ঢাকা ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

ছুটিতে ঘুরতে পারেন জয়পুরহাটের যেসব স্থানে

এম.এ.জলিল রানা, জয়পুরহাট
  • আপডেট সময় : ৮৯ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মুসলমানদের প্রধান ও সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। তাইতো ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরা, আর মেতে উঠা বাঁধভাঙা আনন্দে। সেই খুশিতে এবার বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে টানা ৭ দিনের ঈদ ছুটি। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছে ফেলে ঈদ আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যেই নানা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ছোট-বড় সবাই।
ঈদে নতুন পোশাকে কেউ প্রিয়তমার হাত ধরে কোনো নিভৃত দিঘি বা নদীর পাড়ে শান্ত ও প্রশান্তির হিমেল বাতাসে খুঁজে নেবেন পরম প্রশান্তি। কেউবা আবার পরিবার-পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবেন সাজানো-গোছানো কোনো বিনোদন পার্কের উল্লাসে কিংবা ভিড় জমাবেন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী প্রাচীন নিদর্শনে। ঈদ উল্লাসে এবার ভ্রমণের নেশায় ভ্রমণ পিপাষুরা মাতবে জয়পুরহাট। সেজন্য এ জেলার আনাচে-কানাচে নতুন সাজে নানান রং এ অপেক্ষা করছে চমৎকার সব দর্শনীয় স্থান। কিন্তু ঠিক কোথায় সেই স্থানগুলো? এ জেলার দর্শনার্থীরা এবার ঈদের ছুটিতে ঠিক কোথায় ঘুরতে পারেন তা নিয়েই আমাদের এ আয়োজন।
শিশুতোষ বিনোদন জয়পুরহাট শিশু উদ্যান:
জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে প্রায় দেড় কি:মি: পশ্চিমে বুলুপাড়া মহল্লায় অবস্থিত এ পার্কটি শিশু উদ্যান নামে পরিচিত হলেও সেখানে সব বয়সী ভিড় জমে মানুষের । এখানে রয়েছে দুটি লেক,সেখানে প্যাডেল বোট ও স্পিড বোটে চড়ে সময় কাটানো যায়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ট্রেন, নানা রকম রাইড ছাড়াও রয়েছে আদিমগুহা ।
রিকশা বা অটোরিকশায় শহরের জিরো পয়েন্ট কেন্দ্রয়ী মসজিদ মার্কেটের সামনে থেকে সেখানে যেতে ভাড়া লাগবে ১০-২০ টাকা। শিশু উদ্যানে প্রবেশে ৩ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য ৫০ টাকা এবং বড়দের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। এছাড়া ভেতরে গিয়ে নির্ধারিত স্থানের জন্য আলাদাভাবে ভাড়া দিতে হবে, আবার বিভিন্ন রাইডের জন্য ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত আলাদা-আলাদা টিকেট কাটতে হয়। এটি খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৮ টা পর্যন্ত ।
দ্য ফেন্ডস আইল্যান্ড:
‘দ্য ফ্রেন্ডস আইল্যান্ড’ বর্তমানে জয়পুরহাট শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। আধুনিক সাজসজ্জা, স্বচ্ছ পানির আধুনিক সুইমিংপুল এবং শিশুদের আনন্দ-বিনোদনের জন্য রয়েছে হরেক রকমের মনোরম রাইড। এটি শহরের একদম কাছাকাছি হারাইল এলাকায় অবস্থিত। রিকশা বা অটোরিকশায় শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে সেখানে যেতে ভাড়া লাগবে মাত্র ৫ -১০ টাকা। এটি খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত । সেখানে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। এছাড়া ভেতরে গিয়ে কিছু রাইডের জন্য টিকেট কাটতে হয়। এছাড়াও সুইমিংপুলের জন্য ২০০ টাকায় টিকেট কাটতে হয়।
আনন্দের উৎস হারাবতী ইকো রিসোর্ট:
সবুজের সমারোহ আর গ্রামীণ স্নিগ্ধতার মাঝে আধুনিকতার ছোঁয়ায় জেলার সদর উপজেলার মাধাইনগর হাটুভাঙ্গা এলাকায় হারাবতী ইকো রিসোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্টের চারপাশের গাছপালা, সাজানো বাগান এবং সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে বসার জায়গাগুলো পর্যটকদের মানসিক প্রশান্তি জোগায়। সেখানকার সবুজের মাঝে প্রিয়জনদের নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এটি এক চমৎকার জায়গা। জয়পুরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৪ কি:মি: দূরে এটি অবস্থিত। সেখানে টার্মিনাল থেকে ৫০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোতে যাওয়া যায়। আবার ক্ষেতলালের নিশ্চিন্তা মোড় থেকে সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোতে ৪০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যাবে সেখানে।
পাঁচবিবি উপজেলা সদর থেকেও সেখানে যাওয়া যায়। এজন্য পাঁচবিবি থেকে সিএনজিতে ৪০ টাকা ভাড়ায় চাঁনপাড়া বাজারে নামতে হবে, সেখান থেকে ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে ভূতগাড়ি হয়ে ওই রিসোর্টে যাওয়া যায়। এ রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।
পাথরঘাটা ও নিমাই পীরের মাজার:
জেলার পাঁচবিবি উপজেলা সদর হতে প্রায় ৫ কি:মি:পূর্বে তুলসীগঙ্গা নদীর পাশের এলাকার নামই ‘পাথরঘাটা’। সেখানে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর নদীর স্নিগ্ধ রূপ মিলেমিশে যেন একাকার। বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং মাটির নিচে চাপা পড়া ইতিহাসের গল্প জানেত প্রতি বছরই ঈদের ছুটিতে এখানে ভিড় করেন হাজারো ভ্রমণ ও ইতিহাস পিপাষু মানুষ। নদীর ধারের খোলা আকাশ আর নির্মল বাতাস প্রিয়জনের হাত ধরে বিকেল কাটানোর জন্য এক চমৎকার মহনীয় পরিবেশ তৈরি করে। এই একই এলাকায় রয়েছে নিমাই পীরের মাজারও। পাঁচবিবি রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বপাশ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোতে উচাই হয়ে সরাসরি পাথরঘাটা যাওয়া যায়। এজন্য গুনতে হবে জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া।
প্রাচীন স্থাপত্য লকমা জমিদারবাড়ি:
জেলার পাঁচবিবি উপজেলার ভারত সীমান্ত ঘেঁষা কড়িয়া এলাকায় অবস্থিত কয়েকশ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য এই ‘লকমা জমিদারবাড়ি (রাজবাড়ি)’। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও দর্শনার্থীদের একদিকে যেমন কৌতূহল জাগায় তেমনি অন্যদিকে কাছে টানে। এখানকার দালানকোঠা আর লতাপাতায় ঘেরা জীর্ণ দেওয়ালগুলো দেখতে অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভিড় করেন এখানে। এবার ঈদে লকমা রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়ি আপনার জন্য হতে পারে এক চমৎকার গন্তব্য ।
এটি পাঁচবিবি উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কি:মি: দূরে সোজা পশ্চিমে অবস্থিত। সেখানে যেতে পাঁচবিবির পাঁচমাথা এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোতে সহজেই যাওয়া যায়।এজন্য জনপ্রতি ভাড়া গুনতে হয় ৩০ টাকা-৪০ টাকা
দৃষ্টিনন্দন নান্দাইল দিঘী:
বিশালতার স্বাদ নিতে চাইলে জেলার কালাই উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন নান্দাইল দিঘিতে চলে যান। প্রায় ৫৯ একর আয়তনের নান্দাইল এ দিঘীর পাড়ে বসে নীল জলের খেলা দেখা কিংবা নৌকায় ভেসে বেড়ানো আপনার ঈদ আনন্দ-বিনোদনকে দিতে পারে পূর্ণতা। এখানে যেতে কালাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে চড়তে হবে। প্রায় ৫ কি:মি: পূর্ব-উত্তর দিক দূরে এই দিঘীতে যেতে গুনতে হবে ১৫-২০ টাকা ।
নিঃশব্দ (বিলের ঘাট):
একই জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার তুলসীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত সবুজে ঘেরা নিঃশব্দ বিলের ঘাট এখন ভ্রমণ পিপাষুদের পছন্দের শীর্ষে। নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতু আর বাঁধ হতে নিচের দিকে থাকা নদী দেখার জন্য ‘ভিউ পয়েন্ট’ সবুজের সম্ভারে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানে ক্ষেতলাল উপজেলা এবং সদর উপজেলার জামালপুর চার মাথা থেকে সহজেই যাওয়া যায়। উভয়দিক থেকেই ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে সেখানে যাওয়া যাবে। ক্ষেতলাল সদর থেকে প্রায় ৬ কি:মি: দূরে অবস্থিত এই বিলের ঘাটে যেতে জনপ্রতি গুনতে হয় ২০-৩০ টাকা ভাড়া । আর জামালপুর চারমাথা থেকে প্রায় ৪ কি:মি: দূরে বিলের ঘাটে যেতে ভাড়া লাগে ১০-১৫ টাকা ।
ইসলামিক স্থাপত্য হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ:
ইসলামি স্থাপত্য ও কারুকার্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ। এটি উপজেলা থেকে প্রায় ৫ কি:মি: দক্ষিণে হিন্দা গ্রামে অবস্থিত। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর জন্য এই মসজিদটি স্থানীয় এবং বাহির হতে আগত লোকজনদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই মসজিদে যেতে ক্ষেতলাল হাসপাতাল মোড় হতে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে চড়তে হয়। প্রতিজন ২০ টাকা ভাড়াতে ইটাখোলা বাজার হয়ে খুব সহজে ওই মসজিদে যাওয়া যায়।
আছরাঙ্গা দিঘী:
যারা ঈদের ছুটিতে বিশাল জলরাশি আর সবুজের মাঝে সময় কাটাতে চান, তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে একই উপজেলার ভ্রমণ পিপাষুর আর একটি আকর্ষণ‘আছরাঙ্গা দিঘি’। বিশাল দিঘির স্বচ্ছ পানি আর পাড়ের সারিবদ্ধ সবুজ গাছপালা মুহূর্তেই দর্শনার্থীদের প্রশান্তি দেয়। উপজেলা থেকে আছরাঙ্গা দিঘির দূরত্ব প্রায় ১০ কি:মি:। আবার আক্কেলপুর উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১২ কি:মি:। দুই উপজেলা সদর থেকেই ব্যাটারিচালিত অটোতে সরাসরি দিঘি পাড়ে যাওয়া যায়। ক্ষেতলাল থেকে থানা বাজার বা হাসপাতাল মোড়ে গাড়িতে চড়তে হয়। জনপ্রতি ২০-৩০ টাকায় যাওয়া যায় সেখানে । আবার আক্কেলপুর হাসপাতাল মোড় হতে গাড়িতে চড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় যাওয়া সম্ভব দিঘী পাড়ে ।
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যেপূর্ণ গোপীনাথপুর মেলা:
এ জেলার আক্কেলপুর উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কি:মি: পূর্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যেপূর্ণ এই গোপীনাথপুর মন্দির। পাঁচশত বছরের অধিক সময়ের পুরনো এই মেলাটি লোকজ ঐতিহ্যের এক বিশাল মিলন কেন্দ্র। এটি মূলত দোল পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে শুরু হলেও এ মেলা চলতে থাকে প্রায় মাসজুড়ে, ফলে ঈদের ছুটিতেও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ থাকে এ মেলা। গোপীনাথ মন্দিরের এই মেলাটি ঘোড়া ও পশুর মেলার জন্য এক সময় বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এখানে হরেক রকমের আসবাবপত্র, মাটির তৈরি জিনিসপত্র ছাড়াও এখানে গৃহস্থালির পণ্য আর মিঠাই-মিষ্টান্নের পসরা বসে। এছাড়া নাগরদোলা ও সার্কাসের মতো গ্রামীণ বিনোদন বাড়তি আনন্দ দেয় পর্যটকদের । যারা উৎসবের আমেজে গ্রামীণ লোক সংস্কৃতি উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এবার গোপীনাথপুর মেলা হতে পরে গ্রামীণ আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম সেরা গন্তব্য।
গোপীনাথপুর মেলায় যাওয়া যাবে ব্যাটারিচালিত অটো বা ভ্যানে করে । এছাড়া সরাসরি সিএনজি রিজার্ভ করেও যাওয়া সম্ভব। হাসপাতাল গেটে ব্যাটারিচালিত অটো বা ভ্যানে চড়ে জনপ্রতি ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে এ মেলায় যাওয়া যায়। এছাড়াও যাওয়া সম্ভব আক্কেলপুর থেকে বাসযোগেও।
ঈদ ছুটিতে জয়পুরহাটের এই বিনোদন কেন্দ্রগুলো সকল শ্রেণী পেশার ভ্রমন পিপাষুদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধি,আনন্দ-বিনোদনে কানায় কানায় পূর্ণ হোক প্রতিটি পর্যটকের জীবণ,একই স্থানে ফিরে আসার হাতসানিতে মন ছুঁয়ে যাক সকল ভ্রমন অতিথিদের এমনটাই প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ছুটিতে ঘুরতে পারেন জয়পুরহাটের যেসব স্থানে

আপডেট সময় :

মুসলমানদের প্রধান ও সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর। তাইতো ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরা, আর মেতে উঠা বাঁধভাঙা আনন্দে। সেই খুশিতে এবার বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে টানা ৭ দিনের ঈদ ছুটি। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছে ফেলে ঈদ আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যেই নানা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ছোট-বড় সবাই।
ঈদে নতুন পোশাকে কেউ প্রিয়তমার হাত ধরে কোনো নিভৃত দিঘি বা নদীর পাড়ে শান্ত ও প্রশান্তির হিমেল বাতাসে খুঁজে নেবেন পরম প্রশান্তি। কেউবা আবার পরিবার-পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবেন সাজানো-গোছানো কোনো বিনোদন পার্কের উল্লাসে কিংবা ভিড় জমাবেন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী প্রাচীন নিদর্শনে। ঈদ উল্লাসে এবার ভ্রমণের নেশায় ভ্রমণ পিপাষুরা মাতবে জয়পুরহাট। সেজন্য এ জেলার আনাচে-কানাচে নতুন সাজে নানান রং এ অপেক্ষা করছে চমৎকার সব দর্শনীয় স্থান। কিন্তু ঠিক কোথায় সেই স্থানগুলো? এ জেলার দর্শনার্থীরা এবার ঈদের ছুটিতে ঠিক কোথায় ঘুরতে পারেন তা নিয়েই আমাদের এ আয়োজন।
শিশুতোষ বিনোদন জয়পুরহাট শিশু উদ্যান:
জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে প্রায় দেড় কি:মি: পশ্চিমে বুলুপাড়া মহল্লায় অবস্থিত এ পার্কটি শিশু উদ্যান নামে পরিচিত হলেও সেখানে সব বয়সী ভিড় জমে মানুষের । এখানে রয়েছে দুটি লেক,সেখানে প্যাডেল বোট ও স্পিড বোটে চড়ে সময় কাটানো যায়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ট্রেন, নানা রকম রাইড ছাড়াও রয়েছে আদিমগুহা ।
রিকশা বা অটোরিকশায় শহরের জিরো পয়েন্ট কেন্দ্রয়ী মসজিদ মার্কেটের সামনে থেকে সেখানে যেতে ভাড়া লাগবে ১০-২০ টাকা। শিশু উদ্যানে প্রবেশে ৩ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য ৫০ টাকা এবং বড়দের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। এছাড়া ভেতরে গিয়ে নির্ধারিত স্থানের জন্য আলাদাভাবে ভাড়া দিতে হবে, আবার বিভিন্ন রাইডের জন্য ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত আলাদা-আলাদা টিকেট কাটতে হয়। এটি খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৮ টা পর্যন্ত ।
দ্য ফেন্ডস আইল্যান্ড:
‘দ্য ফ্রেন্ডস আইল্যান্ড’ বর্তমানে জয়পুরহাট শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। আধুনিক সাজসজ্জা, স্বচ্ছ পানির আধুনিক সুইমিংপুল এবং শিশুদের আনন্দ-বিনোদনের জন্য রয়েছে হরেক রকমের মনোরম রাইড। এটি শহরের একদম কাছাকাছি হারাইল এলাকায় অবস্থিত। রিকশা বা অটোরিকশায় শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে সেখানে যেতে ভাড়া লাগবে মাত্র ৫ -১০ টাকা। এটি খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত । সেখানে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। এছাড়া ভেতরে গিয়ে কিছু রাইডের জন্য টিকেট কাটতে হয়। এছাড়াও সুইমিংপুলের জন্য ২০০ টাকায় টিকেট কাটতে হয়।
আনন্দের উৎস হারাবতী ইকো রিসোর্ট:
সবুজের সমারোহ আর গ্রামীণ স্নিগ্ধতার মাঝে আধুনিকতার ছোঁয়ায় জেলার সদর উপজেলার মাধাইনগর হাটুভাঙ্গা এলাকায় হারাবতী ইকো রিসোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্টের চারপাশের গাছপালা, সাজানো বাগান এবং সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে বসার জায়গাগুলো পর্যটকদের মানসিক প্রশান্তি জোগায়। সেখানকার সবুজের মাঝে প্রিয়জনদের নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এটি এক চমৎকার জায়গা। জয়পুরহাট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৪ কি:মি: দূরে এটি অবস্থিত। সেখানে টার্মিনাল থেকে ৫০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোতে যাওয়া যায়। আবার ক্ষেতলালের নিশ্চিন্তা মোড় থেকে সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোতে ৪০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যাবে সেখানে।
পাঁচবিবি উপজেলা সদর থেকেও সেখানে যাওয়া যায়। এজন্য পাঁচবিবি থেকে সিএনজিতে ৪০ টাকা ভাড়ায় চাঁনপাড়া বাজারে নামতে হবে, সেখান থেকে ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে ভূতগাড়ি হয়ে ওই রিসোর্টে যাওয়া যায়। এ রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।
পাথরঘাটা ও নিমাই পীরের মাজার:
জেলার পাঁচবিবি উপজেলা সদর হতে প্রায় ৫ কি:মি:পূর্বে তুলসীগঙ্গা নদীর পাশের এলাকার নামই ‘পাথরঘাটা’। সেখানে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর নদীর স্নিগ্ধ রূপ মিলেমিশে যেন একাকার। বিস্তৃর্ণ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং মাটির নিচে চাপা পড়া ইতিহাসের গল্প জানেত প্রতি বছরই ঈদের ছুটিতে এখানে ভিড় করেন হাজারো ভ্রমণ ও ইতিহাস পিপাষু মানুষ। নদীর ধারের খোলা আকাশ আর নির্মল বাতাস প্রিয়জনের হাত ধরে বিকেল কাটানোর জন্য এক চমৎকার মহনীয় পরিবেশ তৈরি করে। এই একই এলাকায় রয়েছে নিমাই পীরের মাজারও। পাঁচবিবি রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বপাশ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোতে উচাই হয়ে সরাসরি পাথরঘাটা যাওয়া যায়। এজন্য গুনতে হবে জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া।
প্রাচীন স্থাপত্য লকমা জমিদারবাড়ি:
জেলার পাঁচবিবি উপজেলার ভারত সীমান্ত ঘেঁষা কড়িয়া এলাকায় অবস্থিত কয়েকশ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য এই ‘লকমা জমিদারবাড়ি (রাজবাড়ি)’। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও দর্শনার্থীদের একদিকে যেমন কৌতূহল জাগায় তেমনি অন্যদিকে কাছে টানে। এখানকার দালানকোঠা আর লতাপাতায় ঘেরা জীর্ণ দেওয়ালগুলো দেখতে অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভিড় করেন এখানে। এবার ঈদে লকমা রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়ি আপনার জন্য হতে পারে এক চমৎকার গন্তব্য ।
এটি পাঁচবিবি উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কি:মি: দূরে সোজা পশ্চিমে অবস্থিত। সেখানে যেতে পাঁচবিবির পাঁচমাথা এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোতে সহজেই যাওয়া যায়।এজন্য জনপ্রতি ভাড়া গুনতে হয় ৩০ টাকা-৪০ টাকা
দৃষ্টিনন্দন নান্দাইল দিঘী:
বিশালতার স্বাদ নিতে চাইলে জেলার কালাই উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক দৃষ্টিনন্দন নান্দাইল দিঘিতে চলে যান। প্রায় ৫৯ একর আয়তনের নান্দাইল এ দিঘীর পাড়ে বসে নীল জলের খেলা দেখা কিংবা নৌকায় ভেসে বেড়ানো আপনার ঈদ আনন্দ-বিনোদনকে দিতে পারে পূর্ণতা। এখানে যেতে কালাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে চড়তে হবে। প্রায় ৫ কি:মি: পূর্ব-উত্তর দিক দূরে এই দিঘীতে যেতে গুনতে হবে ১৫-২০ টাকা ।
নিঃশব্দ (বিলের ঘাট):
একই জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার তুলসীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত সবুজে ঘেরা নিঃশব্দ বিলের ঘাট এখন ভ্রমণ পিপাষুদের পছন্দের শীর্ষে। নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতু আর বাঁধ হতে নিচের দিকে থাকা নদী দেখার জন্য ‘ভিউ পয়েন্ট’ সবুজের সম্ভারে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানে ক্ষেতলাল উপজেলা এবং সদর উপজেলার জামালপুর চার মাথা থেকে সহজেই যাওয়া যায়। উভয়দিক থেকেই ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে সেখানে যাওয়া যাবে। ক্ষেতলাল সদর থেকে প্রায় ৬ কি:মি: দূরে অবস্থিত এই বিলের ঘাটে যেতে জনপ্রতি গুনতে হয় ২০-৩০ টাকা ভাড়া । আর জামালপুর চারমাথা থেকে প্রায় ৪ কি:মি: দূরে বিলের ঘাটে যেতে ভাড়া লাগে ১০-১৫ টাকা ।
ইসলামিক স্থাপত্য হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ:
ইসলামি স্থাপত্য ও কারুকার্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ। এটি উপজেলা থেকে প্রায় ৫ কি:মি: দক্ষিণে হিন্দা গ্রামে অবস্থিত। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর জন্য এই মসজিদটি স্থানীয় এবং বাহির হতে আগত লোকজনদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই মসজিদে যেতে ক্ষেতলাল হাসপাতাল মোড় হতে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে চড়তে হয়। প্রতিজন ২০ টাকা ভাড়াতে ইটাখোলা বাজার হয়ে খুব সহজে ওই মসজিদে যাওয়া যায়।
আছরাঙ্গা দিঘী:
যারা ঈদের ছুটিতে বিশাল জলরাশি আর সবুজের মাঝে সময় কাটাতে চান, তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে একই উপজেলার ভ্রমণ পিপাষুর আর একটি আকর্ষণ‘আছরাঙ্গা দিঘি’। বিশাল দিঘির স্বচ্ছ পানি আর পাড়ের সারিবদ্ধ সবুজ গাছপালা মুহূর্তেই দর্শনার্থীদের প্রশান্তি দেয়। উপজেলা থেকে আছরাঙ্গা দিঘির দূরত্ব প্রায় ১০ কি:মি:। আবার আক্কেলপুর উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১২ কি:মি:। দুই উপজেলা সদর থেকেই ব্যাটারিচালিত অটোতে সরাসরি দিঘি পাড়ে যাওয়া যায়। ক্ষেতলাল থেকে থানা বাজার বা হাসপাতাল মোড়ে গাড়িতে চড়তে হয়। জনপ্রতি ২০-৩০ টাকায় যাওয়া যায় সেখানে । আবার আক্কেলপুর হাসপাতাল মোড় হতে গাড়িতে চড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় যাওয়া সম্ভব দিঘী পাড়ে ।
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যেপূর্ণ গোপীনাথপুর মেলা:
এ জেলার আক্কেলপুর উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কি:মি: পূর্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যেপূর্ণ এই গোপীনাথপুর মন্দির। পাঁচশত বছরের অধিক সময়ের পুরনো এই মেলাটি লোকজ ঐতিহ্যের এক বিশাল মিলন কেন্দ্র। এটি মূলত দোল পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে শুরু হলেও এ মেলা চলতে থাকে প্রায় মাসজুড়ে, ফলে ঈদের ছুটিতেও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ থাকে এ মেলা। গোপীনাথ মন্দিরের এই মেলাটি ঘোড়া ও পশুর মেলার জন্য এক সময় বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এখানে হরেক রকমের আসবাবপত্র, মাটির তৈরি জিনিসপত্র ছাড়াও এখানে গৃহস্থালির পণ্য আর মিঠাই-মিষ্টান্নের পসরা বসে। এছাড়া নাগরদোলা ও সার্কাসের মতো গ্রামীণ বিনোদন বাড়তি আনন্দ দেয় পর্যটকদের । যারা উৎসবের আমেজে গ্রামীণ লোক সংস্কৃতি উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এবার গোপীনাথপুর মেলা হতে পরে গ্রামীণ আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম সেরা গন্তব্য।
গোপীনাথপুর মেলায় যাওয়া যাবে ব্যাটারিচালিত অটো বা ভ্যানে করে । এছাড়া সরাসরি সিএনজি রিজার্ভ করেও যাওয়া সম্ভব। হাসপাতাল গেটে ব্যাটারিচালিত অটো বা ভ্যানে চড়ে জনপ্রতি ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে এ মেলায় যাওয়া যায়। এছাড়াও যাওয়া সম্ভব আক্কেলপুর থেকে বাসযোগেও।
ঈদ ছুটিতে জয়পুরহাটের এই বিনোদন কেন্দ্রগুলো সকল শ্রেণী পেশার ভ্রমন পিপাষুদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধি,আনন্দ-বিনোদনে কানায় কানায় পূর্ণ হোক প্রতিটি পর্যটকের জীবণ,একই স্থানে ফিরে আসার হাতসানিতে মন ছুঁয়ে যাক সকল ভ্রমন অতিথিদের এমনটাই প্রত্যাশা।