ঢাকা ০৮:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

তিন সরকারের সাক্ষী এক রাষ্ট্রপতি

মহিউদ্দিন তুষার, সিনিয়র রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ২১ বার পড়া হয়েছে

মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মেয়াদ শেষ হতে বাকি এখনও প্রায় পৌনে দুই বছর, তবু সেই অপেক্ষায় থাকলেন না বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন, বঙ্গভবন অধ্যায়ের ইতি টানছেন এখনই। পদত্যাগপত্রে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে অসুস্থতা, নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে স্নায়ুরোগের কথা। কিন্তু কাগজে-কলমের এই ব্যাখ্যার আড়ালে রয়েছে ঢের বড় এক প্রেক্ষাপট। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই তাঁকে ঘিরে চলছিল যে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক, এই বিদায় যেন তারই এক অনিবার্য পরিণতি। প্রশ্ন উঠেছিল বারবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছেন, তাঁর পদে থাকার বৈধতা কতটুকু, আর সংকটকালে তাঁর প্রকৃত ভূমিকাই বা ছিল কী। সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়েই এবার বিদায় নিচ্ছেন সাহাবুদ্দিন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তা গ্রহণ করা হয়েছে। পদত্যাগপত্রে তাঁর অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্তের কথা উল্লেখ করা হয়, যার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়েন বলে জানানো হয়। শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালন সম্ভব হচ্ছে না এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন বলেও পত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে চিঠিতে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা বলা হয়নি।

পদত্যাগ নিয়ে জানতে চাইলে সাহাবুদ্দিন গণমাধ্যমকে সংক্ষেপে জানান, বিষয়টি এখন সবার জানা, তাই নতুন করে বলার কিছু নেই এবং তিনি অসুস্থ বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বঙ্গভবন সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, তিনি ইতিমধ্যে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলতি মাসের মধ্যে বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন এবং কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত মালামাল গোছানোও শুরু করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, রোববার দুপুরের দিকে তিনি বঙ্গভবন ত্যাগ করে গুলশানের নিজস্ব বাসভবনে উঠতে পারেন। পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন; তাঁর স্থলাভিষিক্ত ডেপুটি স্পিকার সাংসদীয় দায়িত্ব সামলাবেন।

মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে শপথ নেন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১৬ মাসের মাথায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। ওই দিনই জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি জানান, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এরপর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার আদেশ দেন তিনি এবং ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে শপথ পড়ান। সবশেষ চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর তাঁর কাছেই শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এভাবে প্রায় তিন বছর তিন মাসের মেয়াদে তিনি তিনটি ভিন্ন চরিত্রের সরকার-নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার, অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সবশেষ নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে তিন ধরনের সরকার পরিবর্তনের সাক্ষী হওয়া এবং প্রতিটির শপথ পরিচালনার নজির বিরল। সংসদ বিষয়ক গবেষকদের একাংশের মূল্যায়ন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় তিনি একটি ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছিলেন।
তবে তাঁর মেয়াদ শুরু থেকেই বিতর্কমুক্ত ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হওয়ায় গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বসহ বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে পদ থেকে সরানোর দাবি ওঠে। এই দাবি সত্ত্বেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন। এরপর শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে অস্পষ্টতা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় রাষ্ট্রপতি নিজেই পরে জানান, শেখ হাসিনার স্বাক্ষরিত কোনো পদত্যাগপত্র বা তার প্রমাণ তাঁর কাছে পৌঁছায়নি, যদিও ৫ আগস্টের ভাষণে তিনি পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা বলেছিলেন। সংবিধানের ৫৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার বিধান থাকায় এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আইনি ও রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনার জন্ম দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রায় সাত মাস সাক্ষাৎ না হওয়া, রাষ্ট্রপতির প্রেস বিভাগ প্রত্যাহার এবং বিদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তাঁর প্রতিকৃতি অপসারণের মতো ঘটনা তাঁর সঙ্গে সরকারের দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি নিজেই বলেছিলেন, নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগ করার ইচ্ছা তাঁর রয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন বলেও মন্তব্য করেছেন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, নয়তো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। নির্বাচনের পর তারেক রহমানের সরকারকে শপথ পড়ানোর পরও তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে রেখে দেওয়া নিয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি শরিক দল আপত্তি তোলে, এবং সংসদে তাঁর ভাষণ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।

পদত্যাগের ঠিক আগে জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি টেলিফোনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার সম্ভাব্য পরিকল্পনার খবরের মধ্যেই এই তথ্য প্রকাশ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে পদ ছাড়তে পারেন। পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন যা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে। সংসদে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো নাম চূড়ান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবর জানাতে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজে একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন দিয়েছেন তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী জনগণের সরকারের প্রতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থন ছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল প্রশ্ন ছিল একটাই পুরো মেয়াদে তিনি সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা কতটা বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী প্রকৃতির, নির্বাহী ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও সংসদ ভাঙা, সরকার পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা এবং অধ্যাদেশে সইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করে সাহাবুদ্দিন এক অস্থির সময়ে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে ছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাঁর একাধিক বক্তব্য ও অবস্থান, বিশেষত শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গ, বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন।

সাধারণ মানুষের কাছে সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্ব মূলত মনে থাকবে একটি ক্রান্তিকালের প্রতীক হিসেবে, যিনি ক্ষমতাচ্যুত সরকার, বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ও নির্বাচিত নতুন সরকার তিন ধরনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে টিকে ছিলেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগে তাঁর এই বিদায় শুধু একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তিও বটে। আগামী দিনে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয় এবং তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মধ্য দিয়ে হয় নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় সেদিকেই এখন নজর সবার।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

তিন সরকারের সাক্ষী এক রাষ্ট্রপতি

আপডেট সময় :

মেয়াদ শেষ হতে বাকি এখনও প্রায় পৌনে দুই বছর, তবু সেই অপেক্ষায় থাকলেন না বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন, বঙ্গভবন অধ্যায়ের ইতি টানছেন এখনই। পদত্যাগপত্রে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে অসুস্থতা, নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে স্নায়ুরোগের কথা। কিন্তু কাগজে-কলমের এই ব্যাখ্যার আড়ালে রয়েছে ঢের বড় এক প্রেক্ষাপট। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই তাঁকে ঘিরে চলছিল যে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্ক, এই বিদায় যেন তারই এক অনিবার্য পরিণতি। প্রশ্ন উঠেছিল বারবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছেন, তাঁর পদে থাকার বৈধতা কতটুকু, আর সংকটকালে তাঁর প্রকৃত ভূমিকাই বা ছিল কী। সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়েই এবার বিদায় নিচ্ছেন সাহাবুদ্দিন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তা গ্রহণ করা হয়েছে। পদত্যাগপত্রে তাঁর অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্তের কথা উল্লেখ করা হয়, যার কারণে তিনি মাঝেমধ্যে সাময়িকভাবে অচেতন হয়ে পড়েন বলে জানানো হয়। শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালন সম্ভব হচ্ছে না এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন বলেও পত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে চিঠিতে কোনো রাজনৈতিক চাপ বা সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথা বলা হয়নি।

পদত্যাগ নিয়ে জানতে চাইলে সাহাবুদ্দিন গণমাধ্যমকে সংক্ষেপে জানান, বিষয়টি এখন সবার জানা, তাই নতুন করে বলার কিছু নেই এবং তিনি অসুস্থ বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বঙ্গভবন সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, তিনি ইতিমধ্যে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলতি মাসের মধ্যে বঙ্গভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন এবং কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত মালামাল গোছানোও শুরু করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, রোববার দুপুরের দিকে তিনি বঙ্গভবন ত্যাগ করে গুলশানের নিজস্ব বাসভবনে উঠতে পারেন। পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন; তাঁর স্থলাভিষিক্ত ডেপুটি স্পিকার সাংসদীয় দায়িত্ব সামলাবেন।

মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে শপথ নেন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১৬ মাসের মাথায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। ওই দিনই জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি জানান, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এরপর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার আদেশ দেন তিনি এবং ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে শপথ পড়ান। সবশেষ চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর তাঁর কাছেই শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এভাবে প্রায় তিন বছর তিন মাসের মেয়াদে তিনি তিনটি ভিন্ন চরিত্রের সরকার-নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার, অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সবশেষ নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে তিন ধরনের সরকার পরিবর্তনের সাক্ষী হওয়া এবং প্রতিটির শপথ পরিচালনার নজির বিরল। সংসদ বিষয়ক গবেষকদের একাংশের মূল্যায়ন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সীমিত হলেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় তিনি একটি ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছিলেন।
তবে তাঁর মেয়াদ শুরু থেকেই বিতর্কমুক্ত ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হওয়ায় গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বসহ বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে পদ থেকে সরানোর দাবি ওঠে। এই দাবি সত্ত্বেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন। এরপর শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে অস্পষ্টতা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় রাষ্ট্রপতি নিজেই পরে জানান, শেখ হাসিনার স্বাক্ষরিত কোনো পদত্যাগপত্র বা তার প্রমাণ তাঁর কাছে পৌঁছায়নি, যদিও ৫ আগস্টের ভাষণে তিনি পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা বলেছিলেন। সংবিধানের ৫৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার বিধান থাকায় এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আইনি ও রাজনৈতিক মহলে বিস্তর আলোচনার জন্ম দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাঁর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রায় সাত মাস সাক্ষাৎ না হওয়া, রাষ্ট্রপতির প্রেস বিভাগ প্রত্যাহার এবং বিদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তাঁর প্রতিকৃতি অপসারণের মতো ঘটনা তাঁর সঙ্গে সরকারের দূরত্বের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনি নিজেই বলেছিলেন, নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগ করার ইচ্ছা তাঁর রয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন বলেও মন্তব্য করেছেন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, নয়তো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। নির্বাচনের পর তারেক রহমানের সরকারকে শপথ পড়ানোর পরও তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে রেখে দেওয়া নিয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি শরিক দল আপত্তি তোলে, এবং সংসদে তাঁর ভাষণ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।

পদত্যাগের ঠিক আগে জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি টেলিফোনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার সম্ভাব্য পরিকল্পনার খবরের মধ্যেই এই তথ্য প্রকাশ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে পদ ছাড়তে পারেন। পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন যা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে হবে। সংসদে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীরই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো নাম চূড়ান্ত হয়নি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের খবর জানাতে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজে একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন দিয়েছেন তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী জনগণের সরকারের প্রতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থন ছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল প্রশ্ন ছিল একটাই পুরো মেয়াদে তিনি সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা কতটা বজায় রাখতে পেরেছিলেন।

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী প্রকৃতির, নির্বাহী ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও সংসদ ভাঙা, সরকার পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা এবং অধ্যাদেশে সইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করে সাহাবুদ্দিন এক অস্থির সময়ে রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে ছিলেন। তবে একই সঙ্গে তাঁর একাধিক বক্তব্য ও অবস্থান, বিশেষত শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র প্রসঙ্গ, বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন।

সাধারণ মানুষের কাছে সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্ব মূলত মনে থাকবে একটি ক্রান্তিকালের প্রতীক হিসেবে, যিনি ক্ষমতাচ্যুত সরকার, বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা ও নির্বাচিত নতুন সরকার তিন ধরনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনে টিকে ছিলেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগে তাঁর এই বিদায় শুধু একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তিও বটে। আগামী দিনে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয় এবং তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মধ্য দিয়ে হয় নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় সেদিকেই এখন নজর সবার।