিয়র কনসালটেন্ট অর্থোপেডিক্স, জুনিয়র কনসালটেন্ট চক্ষু, জুনিয়র কনসালটেন্ট ইএনটি, নিয়র কনসালটেন্ট চর্ম ও যৌণ, আইএমও, ইএমও, প্যাথলজিষ্ট, এ্যানেসথেটিষ্ট পদগুলো শূণ্য রয়েছে। এছাড়া নার্সিং সুপারভাইজার ণ্যপদ, সিনিয়র স্টাফ নার্স ২৪ জনের মধ্যে রয়েছেন ১৯ জন ৫ জন শূণ্য, মিডওয়াইফ ৬ জনের মধ্যে আছেন ২ জন। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী বিভিন্ন পদে ৮৮ জনের মধ্যে আছে ৬১ জন বাকি ২৭ টি পদ শূণ্য। সিএইচসিপি ২৮ জনের মধ্যে রয়েছেন ২৫ জন। চতুর্থ শ্রেণীর মধ্যে ল্যাব এ্যাটেনডেন্ট থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার পর্যন্ত ২৪ জনের মধ্যে রয়েছে ৭ জন, ১৭ জনের পদ শূণ্য। প্রথম শ্রেণীর ৩৪ জনের মধ্যে ১৮ জন, দ্বিতীয় শ্রেণির ৩১ জনের মধ্যে ২৩ জন, তৃতীয় শ্রেণীর ৮৮ জনের মধ্যে ৬১ জন, চতুর্থ শ্রেণীর ২৪ জনের মধ্যে ৭ জন কর্মরত। বাকি ৬৮ জনই শূণ্য রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪শ থেকে ৫শ রোগী বহিঃবিভাগে চিকিৎসা সেবায় প্যাথলজিসহ অন্যান্য বিভাগের হিসেবমতে ২৪ সালে শুধুমাত্র ডিসেম্বরে রাজস্ব আয় ১ লাখ ৫৬ হাজার ২১১ টাকা, ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত রাজস্ব আয় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৪ টাকা। চলতি বছর ডিসেম্বর মাসে সিজার রোগীর সংখ্যা ৫ জন। আনুপাতিক হারে রাজস্ব আয় অনেকটাই কমে গেছে যার অন্যতম কারণ অব্যবস্থাপনা বলে সূত্র জানায়। দিনদিন যেখানে বৃদ্ধি হওয়ার কথা সেখানে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়াতে হাসপাতাল নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ! সরেজমিনে জানা যায়, প্রতি কর্মদিবসে সকাল সাড়ে আটটা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসক চেম্বারে থাকার কথা থাকলেও কেউ ১০টার আগে চেম্বারে আসেন না। চিকিৎসক সংকটে থাকায় অনেক রোগী দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে বাড়তি চাপ নিয়ে রোগী দেখেন কর্মরত চিকিৎসকগণ। হাসপাতালে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নসহ শৃংখলার কোন রকম নিয়মনীতি নেই। অনেক রোগী বিভিন্ন রোগের পরিক্ষা-নিরিক্ষার সুযোগ সুবিধা নিতে চাইলেও তা যথেষ্ট নয় কারণ প্যাথলজিতে লোকবল সংকট ও অফিস টাইমের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২৪ সাল লনায় ২০২৫ সালে রাজস্ব আয় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। এতে সরকার বিশাল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনবল ও হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কারনে এমনটি জানিয়েছেন রোগীগণ। তারা আরো জানান, এক্সরে মেশিন দীর্ঘ বছর বন্ধ, যতটুকু সেবা নিশ্চিত পাওয়ার কথা তাও দিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার মনোভাব ও দক্ষতার অভাব রয়েছে বলে ধারণা করছেন।
ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে কারা আসে এমন প্রশ্ন করে রোগীরা জানান, নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন কিন্তু তাদের সে সেবাটুকু দিতে চিকিৎসকরা হিমশিম খেতে হয়। এমতাবস্থায় এ জেনারেল হাসপাতাল কি শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস করার জন্য নাকি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য! হয়রানি কিংবা রোগীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ, রাতের বেলায় ভুতুড়ে পরিবেশ, নার্সদের আন্তরিকার অভাব, জরুরি বিভাগে বেশীরভাগ সময় ডিপ্লোমা চিকিৎসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এ হাসপাতাল। এতগুলো জুনিয়র কনসালটেন্ট, মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলে কেন চিকিৎসক সংকট কেনবা চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছেন না অথবা রোগীদের ভোগান্তির কথা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না এটাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারনে রোগীদের ভোগান্তি কবে শেষ হবে প্রশ্ন অজানা। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার জরুরি অথচ সেখানেই নাজুক পরিস্থতি বিদ্যমান যা হতাশাজনক মনে করেন সচেতনমহল।
আগত শিশু রোগীর মা তাসলিমা আক্তার জানান, দুই মাসের শিশুকে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গেলে তারা বলেন শিশু রোগী আমরা দেখিনা ফেনীতে নিয়ে যান। কোনরকম পরামর্শ প্রদান করেননি।
জরুরি বিভাগে কেন মেডিকেল অফিসার সার্বক্ষণিক থাকবে না এমন প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ডা. সুনন্দ সেন জানান, প্রচুর অফিশিয়াল কাজ থাকে যা করে আউটডোরে বসা বা ইমারজেন্সীতে দায়িত্ব পালন করা কষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসকের জায়গায় এখন চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন মাত্র ৬ জন চিকিৎসক। এতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অন্যান্যরা জানান, চিকিৎসক সংকট এর দায়ভার কার? এতগুলো চিকিৎসক সংকট থাকলে হাসপাতালের কর্মকর্তার কাজটা কি! নানান ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারি জানান, (সেকমো) উপ সহকারি মেডিকেল অফিসারদের দায়িত্ব বেশী পালন করতে হয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। চিকিৎসক যারা আছেন তারাও করতে বাধ্য নতুবা সমস্যা আছে। পিয়ন করে ড্রাইভারের কাজ, আয়া করে ড্রেসিং এর কাজ, যার দায়িত্ব যেটা তিনি সেটা তো করেন বাড়তি আরো কাজ করতে হয় যা পূর্বে কখনও ছিলো না। এভাবে হাসপাতাল সঠিকভাবে চলতে পারেনা বলে ও জানান তিনি।
আগত রোগী মাসুদ আহমেদ জানান, হাসপাতালে পরিবেশ এতটা খারাপ পাশাপাশি রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। একজন বলেন আরেকজনের নাম এটাই চলছে। বড়লোকরা তো আর এখানে চিকিৎসা করাতে আসেন না যত সমস্যা গরীবদের জুএগুলো দেখার কেউ নেই।
দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম সোহরাব আল হোসাইন জানান, হাসপাতালে জুনিয়র কনসালটেন্টসহ মেডিকেল অফিসার ও বিভিন্ন পদগুলো কিছু খালি রয়েছে। এসব বিষয়ে উর্ধতন কতৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। মেডিকেল অফিসাররা কেন চলে যান এসব বিষয়ে জানান, কেউ ট্রান্সফার নিলে বা হলে আমার কিছু করার থাকে না। তবে রোগীর সংখ্যা ফেনী জেলায় দাগনভূঞা উপজেলা এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সর্বোচ্চ যা আমরা সেবা প্রদান করছি এবং তা অব্যাহত রয়েছে।














