রাজধানীর সড়কগুলো, অলিগলিতে হাটু থেকে কোমর পানি
ঢাকা যেন খালের নগরী
- আপডেট সময় : ২৫৩ বার পড়া হয়েছে
দু’দিন আগে গত শনিবার গভীর রাতের মুষলধারা বৃষ্টি যখন থামার নামই নিচ্ছিল না, তখন রাজধানীবাসী বুঝে গিয়েছিল সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসটা সহজে পার হবে না। হলোও তাই। গতকাল রোববার ভোর গড়িয়ে দুপুর পেরিয়ে বিকাশ হলো, আকাশও পরিষ্কার হয়, তবে সেই বৃষ্টির পানি আর রাস্তা থেকে সরেনি, তলিয়ে আছে ঢাকার বড় একটা অংশ। মতিঝিল থেকে মিরপুর, ধানমন্ডি থেকে পুরান ঢাকা প্রায় সর্বত্র একই চিত্র হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি, বিকল হয়ে পড়ে থাকা যানবাহন অফিস থেকে বাড়ি ফেরা অসহায় মানুষের দীর্ঘ সারি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় রাজধানীতে ঝরেছে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি, আর গত ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ মিলিমিটারে, যা সংস্থাটির মানদণ্ড অনুযায়ী অতিভারী বর্ষণ। আবহাওয়াবিদদের ভাষ্যে, চলতি জুলাই মাসে এটিই এখন পর্যন্ত রাজধানীর সর্বোচ্চ দৈনিক বৃষ্টিপাত। স্বল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ পানি নামায় নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থা তা সামলাতে পারেনি, ফলে দ্রুতই সড়কগুলো পরিণত হয় ছোট ছোট খালে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে শেওড়াপাড়ায়, যেখানে প্রধান সড়কের পাশাপাশি প্রায় সব অলিগলিই পানির নিচে চলে গেছে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের কিছু অংশ, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি চত্বর, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, ধানমন্ডি ২৭, সোবহানবাগ, সায়েন্স ল্যাব, ফকিরাপুল, কমলাপুর এবং পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড, বংশাল, তাঁতীবাজার, সূত্রাপুর ও চকবাজারের একাংশে জলাবদ্ধতা এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আগারগাঁও-জাহাঙ্গীর গেট সংযোগ সড়ক, খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট এবং গুলশান লেকপাড়, কালাচাঁদপুর, বারিধারার সংযোগ সড়কও পানির নিচে চলে যাওয়ায় ওই এলাকাগুলোর সঙ্গে বাকি শহরের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জমে থাকা পানিতে বহু সিএনজি ও মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে মাঝরাস্তায় আটকে যায়, কোথাও কোথাও রিকশা-অটোরিকশা উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ভোগান্তির এই চিত্রে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয়েছে দিনমজুর, রিকশাচালক ও খেটে খাওয়া মানুষদের, যাঁদের বৃষ্টি উপেক্ষা করেই রুজির খোঁজে বেরোতে হয়েছে। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভোর থেকে অঝোর বৃষ্টিতে রাস্তায় কোনো যানবাহন না পেয়ে বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া গুনে গন্তব্যে রওনা হলেও পুরো পথেই জলাবদ্ধতার কবলে পড়তে হয়েছে। গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল সীমিত, তাই বাসস্ট্যান্ডগুলোতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। ফুটপাত ডুবে যাওয়ায় বহু পথচারীকে ব্যস্ত সড়ক দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে মিরপুরের একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয় ও কলেজ তাদের নির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন বাজারে দোকানপাট খোলা থাকলেও পানি জমে থাকায় ক্রেতার উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা, ফলে ব্যবসায়ীদেরও গুনতে হয়েছে লোকসান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে মাঠে নামতে দেখা গেছে। আজিমপুরে ইডেন মহিলা কলেজের কাছে একটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে সংস্থাটির প্রশাসক নিজে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে অপসারণ কাজ তদারকি করেন, প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় সড়কটি ফের সচল হয়। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে জনগণকে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার অনুরোধও জানানো হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়র, প্রতি বর্ষায় কেন একই দৃশ্য ফিরে আসে? নগর পরিকল্পনাবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার শিকড় বহু পুরোনো ও বহুমুখী। একটি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত আট দশকে ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়ে গেছে দখল, ভরাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে, যার ফলে শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্কই ভেঙে পড়েছে। ঢাকা ওয়াসার এক সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞের ভাষ্যে, জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে হলে ক্যাচপিট, ড্রেন ও পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আশপাশের নদী পরিষ্কার করে তাদের ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা জরুরি; বর্তমানে থাকা পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। সংশ্লিষ্টদের বিশ্লেষণে জলাবদ্ধতার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, পানি ধারণের জলাধার ভরাট, নিষ্কাশন চ্যানেল দখল, খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তর এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কারে জনবল ঘাটতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যততত্র প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য ফেলার প্রবণতা, যা ড্রেনের ক্যাচপিট আটকে পানি সরতে দেরি করিয়ে দেয়।
দুই সিটি করপোরেশন প্রতি বছরই জলাবদ্ধতা নিরসনে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প ও নতুন রাস্তা-নর্দমা নির্মাণের ঘোষণা দেয়; খাল পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনাও নতুন নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বৃষ্টি নামলেই সেই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে যায় জমে থাকা পানির নিচে-এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, সমস্যার সাময়িক প্রতিকার হলেও কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দেখা মেলে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রোববার সারাদিনই ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, তবে সোমবার থেকে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যেই দেশের উপকূলীয় কিছু জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, যা এই মৌসুমি বৃষ্টিবলয়ের ব্যাপকতা স্পষ্ট করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে ড্রেন ও ক্যাচপিট নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি এবং জরুরি পাম্পিং সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন দখলমুক্ত খাল পুনরুদ্ধার, সমন্বিত ও আধুনিক ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নগর উন্নয়নে জলাধার সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক করা। নগরবাসীর প্রত্যাশা একটাই প্রতিটি বর্ষায় নতুন করে ভোগান্তির শিকার না হয়ে একটি বাসযোগ্য, জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যেকার দীর্ঘ দূরত্ব ঘোচানো না গেলে, আগামী বর্ষায়ও হয়তো একই খবরের শিরোনাম হবে আবার পানির নিচে ঢাকা।
























