কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগ
দুই এসিএফের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও বনভূমি বাণিজ্যের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১০০ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের রামু ও উখিয়া রেঞ্জে কর্মরত দুই সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ)-এর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অবৈধ বসতি বাণিজ্য, পাহাড় কাটার অনুমতি বিক্রি এবং যানবাহন আটক করে টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ৪১তম বিসিএসের কর্মকর্তা মো. অভিউজ্জামান ও মো. শাহিনুর ইসলামকে ঘিরে এসব অভিযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে বনাঞ্চলঘেঁষা জনপদ।
রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ গত ২৫ মার্চ গভীর রাতে রামুর খুনিয়াপালং ইউনিয়নের থোয়াইংগাকাটা বাজারে চায়ের দোকানে বসে থাকা দুই প্রতিবন্ধী যুবক বাবুল ও রমজান আলীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাজারকুল রেঞ্জের এসিএফ মো. অভিউজ্জামান ও আপাররেজু বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদের নেতৃত্বে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ভোরের আগেই জনপ্রতি আট হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রামু ও উখিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলজুড়ে একই ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলছে।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জে যোগদানের পরপরই বনের জমিতে বসবাসকারী প্রায় ৫০টি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে কাঁচা ঘরের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং সেমিপাকা ঘরের জন্য এক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
প্রশিক্ষণ শেষে ‘বেপরোয়া’ আচরণের অভিযোগ গত বছরের ১৮ জুন ছয় মাসের প্রশিক্ষণে যান দুই কর্মকর্তা। ১৮ ডিসেম্বর ফিরে আসার পর তাদের আচরণ আরও কঠোর ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলে দাবি সহকর্মীদের একাংশের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যাচমেট কর্মকর্তা বলেন, চাকরির প্রথম বছরেই তারা বিভিন্ন উপায়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গর্ব করেন।
পাহাড় কাটার অনুমতি বিক্রি ও বনভূমি ভাড়া রামুর আপাররেজু বনবিট এলাকায় স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার অনুমতি দুই লাখ টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বনবিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া ‘ভ্যালিজার’ নামে ব্যক্তিপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হেক্টর পর্যন্ত বনভূমি মাসিক ভাড়ায় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করা হয় বলেও দাবি এলাকাবাসীর।
ফার্নিচার ব্যবসায়ী ও কাঠ পাচার সিন্ডিকেট রামু, ঈদগাঁও ও সদর এলাকার ফার্নিচার দোকান মালিকদের সঙ্গে মাসিক চুক্তির অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে কাঠ পরিবহন ও ব্যবসায় বাধা দেওয়া হয় না বলে দাবি।
টমটম ও ডাম্পার আটক করে টাকা আদায়ের অভিযোগ ১১ মার্চ খুনিয়াপালংয়ের এক টমটম চালককে রাজারকুল রেঞ্জ অফিসে নিয়ে গিয়ে ৯ দিন আটক রাখার পর ১৬ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে আরেকটি টমটম এক সপ্তাহ আটকে রেখে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
উখিয়া রেঞ্জে গত ১১ এপ্রিল রাতে মাটিভর্তি একটি ডাম্পার আটক করে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এসিএফ শাহিনুর ইসলামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া যৌথ অভিযানে জব্দ করা আরেকটি ডাম্পার তিন ধাপে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বনভূমিতে ভবন নির্মাণে ‘নোটিশ বাণিজ্য’ কুতুপালং বালুখালী এলাকায় বনবিভাগের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনায় প্রথমে অভিযান চালিয়ে পরে নোটিশ বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভবনটি এখনো নির্মাণাধীন থাকায় বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বনভূমি দখলের উৎসব উখিয়া ও রামুর বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকায় পাহাড় কাটা ও বসতি নির্মাণ বেড়েছে। ছনখোলা, শেয়ালিয়া পাড়া, বালুখালী, কুতুপালং, জুমরছড়া, পাঞ্জেখানা, পাইনবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন বসতি গড়ে উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকা দিলে বাধা নেই—গরিবদের ওপরই অভিযান চালানো হয়।
অভিযোগ অস্বীকার কর্মকর্তাদের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুই কর্মকর্তা। মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, জনবল সংকটের কারণে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তার অধীনে মাত্র ২২ জন কর্মী রয়েছে এবং বিশাল বনাঞ্চল পাহারা দিতে হচ্ছে সীমিত জনবল দিয়ে।
মো. অভিউজ্জামান বলেন, আটক টমটম সাংবাদিক ও সেনা কর্মকর্তার জিম্মায় ছাড়া হয়েছে, টাকার বিনিময়ে নয়। অবৈধ বসতি উচ্ছেদে তিনি নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন বলেও দাবি করেন।
তদন্ত কমিটি গঠন দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, অভিউজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। শাহিনুর ইসলামের বিষয়েও পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
কুতুপালং এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের ঘটনায় মামলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কীভাবে নির্মাণ এগিয়েছে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

















