নরসিংদীতে বোনের সাথে ভাইয়ে এ কেমন শত্রুতা
- আপডেট সময় : ১৩৮ বার পড়া হয়েছে
সমাজে একটি জনপ্রিয় প্রবাদ, যা মূলত খনার বচন হিসেবে পরিচিত। এর পুর্ণরূপ হলো: ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাঁধন, যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ: এমনি একটি লোম হর্ষক ঘটনা ঘটেছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদ ইউনিয়নের সিরাজনগর নয়াচর উত্তরপাড়া গ্রামে। সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা গেছে, ওই গ্রামের মৃত: কেরামত আলীর পুত্র মো: কামরুজ্জামান কামাল তার স্ত্রীর ক-ুপরামর্শে তারই সহোদর ছোট বোন প্রতিবন্ধি কামরুন্নাহার (৩৫) কে বাড়ির পার্শ্বে দেয়াল দিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। বন্ধ করে দিয়েছে তার রোজি-রোজগারের পথও। নিজ ঘরে অবরোধ থেকে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে পিতা-মাতা হারা অসহায় কামরুন্নাহার। কামরুন্নাহারের বড় বোন তাছলিমা বেগমকেও ভাই এর দেওয়া ১০ ফুট দেওয়াল টপকে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। আর প্রতিবন্ধি কামরুন্নাহারকে চলাফেরা করতে হয় হামাঘুরি দিয়ে। কারণ কামরুন্নাহারের জন্মের এক বছর পর পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে তার দুটি পা’ই বিকল হয়ে যায়।
দীর্ঘ এক বছর ধরে চলছে দুই বোনের বন্ধি জীবন। প্রতিবন্ধি কামরুন্নাহার জানায়, তার পিতার মৃত্যুর পূর্বে তার এবং তার বড় বোন তাছলিমা বেগম এর নামে দেড় শতাংশ জমি লিখে দিয়ে যায়। এই দেড় শতাংশ জমিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কামরুন্নাহার ও তার বোন তাছলিমা বেগমের জীবনে। কামরুন্নাহার প্রতিবন্ধি হওয়ায় কেউ তাকে বিয়ে করতেও আসেনি। তাই একমাত্র জীবন রক্ষার তাগিদে বেছে নেয় সেলাই এর কাজ। মানুষের কাপড় সেলাই করে যা কিছু আয় হতো তা দিয়ে দুই বোন কোন রকমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু ছোট ভাই কামরুজ্জামান কামালকে পিতার দেওয়া দেড় শতাংশ জমি লিখে না দেওয়ার কারনে কামরুন্নাহারের বসত ঘরের পাশে দেওয়াল দিয়ে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। যার ফলে এলাকার কোন মানুষ তার কাছে আর কাপড় সেলাই করতে আসতে পারেনা। কাপড় সেলাই করতে না পাড়ার কারনে রোজি-রোজগারের পথটি বন্ধ হয়ে গেছে কামরুন্নাহারের। আর তার পিছনে রয়েছে কামরুজ্জামান কামালের স্ত্রীর কু-পরামর্শ। ভাই রূপী মানুষটি শুধুমাত্র দুই বোনকে দেওয়ালের মধ্যে অবরোদ্ধ করেই রাখেনি। দেড় শতাংশ জমির জন্য সে তার বোনদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করতো। ভাই এর এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রতিবন্ধী কামরুন্নাহার রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং রায়পুরা থানা পুলিশকে বিষয়টি লিখিতভাবে অবহিত করার পরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অত:পর এ বিষয়ে স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বেশ কয়েকবার সালিশ বৈঠক বসলেও কামরুজ্জামান কামাল তা মেনে নেয়নি। দীর্ঘ এক বছরের মধ্যে কেউ খুলে দিতে পারেনি তাদের যাতায়াতের পথ। তাই নিজ ঘরেই এক বছর যাবত বন্ধি অবস্থায় দিনাতিপাত করতে হচ্ছে তাছলিমা বেগম ও কামরুন্নাহারকে।
মৃত: কেরামত আলীর বড় মেয়ে তাছলিমা বেগম জানায়, তারা এক ভাই পাঁচ বোন, বোনদের মধ্যে কামরুন্নাহার তৃতীয়। তিনি জানায়, তার পিতা মারা যাওয়ার পর সংসারে এ পরিবারের মধ্যে উপার্জনশীল ব্যক্তি কেউ ছিলনা। তাছলিমা বেগম তার পরিবারের দিকে চিন্তা করে নিজে বিয়েও করেনি। সংসারের বোঝা তাকে একাই টানতে হয়েছে। পরে সংসারের উন্নতির লক্ষ্যে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে ভাই কামরুজ্জামান কামালকে বিদেশে পাঠায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে বোনদের কথা ভুলে যায়। দীর্ঘ ১৪ বছর কামাল বিদেশে অবস্থান করলেও বাড়িতে একটি কানাকুড়িও দেয়নি। সে অপরের স্ত্রীর পাল্লায় পরে তাকে সবকিছু দিয়ে দেয়। পরে কামাল বাড়িতে এসে ঐ মহিলাকে বিয়ে করে। এরপর থেকেই শুরু হয় সংসারে অশান্তি। সে পিতার দেওয়া দেড় শতাংশ জমি তার নামে লিখে দেওয়ার জন্য আমাকে এবং আমার বোনকে প্রস্তাব দেয়। আমরা এতে অপারগতা প্রকাশ করলে সে আমাদের উপর শাররীক এবং মানুষিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে এবং আমাকে হত্যা করার হুমকি দেয়। সে প্রতিনিয়তই আমাদেরকে বিএনপির ক্ষমতা দেখায় এবং এই বলে হুমকি দেয় যে, জমি লিখে না দিলে তোদের দুই বোনকে এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবো।
তাছলিমা বেগম আরো বলেন, মা-বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই ভাই আমাদের সম্পত্তির দিকে নজর দেয়। সম্পত্তি লিখে না দেওয়ার কারনে প্রায় এক বছর আগে চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই ঘরে বন্ধি জীবন কাটাচ্ছি। মই বেয়ে বাইরে যাই, কিন্তু ছোট বোন একেবারেই ঘর থেকে বের হতে পারছে না। মানুষের কাছে সাহায্য চেয়েও কোন সমাধান পাইনি। কামরুজ্জামান কামাল এর ভয়ে আমার অন্যান্য বোনেরা কথা বলার সাহস পাচ্ছেনা।
ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক বলে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য গাজী মাজহারুল ইসলাম পলাশ। তিনি বলেন, চেয়ারম্যানসহ আমরা কয়েকবার মীমাংসার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। তাদের বাড়িতে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। ১০ ফুট উঁচুতে মই ব্যবহার করে তারা যাতায়াত করে। কামাল কাউকে মানে না। একমাত্র প্রশাসনের মাধ্যমেই এ সমস্যা সমাধান সম্ভব।
তবে বোন তাসলিমার বিরুদ্ধে উল্টো অভিযোগ করেছেন তার ভাই কামরুজ্জামান কামাল। তিনি বলেন, সে আমার জায়গায় বাড়ি নির্মান করেছে। তার জায়গা খালি রয়েছে। সে আমার কথা রাখেনি। এছাড়া বিচারকদের রায় না মেনে সে আমার বিরুদ্ধে উল্টো আদালতে মামলা দায়ের করেছে। প্রতিবন্ধি বোনকে আমি বরন পোষন সহ আমার সাথে থাকার প্রস্তাব দিয়েছি। সে বোনের সাথেই থাকবে বলে আমাকে বলেছে। তাহলে আমার কি করার আছে।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা বলেন, কারো রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। কিন্তু জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আদালতে মামলা চলমান। তাই আদালতকে উপেক্ষা করে এই বিষয়ে সিদ্বান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। তবে এই বিষয়ে তাদেরকে সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছি। তারা কেউই তা মানেনা। বিষয়টি এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলাবলি করছে কে এই কামাল? তার খুঁটির জোর কোথায়? কার খুঁটির জোরে সে এতোবড় ক্ষমতা দেখাচ্ছে।
প্রতিবন্ধি কামরুন্নাহার ও তার বোন তাছলিমা বেগমের আকুল আকুতি এমনিভাবে আর কতদিন তারা গৃহবন্ধি হয়ে থাকবে। সেলাই কাজটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনে তাদের রোজি-রোজগারের পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এখন নিরুপায়। বর্তমান সমাজে এমনকি কেউ নেই যে অসহায় দুই বোনের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবে? খুলে দিবে ভাইয়ের দেওয়া দেওয়ালটি।














