ঢাকা ১২:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প

ইসলামপুর (জামালপুর) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১৮৩ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার উত্তর দরিয়াবাদ কাঁসারীপাড়া। ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্পটির জন্য খ্যাত ছিল এই এলাকাটি। এক সময় দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানী হতো এই পন্যটি।তবে সেই চিত্র এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে তা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। ঐহিত্যবাহী এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা। বিংশ শতাব্দীতে কোনো বিয়ে-সাদি, আকিকাসহ ওই সময় কাসা শিল্পটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পণ্যটি ছিল সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁসার জিনিসপত্র।
হিন্দু পরিবার গুলোর অন্যতম প্রিয় পণ্য ছিল এই কাঁসার তৈরী জিনিসপত্র। সারাদেশে থেকে ব্যবসায়ীরা কাঁসা সামগ্রী কিনতে ভিড় জমাতো ইসলামপুরে। কারখানা গুলোতে কারিগররা দিনরাত কাজ করেও কাঁসা সামগ্রী সরবরাহে হিমশিম খেতো।
জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১৯৪২ সালে লন্ডনের বার্মিংহাম নামক শহরে সারা বিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা করেছিল। সেই প্রদর্শীনিতে জামালপুর জেলার ইসলামপুরের প্রয়াত কাঁসা-শিল্পী জগৎচন্দ্র কর্মকার কারুকার্য পর্ণ কাঁসা শিল্পটির প্রদর্শন করেন। ওই প্রদর্শনীতে ইসলামাপুরের কাঁসা শিল্প সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশ্ব বিখ্যাত শিল্প হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। তারপর থেকে সারা বিশ্বে কাঁসা শিল্পেটি জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সেই থেকে কাঁসার শিল্পের আরও চাহিদা বেড়ে যায়। কালের বিবর্তনে তা এখন বিলুপ্তির পথে। বাংলার এ মিশ্র ধাতব শিল্পটি কখন কোথায় কিভাবে শুরু হয়েছিল সে সম্পর্কে সুনিদিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় শিল্প গবেষণা নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে এটা একটি প্রাচীন আমলের সভ্যতা। ওই আমলেও ব্রোঞ্জ শিল্প ছিল। আবার অনেক অভিজ্ঞ লোক শিল্পীরা এই শিল্পটিকে রামায়ন মহাভারতের যুগের বলেও মনে করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতবর্ষে পৃর্ববাংলার ঢাকার ধামরাই এলাকায় কাঁসার শিল্পীরা এসে বসতি স্থাপন করে কারখানা গড়ে তোলেন। পরবর্তী কালক্রমে বিভিন্ন কারণে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। কাঁসা শিল্পীরা তাদের লাভজনক পেশা হওয়ায় পেশাগত শিল্পজীবন পারিবারিক ভাবে গড়ে তোলার কারণে একই পাড়া-মহল্লায় বসবাস করতেন। তাই তাদের বসবাসকারী এলাকাকে কাঁসারি পাড়া নামে পরিচিতি লাভ করে ছিল। ভারতবর্ষে কাঁসা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করে ব্যবহার করে আসছিল বলে সে সময় জটিল কোন রোগবালাই ছিল না। বর্তমানে টিন, এলুমিনিয়াম ব্যবহারে নতুন নতুন রোগের আবিভার্ব ঘটেছে বলে দাবি করছেন কাঁসা শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। কাঁসা তৈরীর বিভিন্ন উপকরণ, পণ্যেও দাম বেড়ে যাওয়ায় প্লাস্টিক পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় এটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। তা ছাড়া ক্রেতারা উচ্চ মূল্যে এটি খরিদ করতে চান না, তেমনি করে কারিগর ও শিল্পীদের বেতন ঠিক মতো দেওয়া সম্ভব হয় না, তাদের বর্তমানে দুর্দিন চলছে। অনেকেই বাঁচার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ শিল্পটি ঢাকাই মসলিন মসৃণ সুতির কাপড়ের মতো বিলীন হয়ে যাবে।
নানা সংকটেও ৭ থেকে ৮টি প্রতিষ্ঠান ইসলামপুরে কাঁসা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি ধরে রাখার স্বার্থে কাঁসারীদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ আর শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানীর সুযোগ করে দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি টিকিয়ে রাখার জন্য ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এবং উন্নয়ন সংঘ ইউএস এর মতো সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কাঁসা শিল্প মালিক উত্তম কর্মকার জানান, উত্তরসূরী হিসেবে এই শিল্প কারখানাটি আমাদের পাওয়া, কালের বিবর্তনে শিল্পটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি- বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা দরকার।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান জানান আমরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে হারাতে চাই না। স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতি রক্ষা করা শুধু অতীতকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গৌরবময় ইতিহাস হস্তান্তরেরও অঙ্গীকার। এজন্য কাঁসা শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরদের তালিকা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ প্রদান, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্প

আপডেট সময় :

জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার উত্তর দরিয়াবাদ কাঁসারীপাড়া। ঐতিহ্যবাহী কাঁসা শিল্পটির জন্য খ্যাত ছিল এই এলাকাটি। এক সময় দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানী হতো এই পন্যটি।তবে সেই চিত্র এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে তা এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। ঐহিত্যবাহী এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা। বিংশ শতাব্দীতে কোনো বিয়ে-সাদি, আকিকাসহ ওই সময় কাসা শিল্পটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পণ্যটি ছিল সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া হতো কাঁসার জিনিসপত্র।
হিন্দু পরিবার গুলোর অন্যতম প্রিয় পণ্য ছিল এই কাঁসার তৈরী জিনিসপত্র। সারাদেশে থেকে ব্যবসায়ীরা কাঁসা সামগ্রী কিনতে ভিড় জমাতো ইসলামপুরে। কারখানা গুলোতে কারিগররা দিনরাত কাজ করেও কাঁসা সামগ্রী সরবরাহে হিমশিম খেতো।
জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ১৯৪২ সালে লন্ডনের বার্মিংহাম নামক শহরে সারা বিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা করেছিল। সেই প্রদর্শীনিতে জামালপুর জেলার ইসলামপুরের প্রয়াত কাঁসা-শিল্পী জগৎচন্দ্র কর্মকার কারুকার্য পর্ণ কাঁসা শিল্পটির প্রদর্শন করেন। ওই প্রদর্শনীতে ইসলামাপুরের কাঁসা শিল্প সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশ্ব বিখ্যাত শিল্প হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। তারপর থেকে সারা বিশ্বে কাঁসা শিল্পেটি জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সেই থেকে কাঁসার শিল্পের আরও চাহিদা বেড়ে যায়। কালের বিবর্তনে তা এখন বিলুপ্তির পথে। বাংলার এ মিশ্র ধাতব শিল্পটি কখন কোথায় কিভাবে শুরু হয়েছিল সে সম্পর্কে সুনিদিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় শিল্প গবেষণা নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে এটা একটি প্রাচীন আমলের সভ্যতা। ওই আমলেও ব্রোঞ্জ শিল্প ছিল। আবার অনেক অভিজ্ঞ লোক শিল্পীরা এই শিল্পটিকে রামায়ন মহাভারতের যুগের বলেও মনে করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতবর্ষে পৃর্ববাংলার ঢাকার ধামরাই এলাকায় কাঁসার শিল্পীরা এসে বসতি স্থাপন করে কারখানা গড়ে তোলেন। পরবর্তী কালক্রমে বিভিন্ন কারণে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। কাঁসা শিল্পীরা তাদের লাভজনক পেশা হওয়ায় পেশাগত শিল্পজীবন পারিবারিক ভাবে গড়ে তোলার কারণে একই পাড়া-মহল্লায় বসবাস করতেন। তাই তাদের বসবাসকারী এলাকাকে কাঁসারি পাড়া নামে পরিচিতি লাভ করে ছিল। ভারতবর্ষে কাঁসা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করে ব্যবহার করে আসছিল বলে সে সময় জটিল কোন রোগবালাই ছিল না। বর্তমানে টিন, এলুমিনিয়াম ব্যবহারে নতুন নতুন রোগের আবিভার্ব ঘটেছে বলে দাবি করছেন কাঁসা শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। কাঁসা তৈরীর বিভিন্ন উপকরণ, পণ্যেও দাম বেড়ে যাওয়ায় প্লাস্টিক পণ্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় এটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। তা ছাড়া ক্রেতারা উচ্চ মূল্যে এটি খরিদ করতে চান না, তেমনি করে কারিগর ও শিল্পীদের বেতন ঠিক মতো দেওয়া সম্ভব হয় না, তাদের বর্তমানে দুর্দিন চলছে। অনেকেই বাঁচার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ শিল্পটি ঢাকাই মসলিন মসৃণ সুতির কাপড়ের মতো বিলীন হয়ে যাবে।
নানা সংকটেও ৭ থেকে ৮টি প্রতিষ্ঠান ইসলামপুরে কাঁসা শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি ধরে রাখার স্বার্থে কাঁসারীদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ আর শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানীর সুযোগ করে দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি টিকিয়ে রাখার জন্য ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন এবং উন্নয়ন সংঘ ইউএস এর মতো সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কাঁসা শিল্প মালিক উত্তম কর্মকার জানান, উত্তরসূরী হিসেবে এই শিল্প কারখানাটি আমাদের পাওয়া, কালের বিবর্তনে শিল্পটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি- বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা দরকার।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান জানান আমরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে হারাতে চাই না। স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতি রক্ষা করা শুধু অতীতকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গৌরবময় ইতিহাস হস্তান্তরেরও অঙ্গীকার। এজন্য কাঁসা শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরদের তালিকা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ প্রদান, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা ও বাজারজাতকরণে সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।