ঢাকা ০৫:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

দোহারের বাস্তায় ঐতিহ্যবাহী ধামাইল উৎসব ও গ্রামীণ মেলা

শাহাবুল আলম, ফরিদপুর
  • আপডেট সময় : ২০ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

​ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটী ইউনিয়নের বাস্তা (ফকির বাড়ি) এলাকায় অবস্থিত আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ পরান ফকিরের দরবার শরীফে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে ধামাইল উৎসব ও বাঁশ নাচানো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক চেতনার সংমিশ্রণে এই উৎসবকে ঘিরে পুরো এলাকায় বইছে উৎসবের আমেজ।

​ঐতিহ্যের ধামাইল ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন

​উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো ঐতিহ্যবাহী ‘ধামাইল’ গান ও নৃত্য। মূলত ‘ধামা’ শব্দ থেকে ধামাইল শব্দের উৎপত্তি, যার শাব্দিক অর্থ আবেগ বা ভাব। লোকমুখে বাড়ির উঠোনকেও ‘ধামা’ বলা হয়; আর উঠোনে এই গানের আয়োজন হয় বলেই এটি ধামাইল নামে পরিচিত। তবে এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য হলো মানুষের কল্যাণ সাধন, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

​বংশপরম্পরায় আধ্যাত্মিক সাধনা ও বর্তমান নেতৃত্ব ​বাস্তার এই দরবার শরীফটি শাহ্ পরান ফকিরের স্মৃতিবিজড়িত। তার সুযোগ্য পুত্র আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ মাদার ফকিরের হাত ধরে এই উৎসবের বিশেষ পরিচিতি গড়ে ওঠে। বংশপরম্পরায় শাহ্ সুলতান ফকির এবং পরবর্তীতে তার বংশধর শাহ্ মতি ফকির, শাহ্ মনী ফকির, শাহ্ ননী ফকির ও শাহ্ ফনি ফকির এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে শাহ্ ছানা (শাহ্ আলম) ফকির গোত্র প্রধান হিসেবে এই আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ধারা পরিচালনার মহিমান্বিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার সুচারু নেতৃত্বে এই দরবার শরীফ ও উৎসবের মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

​মানবকল্যাণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ​এই উৎসবের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো এর সর্বজনীনতা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণে এই আধ্যাত্মিক ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আয়োজকদের মতে, শাহ্ মাদার ফকিরের আদর্শ ছিল মানুষের মুক্তি এবং সেবা। সেই চেতনাকে ধারণ করে এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মানবতা ও সম্প্রীতির এক অনন্য ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

​উৎসবের আমেজ ও গ্রামীণ মেলা ​মাঘী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শাহ্ মাদার ফকিরের স্মৃতিধন্য ‘বাঁশ নাচানো’ ও ধামাইল উৎসব দেখতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পর্যটক দরবার শরীফ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মৈনট ও বাস্তা এলাকায় বসেছে জমজমাট গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা, লোকজ কারুপণ্য এবং মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসা এই মেলা যেন গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

​দরবার শরীফের খাদেম ও স্থানীয়রা জানান, বর্তমান বাস্তা (ফকির বাড়ি) হিসেবে পরিচিত এই স্থানে শাহ্ সুলতান ফকিরের হিস্যা অনুযায়ী বংশধররা অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে এই উৎসব পরিচালনা করছেন। বাংলার এই লোকজ ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

দোহারের বাস্তায় ঐতিহ্যবাহী ধামাইল উৎসব ও গ্রামীণ মেলা

আপডেট সময় :

​ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটী ইউনিয়নের বাস্তা (ফকির বাড়ি) এলাকায় অবস্থিত আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ পরান ফকিরের দরবার শরীফে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মাঘী পূর্ণিমা উপলক্ষে ধামাইল উৎসব ও বাঁশ নাচানো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক চেতনার সংমিশ্রণে এই উৎসবকে ঘিরে পুরো এলাকায় বইছে উৎসবের আমেজ।

​ঐতিহ্যের ধামাইল ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন

​উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো ঐতিহ্যবাহী ‘ধামাইল’ গান ও নৃত্য। মূলত ‘ধামা’ শব্দ থেকে ধামাইল শব্দের উৎপত্তি, যার শাব্দিক অর্থ আবেগ বা ভাব। লোকমুখে বাড়ির উঠোনকেও ‘ধামা’ বলা হয়; আর উঠোনে এই গানের আয়োজন হয় বলেই এটি ধামাইল নামে পরিচিত। তবে এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য হলো মানুষের কল্যাণ সাধন, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।

​বংশপরম্পরায় আধ্যাত্মিক সাধনা ও বর্তমান নেতৃত্ব ​বাস্তার এই দরবার শরীফটি শাহ্ পরান ফকিরের স্মৃতিবিজড়িত। তার সুযোগ্য পুত্র আধ্যাত্মিক সাধক শাহ্ মাদার ফকিরের হাত ধরে এই উৎসবের বিশেষ পরিচিতি গড়ে ওঠে। বংশপরম্পরায় শাহ্ সুলতান ফকির এবং পরবর্তীতে তার বংশধর শাহ্ মতি ফকির, শাহ্ মনী ফকির, শাহ্ ননী ফকির ও শাহ্ ফনি ফকির এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে শাহ্ ছানা (শাহ্ আলম) ফকির গোত্র প্রধান হিসেবে এই আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ধারা পরিচালনার মহিমান্বিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার সুচারু নেতৃত্বে এই দরবার শরীফ ও উৎসবের মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

​মানবকল্যাণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ​এই উৎসবের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো এর সর্বজনীনতা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণে এই আধ্যাত্মিক ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আয়োজকদের মতে, শাহ্ মাদার ফকিরের আদর্শ ছিল মানুষের মুক্তি এবং সেবা। সেই চেতনাকে ধারণ করে এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মানবতা ও সম্প্রীতির এক অনন্য ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

​উৎসবের আমেজ ও গ্রামীণ মেলা ​মাঘী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শাহ্ মাদার ফকিরের স্মৃতিধন্য ‘বাঁশ নাচানো’ ও ধামাইল উৎসব দেখতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পর্যটক দরবার শরীফ প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মৈনট ও বাস্তা এলাকায় বসেছে জমজমাট গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা, লোকজ কারুপণ্য এবং মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসা এই মেলা যেন গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

​দরবার শরীফের খাদেম ও স্থানীয়রা জানান, বর্তমান বাস্তা (ফকির বাড়ি) হিসেবে পরিচিত এই স্থানে শাহ্ সুলতান ফকিরের হিস্যা অনুযায়ী বংশধররা অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে এই উৎসব পরিচালনা করছেন। বাংলার এই লোকজ ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক চেতনাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এই ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।