ঢাকা ০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

রাজনীতিতে অনুকরণ বা অনুসরণ নয়, প্রয়োজন আধুনিকতার সমন্বয়

খালিদ হাসান
  • আপডেট সময় : ১০২ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের রাজনীতি বহুমাত্রিক, বহুধাবিভক্ত ও ক্রমবিকাশমান। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নীতি, দলীয় কাঠামো এবং কার্যপ্রণালীর পাশাপাশি অনুকরণ ও অনুসরণের সুস্পষ্ট সংস্কৃতি বিদ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়াদ্বয় রাজনীতির চরিত্র ও সমসাময়িকতার প্রবাহকে প্রভাবিত করেছে। সময়ের সাথে সাথে নাগরিক চাহিদা ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ পরিবর্তিত হলেও বাস্তবে গতানুগতিক নেতৃত্বের চেতনায় অন্ধ আনুগত্যের প্রবনতা অপরিবর্তিত। রাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে ব্যক্তিগত চিন্তা ও বিশ্লেষণকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র পূর্বসূরিদের আদর্শ অনুকরণ করা হয়েছে, যা আধুনিক রাজনীতিতে নতুন দল গঠন ও স্বতন্ত্র নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তিকে নিরুৎসাহিত করেছে।
অনুকরণ: ঝুঁকিপূর্ণ সহজ পথ রাজনিতীতে অনুকরণ হলো গঠনমূলক চিন্তা ও বিশ্লেষণ ছাড়াই কারো বক্তব্য, আচরণ বা কৌশল হুবহু অনুসরণ করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটির ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায়,পূর্বসূরি নেতাদের জনপ্রিয় ভাষণভঙ্গি, জনসংযোগ কৌশল বা নির্বাচনী স্টাইল অন্যতম। এছাড়া তৃণমূল কর্মীরা নেতার প্রতিটি নির্দেশকে সত্যতা যাচাই উপেক্ষা করেই অন্ধ অনুকরন সহ মান্য করেন। রাজনীতিতে অন্ধ অনুকরণ ও প্রথাগত বিশ্বাসের মানসিকতা সমসাময়িক সাংস্কৃতিক দর্শন ও নবচেতনার সৃজনশীল প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্র ধীরে ধীরে গতানুগতিক ধারার পুনরাবৃত্তিতে আবদ্ধ হয়। একই সঙ্গে আধুনিক ও প্রজন্ম-সম্মত রাজনৈতিক চিন্তাধারার গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব বিকাশে কাঠামোগত অন্তরায় সৃষ্টি করে।
ফলে রাজনীতিতে “চিন্তা নয়, নির্দেশ” এমন এককেন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। দলগুলো গণতান্ত্রিক কাঠামো গঠনে ব্যর্থ হয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঐতিহ্যগত ধারায় আটকে পড়ে। এর ফলে স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপটভেদে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ে এবং অঞ্চলভিত্তিক নীতিনির্ধারণে সৃজনশীলতার ঘাটতি দেখা দেয়। ভিন্নমতকে প্রায়ই প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণতন্ত্রবিরোধী সাংঘর্ষিকতার সংস্কৃতি প্রকাশ পায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অহিংস, যুক্তিনির্ভর দ্বন্দ্ব–সমাধানের পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়। এর বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে একাধিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও দলীয় সভায়, যেখানে দলের নির্দেশিকা মান্য করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সমসাময়িক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা উপেক্ষিত রেখে দলীয় চেইন অব কমান্ডকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অনুসরণ: যুক্তিনিষ্ঠ রাজনীতি ও মানবিক নেতৃত্ব বিকাশের পথ অনুসরণ হলো সঠিক মূল্যবোধ, নীতিনিষ্ঠা, সততা এবং কাজের নৈতিকতা শেখার একটি বাস্তব ও নির্মাণধর্মী প্রক্রিয়া। এটি রাজনীতির প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, কারণ দায়িত্বশীল অনুসরণের মাধ্যমে মানুষকে যুক্তি, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করা সম্ভব হয়। ফলশ্রুতিতে স্বচ্ছ রাজনৈতিক চর্চায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হয় এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি প্রণয়নের পথ সুগম হয়। এটি নেতৃত্বের মান উন্নত করে, যেখানে যোগ্যতা, মানবিকতা ও নৈতিকতার সমন্বয় থাকে, যা কার্যকর নীতি গ্রহণ, ত্যাগের রাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে সহায়ক হয়।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেখা গেছে, যে আদর্শ ও নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণের মাধ্যমে নেতৃত্বের প্রমাণভিত্তিকতা এবং মানবিক দিক সমুন্নত রাখা সম্ভব হয়েছিল। আধুনিক রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠ্যক্রম, গবেষণাভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক গবেষণা, নতুন প্রজন্মকে অনুসরণের মানসিকতা এবং যুক্তিনিষ্ঠ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
এভাবে দেখা যায়, রাজনীতিতে অনুসরণের কার্যকর প্রয়োগ কেবল ঐতিহ্যিক আদর্শ অনুসরণে সংকীর্ণ না থেকে বরং, আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাজনীতি গণমুখী, সৃজনশীল এবং সময়োপযোগী হয়ে ওঠে।
আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ও বিশ্লেষণধর্মী রাজনীতি বাংলাদেশে রাজনৈতিক শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠ্যক্রম, রাজনৈতিক গবেষণা এবং সমাজের অবকাঠামোগত বিশ্লেষণ নেতাদের তথ্য ও যুক্তিভিত্তিক নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে। তবে এ পর্যন্ত বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আধুনিক পদ্ধতির চর্চা এড়িয়ে প্রথাগত পথ ও প্রয়াত নেতাদের আদর্শকেই সঠিক হিসেবে মান্য করে এসেছে। ফলে আধুনিক রাজনৈতিক শিক্ষার কার্যকর প্রয়োগ এখনও সীমিত থেকে গেছে।
রাজনীতিতে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় কোনোভাবেই দলের সংস্কৃতি নষ্টের চর্চা নয়। বরং এটি নেতাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, সমসাময়িক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা এবং নৈতিক মানদণ্ড ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে স্বতন্ত্র নেতৃত্ব, সৃজনশীল নীতি প্রণয়ন এবং প্রজন্ম-সম্মত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশে সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়।
অগ্রগতির পথ: সুশিক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে অনুকরণের চক্র থেকে বের করে অনুসরণের মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন একটি সুশিক্ষিত, সচেতন ও নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ জন্য অত্যাবশ্যক রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রগতিশীল চর্চা, দলীয় গণতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিক শিক্ষা ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উৎসাহিত করা, নীতি প্রণয়নে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে মূল্যবোধকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর ঘটানোও অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং সমসাময়িক চাহিদা অনুযায়ী সমন্বিত নেতৃত্ব বিকাশের পথ সুগম করবে।
অন্তর্নিহিত বার্তা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুকরণ এবং অন্ধ অনুসরণের সংস্কৃতি ছাপিয়ে আধুনিক শিক্ষার আলোকে মূল্যবোধভিত্তিক, বিশ্লেষণধর্মী ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা এখন অতীব জরুরি। অন্ধ অনুকরণ রাজনৈতিক চিন্তাশক্তিকে সংকীর্ণ ও আবেগপ্রবণ করে তোলে, যা স্বতন্ত্র নেতৃত্বের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। বিপরীতে যুক্তিনিষ্ঠ অনুসরণ এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় নেতৃত্বকে আদর্শিক, নৈতিক ও মানবিক করে গড়ে তোলে এবং রাজনীতিকে গণকল্যানমুখী ও সৃজনশীল করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যদি শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্জন নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন হয়, তবে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধের সমন্বয় রাজনীতিকে দায়িত্বশীল, প্রজন্ম-সম্মত ও টেকসই করে তোলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই আধুনিকতার সমন্বয় নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে যুক্তিনিষ্ঠ, নৈতিক ও জনকল্যানমুখী করে গড়ে তুলবে, যা রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা রাখছি।
উন্নয়ন-মানবাধিকার কর্মী, ও তৃণমূল রাজনীতি বিশ্লেষক।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

রাজনীতিতে অনুকরণ বা অনুসরণ নয়, প্রয়োজন আধুনিকতার সমন্বয়

আপডেট সময় :

বাংলাদেশের রাজনীতি বহুমাত্রিক, বহুধাবিভক্ত ও ক্রমবিকাশমান। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নীতি, দলীয় কাঠামো এবং কার্যপ্রণালীর পাশাপাশি অনুকরণ ও অনুসরণের সুস্পষ্ট সংস্কৃতি বিদ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়াদ্বয় রাজনীতির চরিত্র ও সমসাময়িকতার প্রবাহকে প্রভাবিত করেছে। সময়ের সাথে সাথে নাগরিক চাহিদা ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ পরিবর্তিত হলেও বাস্তবে গতানুগতিক নেতৃত্বের চেতনায় অন্ধ আনুগত্যের প্রবনতা অপরিবর্তিত। রাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে ব্যক্তিগত চিন্তা ও বিশ্লেষণকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র পূর্বসূরিদের আদর্শ অনুকরণ করা হয়েছে, যা আধুনিক রাজনীতিতে নতুন দল গঠন ও স্বতন্ত্র নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তিকে নিরুৎসাহিত করেছে।
অনুকরণ: ঝুঁকিপূর্ণ সহজ পথ রাজনিতীতে অনুকরণ হলো গঠনমূলক চিন্তা ও বিশ্লেষণ ছাড়াই কারো বক্তব্য, আচরণ বা কৌশল হুবহু অনুসরণ করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটির ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায়,পূর্বসূরি নেতাদের জনপ্রিয় ভাষণভঙ্গি, জনসংযোগ কৌশল বা নির্বাচনী স্টাইল অন্যতম। এছাড়া তৃণমূল কর্মীরা নেতার প্রতিটি নির্দেশকে সত্যতা যাচাই উপেক্ষা করেই অন্ধ অনুকরন সহ মান্য করেন। রাজনীতিতে অন্ধ অনুকরণ ও প্রথাগত বিশ্বাসের মানসিকতা সমসাময়িক সাংস্কৃতিক দর্শন ও নবচেতনার সৃজনশীল প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষেত্র ধীরে ধীরে গতানুগতিক ধারার পুনরাবৃত্তিতে আবদ্ধ হয়। একই সঙ্গে আধুনিক ও প্রজন্ম-সম্মত রাজনৈতিক চিন্তাধারার গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ভবিষ্যতের নেতৃত্ব বিকাশে কাঠামোগত অন্তরায় সৃষ্টি করে।
ফলে রাজনীতিতে “চিন্তা নয়, নির্দেশ” এমন এককেন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। দলগুলো গণতান্ত্রিক কাঠামো গঠনে ব্যর্থ হয়ে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঐতিহ্যগত ধারায় আটকে পড়ে। এর ফলে স্থান, কাল ও প্রেক্ষাপটভেদে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ে এবং অঞ্চলভিত্তিক নীতিনির্ধারণে সৃজনশীলতার ঘাটতি দেখা দেয়। ভিন্নমতকে প্রায়ই প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণতন্ত্রবিরোধী সাংঘর্ষিকতার সংস্কৃতি প্রকাশ পায়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অহিংস, যুক্তিনির্ভর দ্বন্দ্ব–সমাধানের পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়। এর বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে একাধিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও দলীয় সভায়, যেখানে দলের নির্দেশিকা মান্য করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সমসাময়িক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা উপেক্ষিত রেখে দলীয় চেইন অব কমান্ডকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। অনুসরণ: যুক্তিনিষ্ঠ রাজনীতি ও মানবিক নেতৃত্ব বিকাশের পথ অনুসরণ হলো সঠিক মূল্যবোধ, নীতিনিষ্ঠা, সততা এবং কাজের নৈতিকতা শেখার একটি বাস্তব ও নির্মাণধর্মী প্রক্রিয়া। এটি রাজনীতির প্রতিটি স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, কারণ দায়িত্বশীল অনুসরণের মাধ্যমে মানুষকে যুক্তি, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা প্রদান করা সম্ভব হয়। ফলশ্রুতিতে স্বচ্ছ রাজনৈতিক চর্চায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা হয় এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি প্রণয়নের পথ সুগম হয়। এটি নেতৃত্বের মান উন্নত করে, যেখানে যোগ্যতা, মানবিকতা ও নৈতিকতার সমন্বয় থাকে, যা কার্যকর নীতি গ্রহণ, ত্যাগের রাজনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে সহায়ক হয়।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেখা গেছে, যে আদর্শ ও নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণের মাধ্যমে নেতৃত্বের প্রমাণভিত্তিকতা এবং মানবিক দিক সমুন্নত রাখা সম্ভব হয়েছিল। আধুনিক রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠ্যক্রম, গবেষণাভিত্তিক নীতি বিশ্লেষণ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক গবেষণা, নতুন প্রজন্মকে অনুসরণের মানসিকতা এবং যুক্তিনিষ্ঠ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করছে।
এভাবে দেখা যায়, রাজনীতিতে অনুসরণের কার্যকর প্রয়োগ কেবল ঐতিহ্যিক আদর্শ অনুসরণে সংকীর্ণ না থেকে বরং, আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে নৈতিক ও মানবিক নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাজনীতি গণমুখী, সৃজনশীল এবং সময়োপযোগী হয়ে ওঠে।
আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ও বিশ্লেষণধর্মী রাজনীতি বাংলাদেশে রাজনৈতিক শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠ্যক্রম, রাজনৈতিক গবেষণা এবং সমাজের অবকাঠামোগত বিশ্লেষণ নেতাদের তথ্য ও যুক্তিভিত্তিক নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে। তবে এ পর্যন্ত বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো আধুনিক পদ্ধতির চর্চা এড়িয়ে প্রথাগত পথ ও প্রয়াত নেতাদের আদর্শকেই সঠিক হিসেবে মান্য করে এসেছে। ফলে আধুনিক রাজনৈতিক শিক্ষার কার্যকর প্রয়োগ এখনও সীমিত থেকে গেছে।
রাজনীতিতে আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় কোনোভাবেই দলের সংস্কৃতি নষ্টের চর্চা নয়। বরং এটি নেতাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, সমসাময়িক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা এবং নৈতিক মানদণ্ড ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে স্বতন্ত্র নেতৃত্ব, সৃজনশীল নীতি প্রণয়ন এবং প্রজন্ম-সম্মত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশে সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়।
অগ্রগতির পথ: সুশিক্ষিত ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে অনুকরণের চক্র থেকে বের করে অনুসরণের মানসিকতা প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন একটি সুশিক্ষিত, সচেতন ও নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ জন্য অত্যাবশ্যক রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রগতিশীল চর্চা, দলীয় গণতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিক শিক্ষা ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উৎসাহিত করা, নীতি প্রণয়নে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে মূল্যবোধকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপান্তর ঘটানোও অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং সমসাময়িক চাহিদা অনুযায়ী সমন্বিত নেতৃত্ব বিকাশের পথ সুগম করবে।
অন্তর্নিহিত বার্তা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনুকরণ এবং অন্ধ অনুসরণের সংস্কৃতি ছাপিয়ে আধুনিক শিক্ষার আলোকে মূল্যবোধভিত্তিক, বিশ্লেষণধর্মী ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা এখন অতীব জরুরি। অন্ধ অনুকরণ রাজনৈতিক চিন্তাশক্তিকে সংকীর্ণ ও আবেগপ্রবণ করে তোলে, যা স্বতন্ত্র নেতৃত্বের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। বিপরীতে যুক্তিনিষ্ঠ অনুসরণ এবং আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় নেতৃত্বকে আদর্শিক, নৈতিক ও মানবিক করে গড়ে তোলে এবং রাজনীতিকে গণকল্যানমুখী ও সৃজনশীল করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যদি শুধুমাত্র ক্ষমতা অর্জন নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন হয়, তবে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধের সমন্বয় রাজনীতিকে দায়িত্বশীল, প্রজন্ম-সম্মত ও টেকসই করে তোলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই আধুনিকতার সমন্বয় নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে যুক্তিনিষ্ঠ, নৈতিক ও জনকল্যানমুখী করে গড়ে তুলবে, যা রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা রাখছি।
উন্নয়ন-মানবাধিকার কর্মী, ও তৃণমূল রাজনীতি বিশ্লেষক।