জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাদি
- আপডেট সময় : ৪৫৫ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর ব্যস্ততম কাকরাইল বক্স কালভার্ট সড়কের ডিআর টাওয়ারের সামনে দিনে দুপুরে অস্ত্রধারীরা মাথায় গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদীকে। আহত শরিফ ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে হাদি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারী বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে তার মাথা থেকে গুলি অপসারনের চেষ্টা চলছে। রাত ৮টায় এরির্পোট লেখার সময় গুলিবিদ্ধ শরিফ ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসায় এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
হাদি গুলিবিদ্ধের ঘটনায় আইন শৃংখলা বাহিনী হত্যা চেষ্টাকারীদের সনাক্ত এবং গ্রেফতার করতে পারেনি। এ ঘটনায় অবৈধ অস্ত্রধারিদের গ্রেফতার এবং শাস্তি নিশ্চিত করনের দাবিতে ঢাবি, রাবিসহ সারাদেশের শিক্ষাঙ্গন এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উঠে প্রতিবাদের ঝড়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে,হাদি যাচ্ছিলেন রিকশায়। ঘাতকরা একটি মোটর সাইকেলে এসে খুব কাছ থেকে মাথায় লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এরপরই অস্ত্রধারিরা আগত মোটরসাইকেল যোগে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ডিআর টাওয়ারের একাধিক নিরাপত্তা কর্মী জানান, ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে রাজধানীর বিজয়নগরে গুলি করা হয়েছে। ঘটনার সময় তিনি রিকশায় করে যাচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে অস্ত্রধারিরা।
সিকিউরিটিরা জানান, গতকাল শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কে বা কারা গুলি ছুড়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে তিনটি মোটর সাইকেলে করে দুর্বৃত্তরা আসে। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। হাদি এসময় রিকশায় করে ফকিরের পুল থেকে বক্স ক্লভার্ট রোড হয়ে বিজয়নগর যাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় হাদির সঙ্গে রিকশায় আর কেউ ছিলেন কি না তা জানা যায়নি। তবে হত্যার আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটের সদস্যরা।
এবিষয়ে জুলাই ঐক্যের অন্যতম সংগঠক ইস্রাফিল ফরায়েজী জানিয়েছেন, নির্বাচনি প্রচারকালে হাদিকে গুলি করা হয়। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র মাথার পেছনে এবং কানের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে এ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিতভাবে কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত নভেম্বর মাসে হাদি জানিয়েছিলেন, তিনি দেশি-বিদেশি ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পেয়েছেন। ১৪ নভেম্বর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেছিলেন, তাকে হত্যা, তার বাড়িতে আগুনসহ তার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
হাদি লিখেছিলেন, গত তিন ঘণ্টায় আমার নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশি নম্বর থেকে কল ও টেক্সট করেছে। যার সামারি হলো, আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলির প্রতিবাদে আজ শনিবার রাজধানীসহ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের আগে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নস্যাৎ করতে নীলনকশা অনুযায়ী ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর গুপ্ত হামলা বাড়ছে। আজ দুপুরে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে গুরুতর আহত করা হয়। তিনি বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
রিজভী বলেন, একটা অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নস্যাৎ করার জন্য নীলনকশা অনুযায়ী হামলা চলছে। ওসমান হাদির ওপর হামলা তারই অংশ। এর আগেও দেড় মাস আগে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদুল্লাহকে গুলি করে আহত করা হয়েছিলো।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি ও বিরোধী নেতাদের ওপর দুষ্কৃতিকারীদের হামলা বাড়ছে। এসব হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতেই বিএনপি সারাদেশে বিক্ষোভ করবে।
রিজভী ঘোষণা করেন, আগামীকাল ১৩ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠন বিক্ষোভ মিছিল করবে। হাদির ওপর হামলার ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার দাবিতেই এ কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি।
অন্যদিকে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা দেশে পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
গতকাল শুক্রবার দলের যুগ্ম সদস্যসচিব এবং মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীনের পাঠানো এক বার্তায় এ মন্তব্য করা হয়। সেই সঙ্গে হামলার তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বার্তায় বলা হয়, এই হামলা শুধু একজন প্রার্থীর ওপর নয়, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ওপরও সরাসরি আঘাত। এনসিপি গুরুতর আহত শরিফ ওসমান হাদির দ্রুত সুস্থতা কামনা এবং দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া প্রার্থনা করছে।
এই হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নির্বাচনি পরিবেশের ভঙ্গুরতা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয় বলে বার্তায় উল্লেখ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হাদি হামলার আগে হুমকির কথা প্রকাশ্যে জানানোর পরও তার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এর আগে এনসিপি কার্যালয়ের সামনে বারংবার ককটেল হামলা এবং একজন প্রার্থী হুমকি পাওয়ার পরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের চরম ব্যর্থতা দায়িত্বহীনতা, অদক্ষতা ও উদাসীনতার নগ্ন উদাহরণ, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এনসিপি জানায়, দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগ জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে এবং তাদের অবশিষ্ট সন্ত্রাসী বাহিনী এখনো সক্রিয়ভাবে দেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সরকার যদি অবিলম্বে আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা না করে, তবে তারা আবারও গণতান্ত্রিক উত্তরণকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং দেশকে সহিংস অরাজকতার দিকে ঠেলে দেবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এখন গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর একে অপরকে দোষারোপ করে রাজনৈতিক লাভ তোলার সময় নয়। এখন সময় প্রকৃত অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি আনার। গণঅভ্যুত্থানের শক্তি যদি বিভক্ত হয়, তাহলে সুযোগ নেবে পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও দেশবিরোধী চক্র, যারা অতীতেও হত্যা ও সহিংসতার মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষিত করেছে, যোগ করা হয় বার্তায়।
এনসিপি দেশের নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, পরিবর্তনের পথযাত্রায় থাকা সব গণতান্ত্রিক শক্তি এবং সর্বোপরি দেশের আপামর জনগণকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানায়। তারা দৃঢ়ভাবে জানাতে চায়, যেকোনো হুমকি, ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- উপেক্ষা করে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে এনসিপি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বর থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কাজলা গেট হয়ে তালাইমারী মোড়ে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। তারা বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের হুঁশিয়ার করে বলতে চাই, তোমাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেওয়া হবে। ইন্টেরিম সরকারকে বলছি, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, নয়তো আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। সমাবেশ শেষে গুলিবিদ্ধ হাদির সুস্থতা কামনায় মোনাজাত করা হয়।
বিক্ষোভ ও সমাবেশে রাকসুর ভিপি ও রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার, রাবি ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফায়সালসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



















