পিজি ও সুপার হাসপাতাল গিলে খাচ্ছে বহিস্কৃতরা
- আপডেট সময় : ৫০ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর স্বনামধন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সুপার স্পেশালাইজড ঘিরে অর্ধশত চাঁদাবাজ, চোর ছিনতাইকারী তদ্বিরবাজ এবং দালাল সক্রিয় রয়েছে। মুলত এরাই ক্ষমতাসীন একটি রাজনৈতিকদলের ব্যানারে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর তাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং লুটপাটের অভিযোগে ওয়ার্ড ও থানা কমিটির কয়েকজন বাদে সিংহভাগ নেতা সদস্যদের বহিস্কার করেছিল। তারপরও থেমে থাকেনি তাদের অনৈতিক কাজ। এক কথায় বলা চলে এরাই সাবেক পিজি হাসপাতাল ও সংলগ্ন নতুন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল গিলে খাচ্ছে। চলছে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও হত্যার হুমকি। দলীয় ব্যানারে এদের দাপটে সংশ্লিষ্ট দুই হাসপাতালের প্রশাসন নির্বিকার। প্রশাসনের অসহায়ত্বের কারনে গত রোজার ঈদের আগে সুপার হাসপাতালের মালামাল চুরির ট্রাক আটকে দিয়ে এদের হাতে নাজেহাল হয়েছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সহকারী পরিচালক।
স্থানীয় হাসপাতাল কর্মচারী ও ব্যবসায়িদের অভিযোগ, ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত পিজি হাসপাতাল এলাকায় ঔষধ সরবরাহ ও আইসিইউ শয্যা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় একটি সিন্ডিকেট নীরব চাঁদাবাজি করছে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আইসিইউতে ঔষধ সরবরাহের জন্য নির্ধারিত দোকানগুলোর প্রতিটির কাছ থেকে প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকা (প্রতি দোকান প্রায় ১০,০০০থেকে ২০০০০ টাকা) চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
অভিযোগ মতে, স্থানীয় এক নেতার নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট আইসিইউর ওষুধ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। ঔষধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা দাবি ও আদায় করা হয়। হাসপাতালের শয্যা বা আইসিইউ কেবিনের জন্য নির্দিষ্ট দোকানে যোগাযোগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে রোগীদের। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা নিয়ম না মানলে দোকান বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়। তবে, অভিযুক্তরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তারা শুধু শয্যা ও ঔষধ সরবরাহ সুশৃঙ্খল করতে ‘ব্যবস্থাপনা’ করছেন। এই পরিস্থিতি হাসপাতালের সাধারণ রোগী ও ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া গত ২০ এপ্রিল গভীর রাতে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে বেইজমেন্ট থেকে চুরির ঘটনা ঘটে। একটি চক্র হাসপাতালের নির্মাণকাজের মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত ছয়টি পিকআপ ভ্যানে করে এসব সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে হাসপাতালের নিরাপত্তা বলয় ডিঙিয়ে কার্টনে ভর্তি সরঞ্জাম পিকআপে তোলা হয়। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, লুটপাটের একটি ভিডিও ফুটেজ তাদের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, মালামাল ভর্তি একটি পিকআপের চালক বলছেন এসব সরঞ্জাম গুলশান কাঁচাবাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ চুরির ঘটনার পর বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের প্রকৌশলীসহ ২ কর্মচারী ও একজন পেশাদার চোরকে গ্রেফতার এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে আনা হয়েছে।
পুলিশ বলেছে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের মালামাল চুরির ঘটনায় জড়িত অভিযোগে হাসপাতালের কম্পিউটার অপারেটর ও প্রকৌশলীসহ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২২ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর ব্যস্ততম শাহবাগ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন হাসপাতালের কম্পিউটার অপারেটর মো. এামুন, প্রকৌশলী মামুনুর রশীদ এবং মাসুম বিল্লাহ।
তিনি জানান, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে মালামাল চুরির ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে। আমরা মালামাল উদ্ধারে তাদের দুইজনকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছি। হাসপাতালের আনসার ক্যাম্পের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) হাফিজুল ইসলামের জবানবন্দিতে জানান, ঘটনার দিন বিকেলে হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. মো শাহিদুল হাসানের পিএস তাকে ডেকে জানান যে বেজমেন্ট থেকে কিছু মালামাল বের হবে। পিসি গেট পাস চাইলে তাকে সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। মাহমুদুল হাসান তাকে জানান যে বিষয়টি তিনি অবগত আছেন এবং প্রকৌশলী মামুনুর রশীদের কাছে অনুমতিপত্র রয়েছে। জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বেজমেন্টে দুটি মিনি ট্রাক প্রবেশ করে। সেখানে আগে থেকেই প্রকৌশলী মামুনুর রশীদ ও কম্পিউটার অপারেটর মামুন উপস্থিত ছিলেন। পরে আরও চারটি ট্রাক ভেতরে ঢোকে। দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা মালামাল বের করার অনুমতিপত্রের ছবি তুলতে চাইলে অভিযুক্তরা বাধা দেন এবং স্টোরের দায়িত্বে থাকার দোহাই দিয়ে ছবি তুলতে নিষেধ করেন।
পুলিশের ভাষ্যমতে, হাসপাতালের কর্মচারিদের সঙ্গে স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মিরা জড়িত রয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের শাহবাগ ইউনিটের প্রায় ৫ থেকে ৬ জন জড়িত রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আমরা তাদের নাম প্রকাশ করছিনা। তথ্য প্রমান সাপেক্ষে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। মামলার তদন্ত চলছে। চোরাইকৃত মালামালসহ সর্বমোট ৬ পিকআপ মালামাল জব্দ করা হয়েছে। দুই আসামিকে রিমান্ডে আনা হচ্ছে। তাদের আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এর আগেও একাধিকবার এই সিন্ডিকেট রাতের অন্ধকারে হাসপাতালের মালামাল পাচারের সময় হাসপাতালের আনসার সদস্যরা আটক করেছিল। সে সময়ে এই সিন্ডিকেট আনসার সদস্যদের উপর হামলা করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ওই দলীয় ব্যানারে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবসা করায়ত্ব করেছে। আশপাশের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সকল অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায় করছে। পার্শ্ববর্তী আজিজ সুপার বৃহৎ মেডিসিন মার্কেটের সকল দোকান থেকে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে এই সিন্ডিকেট। বিষয়টি দেখার কেউ নেই। অপরদিকে চুরির বিষয়টি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও বিএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী গতকাল দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আমরা সকাল ১১টার দিকে ৩ জনকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছি।
এদিকে তিনজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান। গ্রেফতার কম্পিউটার অপারেটর ও প্রকৌশলীসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে উল্লেখ করে পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের আরও কর্মচারী জড়িত কি না, তা নিয়েও তদন্ত করা হচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেছেন বলেন, ২০২৩ সালে প্রজেক্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর তখন হুন্দাই কোম্পানির অব্যবহৃত কিছু মালামাল ওরা রেখে যায়। নির্মাণকাজের কিছু ভাঙারি পর্যায়ের, যেমন রড, ম্যাটালিক ও অ্যালুমিনিয়ামের কিছু জিনিসপত্র, যা তারা নিতে পারেনি। সেগুলো বেইজমেন্টে স্টোরের মধ্যে ছিল। দেখতে পেলাম, এসব সামগ্রী কেউ কেউ অনুমতি ছাড়া নিয়ে গেছে।
অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মুন্সী বলেন, আশা করি, কয়েকদিনের মধ্যে একটা ফলাফল বেরিয়ে আসবে। কিছু লোক আছে, যারা ভাঙারি জিনিস বিক্রি করে অর্থ কামাই করে থাকে। আমরা ইতিমধ্যে তাদের কাউকে কাউকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে নাম বলা যাচ্ছে না। কারও কারও বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। সম্পৃক্তদের শাস্তি প্রদানের চেষ্টা অব্যাহত আছে। আমরা চিকিৎসক মানুষ। অপরাধীদের সঙ্গে কাজ করা কঠিন।
এবিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে লুট হওয়া মালামাল চিকিৎসা সরঞ্জাম নয় জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এগুলো ভবন নির্মাণসামগ্রী। তবে লুটে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।
গত ২২ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে বাংলাদেশ-চীন জয়েন্ট সার্জিক্যাল ক্লিনিক চালুর লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী একথা জানান।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে ছয় ট্রাক চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা সরঞ্জাম না, এখনো সমস্ত মালগুলো চেক করা যায়নি। তবে আপনাদেরকে নিশ্চয়তার সঙ্গে বলতে পারি, এগুলো লোহা জাতীয় জিনিস, কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়ালের পার্ট, আমরা ভিডিওতে যা দেখেছি। এ সময় জড়িতদের বিচারের আশ্বাস দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বলেন, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। সে যে-ই হোক না কেন, যারাই এর সঙ্গে জড়িত, যত বড় অফিসারই হোক জড়িত প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হবে। যদি চাকরিজীবী হয়ে থাকে, চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এ ছাড়াও সম্প্রতি কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও অন্যান্য বড় হাসপাতালে অস্ত্রসহ ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
তিনি বলেন, কিছু কিছু লোক আমাদের সম্মানিত ডাক্তারদের ওপর আঘাত হানে। এক ঘণ্টা আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ পাঁচশ হাসপাতালে আমরা আগামী কিছু দিনের মধ্যে দশজন করে সশস্ত্র আনসার সদস্য নিয়োগ করতে যাচ্ছি ইনশাল্লাহ।






















