জ্বালানি সংকটে সড়কে ঈদযাত্রায় নেমে এসেছে দুর্ভোগ
বাড়তি ভাড়ার নৈরাজ্য
- আপডেট সময় : ১৮৯ বার পড়া হয়েছে
জ্বালানি সংকট এক নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে দেশে। যা নীতিনির্ধারকদের (মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব) মতে, জ্বালানীর কোনো সংকট নেই। অথচ রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি তেলের পাম্পে সীমিত ভাবে পাচ্ছে জ্বালনি তেল। কিন্তু এ জ্বালানিতে চাহিদা মিটছে না পরিবহনে। এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করেই মূলত ভাড়া নৈরাজ্য চরমে উঠেছে। প্রভাব পড়েছে ঈদযাত্রায়। মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলোতে আগে অনলাইনে টিকিট না পেলেও কাউন্টারে পাওয়া যেত। এবার অর্ধেক টিকিট অনলাইনে ছাড়ার পর মুহূর্তেই তা শেষ হয়ে গেছে। এখন কাউন্টারে গেলে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো, বাস আদৌ ছাড়বে কি না, তা নিয়ে। সবসময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না, ঈদই একমাত্র ভরসা। আগে ভোগান্তি হতো সড়কে, আর এবার যাত্রা শুরুর আগেই টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে। অথচ এসব দেখার কেউ নেই। এমন মন্তব্য ঈদে যাত্রা করা একাধিক যাত্রীর।
তাদের মতে, দুই ঈদ ও দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসব এলেই পরিবহন খাতে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করে সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটা নতুন কোনো অভিযোগ নয়। তবে, এবারের ঈদযাত্রার আগে দেশজুড়ে শুরু হওয়া জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট সেই পুরনো আশঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছে। তেলের সরবরাহ ঘাটতি এবং দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে অনেক পরিবহন মালিক ইতোমধ্যে অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, এটি মূলত শেষ মুহূর্তে বাড়তি ভাড়া আদায়ের একটি সুকৌশলী ফাঁদ!
গত কয়েক দিন ধরে সারাদেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, একটি দূরপাল্লার বাস সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ২২০ লিটার এবং লোকাল বাস ৭০–৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। তবে বাস মালিকদের দাবি, বাস্তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে এই পরিমাণ তেল মিলছে না। অনেক পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়েও তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বাড়তি দামে ড্রামে করে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
অপরদিকে দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও রেশনিং ব্যবস্থার কারণে আসন্ন ঈদে বাসযাত্রা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। লোকসানের অজুহাতে অনেক পরিবহন মালিক অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো ডিজেল না মেলায় অনেক বাস মালিক খোলা বাজার থেকে চড়া দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন
ঈদকে সামনে রেখে বরাবরের মতো গত ৩ মার্চ থেকে বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিলেন মালিকরা। তবে মাত্র দুই দিনের মাথায় জ্বালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতায় থমকে যায় এই কার্যক্রম। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক পরিবহন মালিক অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের দাবি, তেলের তীব্র সংকট বা হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে হবে। তাই বিকল্প হিসেবে তারা যাত্রার আগমুহূর্তে সরাসরি টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা করছেন।
তবে, সাধারণ যাত্রীরা পরিবহন মালিকদের এই যুক্তিকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। তাদের মতে, এটি মূলত বাড়তি ভাড়া আদায়ের একটি সুকৌশলী ফন্দি। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বলছে, ঈদ এলেই ৩৫০ টাকার ভাড়া অনায়াসেই ৫০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। এবার তেল সংকট ও ঈদ— এই দ্বিমুখী অজুহাতে ভাড়ার নৈরাজ্য আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে। ফলে বরাবরের মতোই অসহায় সাধারণ যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনে যাতায়াত করছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেও পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। লাইন ধরে তেল সংগ্রহ করতে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। কারণ, তেলের জন্য যদি গাড়ি পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।
এবিষয়ে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বলেন, আমরা ভাড়ার বিষয়টি অত্যন্ত কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে এক পয়সাও বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মোট মজুত সক্ষমতা রয়েছে ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। গত ৮ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া হিসাব মতে, বর্তমানে মজুত আছে ১ লাখ ২০ হাজার ২৩৭ টন ডিজেল। দেশে দৈনিক গড়ে ৯ হাজার ২২ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। সেই হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে আগামী ১০ দিন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী ১৩ মার্চের মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জ্বালানির এই নতুন প্রক্রিয়া সরবরাহ ঝুলে আছে।























