ঢাকা ১০:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে পদক্ষেপ নেবে সরকার

মহিউদ্দিন তুষার
  • আপডেট সময় : ২০ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশ থেকে বিগত সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের তথ্য তুলে ধরে তা ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, অতীতের মতো কোনো বেআইনি বা জোরপূর্বক পদ্ধতি নয় বরং দেশের প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনেই অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থের গন্তব্য হিসেবে ইতোমধ্যে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এসব দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও আইনি সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরের অগ্রগতি সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিমাণ অর্থ যদি আংশিকভাবেও দেশে ফেরানো সম্ভব হয়, তবে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, ব্যাংকিং গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়গুলো এই প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে বড় পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২২ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ১০টি জে

লায় কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সরকার আশা করছে, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান সহজ হবে, যা কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষক কার্ড কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরাসরি কৃষকদের হাতে সহায়তা পৌঁছালে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে এবং কৃষি খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর ডাটাবেইস, সঠিক যাচাই-বাছাই এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে পরিবারভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো হলেও এতে মূল্যস্ফীতির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং এটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি করে অর্থনীতিকে আরও সচল করবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, সরাসরি নগদ সহায়তা বাড়ালে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে, যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এই কর্মসূচির বাস্তবায়নে সতর্ক নীতিমালা ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।

সরকার একদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে চাইছে, অন্যদিকে কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এই দুই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর যা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে পদক্ষেপ নেবে সরকার

আপডেট সময় :

বাংলাদেশ থেকে বিগত সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের তথ্য তুলে ধরে তা ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, অতীতের মতো কোনো বেআইনি বা জোরপূর্বক পদ্ধতি নয় বরং দেশের প্রচলিত আইন ও আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনেই অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থের গন্তব্য হিসেবে ইতোমধ্যে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এসব দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান ও আইনি সহযোগিতা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরের অগ্রগতি সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিমাণ অর্থ যদি আংশিকভাবেও দেশে ফেরানো সম্ভব হয়, তবে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, ব্যাংকিং গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়গুলো এই প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে বড় পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২২ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ১০টি জে

লায় কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সরকার আশা করছে, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান সহজ হবে, যা কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষক কার্ড কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরাসরি কৃষকদের হাতে সহায়তা পৌঁছালে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে এবং কৃষি খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে। তবে এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর ডাটাবেইস, সঠিক যাচাই-বাছাই এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

একই সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে পরিবারভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো হলেও এতে মূল্যস্ফীতির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং এটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি করে অর্থনীতিকে আরও সচল করবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, সরাসরি নগদ সহায়তা বাড়ালে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে, যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এই কর্মসূচির বাস্তবায়নে সতর্ক নীতিমালা ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।

সরকার একদিকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে চাইছে, অন্যদিকে কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এই দুই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর যা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।