ঢাকা ০৪:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচন সময়মতো হবে তো? কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ”

এ এইচ ইমরান
  • আপডেট সময় : ৩৫৯ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচন আদৌ সময়মতো হবে কি না, আর যদি হয়ও, সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। দেশের ভেতর ও বাইরের রয়েছে নানামুখী চাপ।
কেননা জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক বড় অপেক্ষার নাম। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশে যে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংকট তৈরি হয়েছিল। তার থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলগুলো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাই এখন একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে একটি অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও কি নির্বাচন সময়মতো হবে? না কি আবারও পিছিয়ে যাবে?
এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যপটের বিশ্লেষণ।
ইসির প্রস্তুতি: রোডম্যাপ কতটা এগিয়েছে?
নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের আগস্টে যে ২৪ দফা রোডম্যাপ প্রকাশ করে, তা ছিল খুবই বিস্তৃত। সেখানে ১৪টি মূল কাজের সময়সূচি দেওয়া হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। ইসির তথ্যমতে ১ কোটি ৮০ লাখ নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির কাজ ইতিমধ্যে ৯০% শেষ করেছেন। আসন পুনঃনির্ধারণ ক্ষেত্রে ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নতুন আসন বিন্যাসের কাজও শেষ হয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে চূড়ান্ত হবে। দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৫৪টি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে, এর মধ্যে ৫৩টির প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষক অনুমোদনের বিষয়ে ১২টি দেশীয় ও ৮টি আন্তর্জাতিক সংস্থার আবেদন জমা পড়েছে, এখনো যাচাই-বাছাই চলছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও আনসারের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬৪ জেলায় “নির্বাচন পূর্ববর্তী নিরাপত্তা পরিকল্পনা” জমা নেওয়া হয়েছে।
ইসির একজন সিনিয়র কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রস্তুত। শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার অপেক্ষায় আছি। তফসিল ঘোষণার জন্য আমাদের সব আয়োজন প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র আঁকছে। প্রশাসনের একাংশ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত; নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা “নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো” নিয়ে দিকনির্দেশনার অপেক্ষায়।
এদিকে, অনেক জেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পর্যায়ে ঘন ঘন বদলি হচ্ছে, যা স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসি বলছে—প্রায় ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ সম্পন্ন হয়েছে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনী পরিবেশ “অর্থহীন” হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পর্যবেক্ষক মহল।
তবে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কে আসছে, কে থাকছে? তা এখনো অস্পষ্ট। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কিছু শর্ত আছে, সিদ্ধান্ত নেই। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, দলের ভেতরে দুটি ধারা সক্রিয়। একটি ধারা বলছে, “নির্বাচনে না গেলে রাজনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হবে দল।” অপর ধারা বলছে, “অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে গেলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে।”তবে মাঠপর্যায়ে তাদের প্রার্থী ঘোষণার পরেও কিছু আসনে এখনো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। ২৩৭ আসনের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। দলের মহাসচিব বলেছেন,
“আমরা নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প দেখছি না। তবে শর্ত হলো, সহনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
এদিকে জামায়াতে ইসলামী
নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পাওয়ার পর থেকেই দলটি পূর্ণ শক্তিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৩০০ আসনেই তাদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ছোট ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনাও চলছে। ইসলামী দল গুলো বলছে, তাদের ভোট যেন ভাখ না হয়। একটি বক্সছে যেন ভোট হয় তা নিয়ে সমমানা দল গুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পার্টি আছে দ্বিধায়।
জাপা চেয়ারম্যান জানান, তারা নির্বাচনে যেতে চান, তবে বিএনপি ও জামায়াতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। জাতীয় পার্টিকে বাদ দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করলে ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, আমাদের কাজ হলো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমঝোতায় পৌঁছায়, সেটি হবে বড় সাফল্য।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও ভোটের গ্রহণযোগ্যতায় বাইরের চাপ কেমন হবে তা নির্ভর করবে ভোটের নিরপেক্ষতায়। এদিকে
আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় একটি প্রি-ইলেকশন মিশন পাঠায়। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নির্বাচনী কাঠামো আগের চেয়ে শক্তিশালী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো সীমিত এবং বিরোধী দলের ওপর এখনো “চাপ রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ স্পষ্ট শর্ত দিয়ে
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এক বিবৃতিতে দিয়ে বলেছেন, আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করি, যেখানে সব দল স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারবে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নও জানিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাতে প্রস্তুত, তবে শর্ত হলো—নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ।
এদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। নতুন ভোটারদের তালিকায় নাম ওঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২৫টি জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ভোটারের নাম “দ্বৈত” বলে চিহ্নিত হয়েছে। ইসি বলছে, এগুলো পর্যালোচনা করে সরিয়ে ফেলা হবে।
আসন পুনঃনির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ
নতুন আদমশুমারি অনুযায়ী আসন পুনঃনির্ধারণে কিছু জেলায় “অসামঞ্জস্য” দেখা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ, আর দক্ষিণের কয়েকটি আসনে ৩ লাখ—এ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের আপত্তি রয়েছে।
পর্যবেক্ষক অনুমোদন নিয়ে দেরির আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর ভিসা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তবে ইসি বলছে, জানুয়ারির মধ্যে সবকিছুই সম্পন্ন করা হবে।
এই পরিস্থিতিতে বলা যাচ্ছে না আসলে কোন পথে বাংলাদেশ? কারণ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, সময়মতো নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬), ইসি রোডম্যাপ বাস্তবায়ন, বড় দল গুলোর অংশগ্রহণ ৬০%। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে, দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা আসবে, সামান্য বিলম্ব (ফেব্রুয়ারি–এপ্রিল ২০২৬), প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক সংলাপের আলোচনায় এখনো দেরি ২৫%। এরফলে
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে, অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব, বড় বিলম্ব বা অচলাবস্থা
বড় দলের অনুপস্থিতি, সহিংসতা, আইনি জটিলতা আছে এখনো ১৫%। এছাড়া নির্বাচন দ্রুত না হলে রাজনৈতিক সংকট গভীর হবে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা আছে।
তবে ডিসেম্বরের চারটি ঘটনায় বুঝা যাবে বাংলাদেশের নতুন একটি ভবিষ্যৎ। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসির তফসিল ঘোষণা (ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ), বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ), ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ (ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ), আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের আগমন (ডিসেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহ)। এই চারটি ঘটনার ওপর নির্ভর করছে—২০২৬ সালের নির্বাচন হবে কি না, এবং সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে এর পূর্বশর্ত হচ্ছে তিনটি। এরমধ্য রাজনৈতিক সমঝোতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা।
ইসির রোডম্যাপ ঠিকমতো বাস্তবায়িত হলে এবং প্রধান দলগুলো ভোটে অংশ নিলে নির্বাচনী পরিবেশ ইতিবাচক থাকবে। অন্যথায়, সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে—যা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য হবে বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন সবসময়ই ছিল একটি বড় প্রশ্ন। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ—দুটোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই হতে পারে নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক সূচনা। শুধু অপেক্ষা রাজনৈতিক সমঝোতার—যা হতে পারে আবার নাও হতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নির্বাচন সময়মতো হবে তো? কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ”

আপডেট সময় :

বাংলাদেশ এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচন আদৌ সময়মতো হবে কি না, আর যদি হয়ও, সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। দেশের ভেতর ও বাইরের রয়েছে নানামুখী চাপ।
কেননা জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক বড় অপেক্ষার নাম। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশে যে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংকট তৈরি হয়েছিল। তার থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলগুলো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সবাই এখন একমাত্র পথ হিসেবে দেখছে একটি অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও কি নির্বাচন সময়মতো হবে? না কি আবারও পিছিয়ে যাবে?
এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যপটের বিশ্লেষণ।
ইসির প্রস্তুতি: রোডম্যাপ কতটা এগিয়েছে?
নির্বাচন কমিশন ২০২৫ সালের আগস্টে যে ২৪ দফা রোডম্যাপ প্রকাশ করে, তা ছিল খুবই বিস্তৃত। সেখানে ১৪টি মূল কাজের সময়সূচি দেওয়া হয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। ইসির তথ্যমতে ১ কোটি ৮০ লাখ নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির কাজ ইতিমধ্যে ৯০% শেষ করেছেন। আসন পুনঃনির্ধারণ ক্ষেত্রে ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নতুন আসন বিন্যাসের কাজও শেষ হয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে চূড়ান্ত হবে। দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ৫৪টি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে, এর মধ্যে ৫৩টির প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষক অনুমোদনের বিষয়ে ১২টি দেশীয় ও ৮টি আন্তর্জাতিক সংস্থার আবেদন জমা পড়েছে, এখনো যাচাই-বাছাই চলছে।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও আনসারের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬৪ জেলায় “নির্বাচন পূর্ববর্তী নিরাপত্তা পরিকল্পনা” জমা নেওয়া হয়েছে।
ইসির একজন সিনিয়র কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা প্রস্তুত। শুধু রাজনৈতিক সমঝোতার অপেক্ষায় আছি। তফসিল ঘোষণার জন্য আমাদের সব আয়োজন প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র আঁকছে। প্রশাসনের একাংশ এখনো দ্বিধাগ্রস্ত; নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা “নিরপেক্ষ সরকারের কাঠামো” নিয়ে দিকনির্দেশনার অপেক্ষায়।
এদিকে, অনেক জেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার পর্যায়ে ঘন ঘন বদলি হচ্ছে, যা স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসি বলছে—প্রায় ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ সম্পন্ন হয়েছে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনী পরিবেশ “অর্থহীন” হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পর্যবেক্ষক মহল।
তবে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কে আসছে, কে থাকছে? তা এখনো অস্পষ্ট। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কিছু শর্ত আছে, সিদ্ধান্ত নেই। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, দলের ভেতরে দুটি ধারা সক্রিয়। একটি ধারা বলছে, “নির্বাচনে না গেলে রাজনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হবে দল।” অপর ধারা বলছে, “অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে গেলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে।”তবে মাঠপর্যায়ে তাদের প্রার্থী ঘোষণার পরেও কিছু আসনে এখনো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। ২৩৭ আসনের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। দলের মহাসচিব বলেছেন,
“আমরা নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প দেখছি না। তবে শর্ত হলো, সহনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”
এদিকে জামায়াতে ইসলামী
নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পাওয়ার পর থেকেই দলটি পূর্ণ শক্তিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৩০০ আসনেই তাদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ছোট ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনাও চলছে। ইসলামী দল গুলো বলছে, তাদের ভোট যেন ভাখ না হয়। একটি বক্সছে যেন ভোট হয় তা নিয়ে সমমানা দল গুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পার্টি আছে দ্বিধায়।
জাপা চেয়ারম্যান জানান, তারা নির্বাচনে যেতে চান, তবে বিএনপি ও জামায়াতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। জাতীয় পার্টিকে বাদ দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করলে ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস একাধিক বক্তব্যে বলেছেন, আমাদের কাজ হলো নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সমঝোতায় পৌঁছায়, সেটি হবে বড় সাফল্য।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও ভোটের গ্রহণযোগ্যতায় বাইরের চাপ কেমন হবে তা নির্ভর করবে ভোটের নিরপেক্ষতায়। এদিকে
আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় একটি প্রি-ইলেকশন মিশন পাঠায়। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নির্বাচনী কাঠামো আগের চেয়ে শক্তিশালী, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো সীমিত এবং বিরোধী দলের ওপর এখনো “চাপ রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ স্পষ্ট শর্ত দিয়ে
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এক বিবৃতিতে দিয়ে বলেছেন, আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রত্যাশা করি, যেখানে সব দল স্বাধীনভাবে অংশ নিতে পারবে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নও জানিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাতে প্রস্তুত, তবে শর্ত হলো—নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ।
এদিকে ভোটার তালিকা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। নতুন ভোটারদের তালিকায় নাম ওঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২৫টি জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ভোটারের নাম “দ্বৈত” বলে চিহ্নিত হয়েছে। ইসি বলছে, এগুলো পর্যালোচনা করে সরিয়ে ফেলা হবে।
আসন পুনঃনির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ
নতুন আদমশুমারি অনুযায়ী আসন পুনঃনির্ধারণে কিছু জেলায় “অসামঞ্জস্য” দেখা দিয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি আসনে ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ, আর দক্ষিণের কয়েকটি আসনে ৩ লাখ—এ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের আপত্তি রয়েছে।
পর্যবেক্ষক অনুমোদন নিয়ে দেরির আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর ভিসা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তবে ইসি বলছে, জানুয়ারির মধ্যে সবকিছুই সম্পন্ন করা হবে।
এই পরিস্থিতিতে বলা যাচ্ছে না আসলে কোন পথে বাংলাদেশ? কারণ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, সময়মতো নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬), ইসি রোডম্যাপ বাস্তবায়ন, বড় দল গুলোর অংশগ্রহণ ৬০%। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে, দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা আসবে, সামান্য বিলম্ব (ফেব্রুয়ারি–এপ্রিল ২০২৬), প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক সংলাপের আলোচনায় এখনো দেরি ২৫%। এরফলে
আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে, অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব, বড় বিলম্ব বা অচলাবস্থা
বড় দলের অনুপস্থিতি, সহিংসতা, আইনি জটিলতা আছে এখনো ১৫%। এছাড়া নির্বাচন দ্রুত না হলে রাজনৈতিক সংকট গভীর হবে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা আছে।
তবে ডিসেম্বরের চারটি ঘটনায় বুঝা যাবে বাংলাদেশের নতুন একটি ভবিষ্যৎ। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসির তফসিল ঘোষণা (ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ), বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ), ভোটার তালিকা চূড়ান্তকরণ (ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ), আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের আগমন (ডিসেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহ)। এই চারটি ঘটনার ওপর নির্ভর করছে—২০২৬ সালের নির্বাচন হবে কি না, এবং সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে এর পূর্বশর্ত হচ্ছে তিনটি। এরমধ্য রাজনৈতিক সমঝোতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা।
ইসির রোডম্যাপ ঠিকমতো বাস্তবায়িত হলে এবং প্রধান দলগুলো ভোটে অংশ নিলে নির্বাচনী পরিবেশ ইতিবাচক থাকবে। অন্যথায়, সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে—যা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য হবে বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন সবসময়ই ছিল একটি বড় প্রশ্ন। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহ—দুটোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই হতে পারে নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক সূচনা। শুধু অপেক্ষা রাজনৈতিক সমঝোতার—যা হতে পারে আবার নাও হতে পারে।