বালিশকান্ডের সেই ঠিকাদারই পেলেন ৩০০ কোটি টাকার কাজ
- আপডেট সময় : ২৫৮ বার পড়া হয়েছে
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বহুল আলোচিত ‘বালিশকান্ডে’র অন্যতম হোতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি ভাঙার কারিগর সেই বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’ (এমএসসিএল) আবারও বড় কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এবার বিসিআইসির অধীনে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি সার গুদাম নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে এবং অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে তাদের এই কাজ পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে খোদ বিসিআইসি চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
সর্বনিম্ন দরদাতাকে পাশ কাটানোর কৌশল
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার ইউরিয়া সারের গুদাম নির্মাণের জন্য গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় চারটি প্রতিষ্ঠান: এনডিই-বিডিইএল (জেভি), এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল, এমএসসিএল-পিসিএল এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড।
আর্থিক প্রস্তাব অনুযায়ী, এসএস রহমান ইন্টারন্যাশনাল সর্বনিম্ন দর (৫৯ কোটি ২০ লাখ টাকা) প্রস্তাব করলেও তাদের বাদ দেওয়া হয়। এমনকি কারিগরি মূল্যায়নে শীর্ষে থাকা খুলনা শিপইয়ার্ডকেও (৫৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা) কাজ দেওয়া হয়নি। রহস্যজনকভাবে ৫৯ কোটি ২২ লাখ টাকার প্রস্তাবকারী মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনকে ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ (NOA) প্রদান করা হয়েছে।
নেপথ্যে বিসিআইসি চেয়ারম্যান ও পিডি অভিযোগ উঠেছে, বিসিআইসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. ফজলুর রহমান এবং প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের নানা অজুহাতে ‘নন-রেসপনসিভ’ করা হয়।
জানা গেছে, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে পাঁচটি গুদাম নির্মাণের কাজই পাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি গুদামে প্রায় ৬০ কোটি টাকা করে মোট ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প এখন বালিশকান্ডে অভিযুক্তদের হাতে।
“তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা দুর্নীতির ডালপালাকে আরও বিস্তৃত করেছে বলে দাবি করেন অপূর্ব কুমার মন্ডল, যুগ্ম সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয় (তদন্ত কমিটির প্রধান)।
কে এই মজিদ সন্স?
মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশনের অতীত ইতিহাস ব্যাপক বিতর্ক ও অনিয়মে ঠাসা।
স্মৃতিচিহ্ন মোছার কারিগর মজিদ সন্স ২০১০ সালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বেগম খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়িটি রাতারাতি ভেঙে ফেলার দায়িত্ব নিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান। অন্য ঠিকাদাররা অস্বীকৃতি জানালেও এমএসসিএল স্ব-উদ্যোগে এই কাজ সম্পন্ন করে বিগত সরকারের ‘গুড বুকে’ নাম লেখায়।
মজিদ সন্সকে বালিশকান্ডে ২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে অস্বাভাবিক দামে আসবাবপত্র সরবরাহের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আসিফ হোসেনকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে প্রায় ১৫ কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্ত করছে। এছাড়াও নির্মাণে গাফিলতি ২০২৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এই প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন হলের ছাদ ধসে পড়ার ঘটনায় আবারও তাদের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া রুয়েট ও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজেও সময়ক্ষেপণের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক ভোলবদল করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি নিজেদের অবস্থান পাল্টে ফেলে। আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী এই প্রতিষ্ঠানের মালিক এখন প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় বিসিআইসির কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির সমর্থক ঠিকাদারদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, যে প্রতিষ্ঠান জাতীয়তাবাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে কাজ করেছে, তারা এখন নতুন প্রশাসনেও কীভাবে পুনর্বাসিত হচ্ছে—তা রহস্যজনক।
এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভাষ্য হচ্ছে, অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক মো. মঞ্জুরুল হক জানান, নিয়ম মেনেই কাজ দেওয়া হয়েছে। তবে অতীতের বিতর্ক বা বাড়ি ভাঙার বিষয়ে তার কিছু ‘জানা নেই’ বলে এড়িয়ে যান।
উল্লেখ্য, মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে শিল্প মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও অদৃশ্য কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।














