ঢাকা ০৬:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬

নদীর কান্না, নারীর কণ্ঠে প্রতিবাদ

কুড়িগ্রামে ধরলা নদী বাঁচাতে নারীদের সেমিনার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১১০ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর ভয়াবহ অবস্থা, নদীভাঙন ও নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবনসংগ্রাম মূল্যায়নে নদী তীরবর্তী নারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় এক আবেগঘন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ব্লু প্লানেট ইনিশিয়েটিভের তত্ত্বাবধানে এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট (অঋঅউ)-এর সহযোগিতায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কুড়িগ্রাম শহরের খলিলগঞ্জ এলাকায় এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন নদী বিশেষজ্ঞ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন পাঁচগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন, হলোখানা ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, মোগলবাসা ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান মিলন, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহিন মিয়া, সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনিরুর রহমান মন্ডল এবং ব্লু প্লানেট ইনিশিয়েটিভের ডঋঋউ কনসালটেন্ট সানজিদা রহমান, অঋঅউ সমন্বয়কারী রেশমা সুলতানা,সাংবাদিক সুজন মোহন্ত প্রমুখ ।
সেমিনারে নদীভাঙনের শিকার মোগলবাসা ইউনিয়নের কুমুদিনি, রিজিয়া, সুভদ্রাসহ বহু ভুক্তভোগী নারী তাঁদের জীবনের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে কান্নাজড়িত বক্তব্য দেন। বসতভিটা হারানো, সন্তানদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার অভাব আর অনিশ্চিত জীবনের গল্পে পুরো সভা আবেগে ভারী হয়ে ওঠে।
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, কুড়িগ্রাম জেলায় ১৬টি নদ-নদী থাকলেও বিচ্ছিন্ন চর ও দ্বীপচর মিলিয়ে রয়েছে ৪৬৯টি চর। এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এসব চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও খাদ্য সংকটের কারণে কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বর্তমানে জেলার ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ দরিদ্র। শুধু নদী শাসন করলেই হবে না, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো একটি আলাদা চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়।
নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, পানির প্রশ্নে ভারতের বিমাতাসুলভ আচরণ দীর্ঘদিনের। ভারত কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর ওপর নির্যাতন শুরু করেছে। ধরলা নদীর পানি কোচবিহার জেলার জলঢাকা নদীর মাধ্যমে তিস্তায় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, ফলে ধরলা নদীতে পানি থাকার সম্ভাবনা খুবই কমে যাবে।
তিনি আরও বলেন, কাগজে-কলমে কুড়িগ্রামে ১৬টি নদীর কথা বলা হলেও বাস্তবে অন্তত ৫০টি নদ-নদী রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো অস্তিত্ব সংকটে। এসব নদী উদ্ধার ও রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে ধরলা নদী তীরবর্তী বাসিন্দা কুমুদিনি, রিজিয়া, সুভদ্রাসহ অনেকে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনের হৃদয়বিদারক কাহিনী তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে—নদী শুধু পানি নয়, নদীই তাঁদের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।
সেমিনারের শেষে বক্তারা নদী রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, চরাঞ্চলের মানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নদীর কান্না, নারীর কণ্ঠে প্রতিবাদ

কুড়িগ্রামে ধরলা নদী বাঁচাতে নারীদের সেমিনার

আপডেট সময় :

কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর ভয়াবহ অবস্থা, নদীভাঙন ও নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবনসংগ্রাম মূল্যায়নে নদী তীরবর্তী নারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততায় এক আবেগঘন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ব্লু প্লানেট ইনিশিয়েটিভের তত্ত্বাবধানে এবং অ্যাসোসিয়েশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট (অঋঅউ)-এর সহযোগিতায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কুড়িগ্রাম শহরের খলিলগঞ্জ এলাকায় এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন নদী বিশেষজ্ঞ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন পাঁচগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন, হলোখানা ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, মোগলবাসা ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজার রহমান মিলন, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহিন মিয়া, সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনিরুর রহমান মন্ডল এবং ব্লু প্লানেট ইনিশিয়েটিভের ডঋঋউ কনসালটেন্ট সানজিদা রহমান, অঋঅউ সমন্বয়কারী রেশমা সুলতানা,সাংবাদিক সুজন মোহন্ত প্রমুখ ।
সেমিনারে নদীভাঙনের শিকার মোগলবাসা ইউনিয়নের কুমুদিনি, রিজিয়া, সুভদ্রাসহ বহু ভুক্তভোগী নারী তাঁদের জীবনের করুণ বাস্তবতা তুলে ধরে কান্নাজড়িত বক্তব্য দেন। বসতভিটা হারানো, সন্তানদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার অভাব আর অনিশ্চিত জীবনের গল্পে পুরো সভা আবেগে ভারী হয়ে ওঠে।
জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, কুড়িগ্রাম জেলায় ১৬টি নদ-নদী থাকলেও বিচ্ছিন্ন চর ও দ্বীপচর মিলিয়ে রয়েছে ৪৬৯টি চর। এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এসব চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও খাদ্য সংকটের কারণে কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বর্তমানে জেলার ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ দরিদ্র। শুধু নদী শাসন করলেই হবে না, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো একটি আলাদা চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়।
নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, পানির প্রশ্নে ভারতের বিমাতাসুলভ আচরণ দীর্ঘদিনের। ভারত কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর ওপর নির্যাতন শুরু করেছে। ধরলা নদীর পানি কোচবিহার জেলার জলঢাকা নদীর মাধ্যমে তিস্তায় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, ফলে ধরলা নদীতে পানি থাকার সম্ভাবনা খুবই কমে যাবে।
তিনি আরও বলেন, কাগজে-কলমে কুড়িগ্রামে ১৬টি নদীর কথা বলা হলেও বাস্তবে অন্তত ৫০টি নদ-নদী রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো অস্তিত্ব সংকটে। এসব নদী উদ্ধার ও রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে ধরলা নদী তীরবর্তী বাসিন্দা কুমুদিনি, রিজিয়া, সুভদ্রাসহ অনেকে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনের হৃদয়বিদারক কাহিনী তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে—নদী শুধু পানি নয়, নদীই তাঁদের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।
সেমিনারের শেষে বক্তারা নদী রক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, চরাঞ্চলের মানুষের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন।