ঢাকা ০১:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬

ডিমলায় আনসার ক্যাম্প লুটপাট ও ভাংচুর, অপরাধ ঢাকতে মানববন্ধন

ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১১৩ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নীলফামারীর ডিমলা – জলঢাকা মধ্যবর্তী স্থানে ব্রিটিশ সরকার আমলে স্থাপিত বুড়ি তিস্তা নদীর উপর নির্মিত কালীগঞ্জ ব্রিজটি সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ আনসার ক্যাম্পে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়,২০২১ ইং সালের মে মাসে বুড়িতিস্তা জলাশয় খনন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় ।
বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের কম্যান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের নামকরণ করে এর ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয় ১ হাজার ৪ শত ৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্প সংক্রান্ত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। বুড়িতিস্তা নদী খনন কজে প্রথম পর্যায়ে ৫ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে খননের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্প এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে এসএ ও বিএস রেকর্ডভুক্ত ১ হাজার ২১৭ একর জমি রয়েছে, যার মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতে খননসহ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।
বুড়িতিস্তা নদী পুনঃখনন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই ঘটনায় আনসার সদস্যদের অস্ত্রের গুলি লুট, সরকারি মালামাল ধ্বংস
এবং আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখনো উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র ও মালামাল। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারও করা হয়নি এখনো কাউকে।
ভূমিদস্যুদের এই তাণ্ডব রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তাকে ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অথচ দুই দফায় সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালিয়েছে ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীচক্র।
দুই দিনের সহিংসতার অপরাধীরা প্রকাশ্যেই মিছিল ও মানববন্ধন করে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।
বুড়িতিস্তা ব্যারেজ সংলগ্ন ও উজানের কুঠিরডাঙ্গা এলাকায় ৭ শতাধিক ভূমিদস্যু প্রকৃতির লোকজন দীর্ঘদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ডীয় জমি জবরদখল করে রেখেছে। খনন কাজ শুরু করতে গেলেই দখলদারদের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষ বাধে। একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা ঘটলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভূমিদস্যু নেতা হিসেবে পরিচিত আব্দুল আলীম ও তার সহযোগীরা মাইকিং করে শত শত লোক জড়ো করে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায়। ক্যাম্পে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটতরাজ করা হয়। এ সময় আনসার সদস্যদের ১০ রাউন্ড গুলি, প্রায় ৫০ জন আনসার সদস্যের ব্যক্তিগত মালামাল, আসবাবপত্র, রেশন ও নগদ অর্থ লুট করা হয়। পাশাপাশি খনন কাজে ব্যবহৃত ৭টি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করে অকেজো করে দেওয়া হয়।
পরদিন ১ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় আবারও হামলা চালিয়ে আনসার সদস্যদের অস্ত্রের মুখে ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য করা হয়। অবশিষ্ট মালামাল লুট এবং সব স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।
দ্বিতীয় দিনের ঘটনার পর বিকেল ৫ টার দিকে বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্যের সহায়তায় জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ জবরদখল হওয়া আনসার ক্যাম্প পুনরুদ্ধার করে। তবে তখন ক্যাম্পে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। একটি পাকা ভবন উদ্ধার করা হলেও সেটির দরজা–জানালাও খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। লুট হওয়া গুলি ও মালামাল এখনো উদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন।
কিন্তু অভিযোগে রয়েছে, এই সহিংসতায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় জলঢাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জুলফিকার রহমান বাদী হয়ে ৩ জানুয়ারি জলঢাকা থানায় ৪১ জন নামীয়সহ অজ্ঞাতনামা প্রায় ৭ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান বলেন, বুড়িতিস্তা জলাধার খনন ঠেকাতে একটি অসাধু গোষ্ঠী মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধুমাত্র অধিগ্রহণকৃত ১ হাজার ২১৭ একরের মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতেই কাজ করবে। ব্যক্তিগত তিন ফসলি জমি দখলের অপপ্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি আরও বলেন, কেপিআইভুক্ত বুড়িতিস্তা ব্যারেজ ও আনসার ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে হামলা ও লুটপাট সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি। আগের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা প্রত্যাশা করছি।
এই ঘটনায় কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং সংগঠিত ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা নিয়ে সারাদেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ডিমলায় আনসার ক্যাম্প লুটপাট ও ভাংচুর, অপরাধ ঢাকতে মানববন্ধন

আপডেট সময় :

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নীলফামারীর ডিমলা – জলঢাকা মধ্যবর্তী স্থানে ব্রিটিশ সরকার আমলে স্থাপিত বুড়ি তিস্তা নদীর উপর নির্মিত কালীগঞ্জ ব্রিজটি সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ আনসার ক্যাম্পে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়,২০২১ ইং সালের মে মাসে বুড়িতিস্তা জলাশয় খনন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় ।
বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের কম্যান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের নামকরণ করে এর ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয় ১ হাজার ৪ শত ৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্প সংক্রান্ত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। বুড়িতিস্তা নদী খনন কজে প্রথম পর্যায়ে ৫ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে খননের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্প এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে এসএ ও বিএস রেকর্ডভুক্ত ১ হাজার ২১৭ একর জমি রয়েছে, যার মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতে খননসহ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।
বুড়িতিস্তা নদী পুনঃখনন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এই ঘটনায় আনসার সদস্যদের অস্ত্রের গুলি লুট, সরকারি মালামাল ধ্বংস
এবং আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখনো উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া অস্ত্র ও মালামাল। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারও করা হয়নি এখনো কাউকে।
ভূমিদস্যুদের এই তাণ্ডব রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তাকে ভয়াবহ প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। অথচ দুই দফায় সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালিয়েছে ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীচক্র।
দুই দিনের সহিংসতার অপরাধীরা প্রকাশ্যেই মিছিল ও মানববন্ধন করে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।
বুড়িতিস্তা ব্যারেজ সংলগ্ন ও উজানের কুঠিরডাঙ্গা এলাকায় ৭ শতাধিক ভূমিদস্যু প্রকৃতির লোকজন দীর্ঘদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ডীয় জমি জবরদখল করে রেখেছে। খনন কাজ শুরু করতে গেলেই দখলদারদের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষ বাধে। একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনা ঘটলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভূমিদস্যু নেতা হিসেবে পরিচিত আব্দুল আলীম ও তার সহযোগীরা মাইকিং করে শত শত লোক জড়ো করে আনসার ক্যাম্পে হামলা চালায়। ক্যাম্পে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটতরাজ করা হয়। এ সময় আনসার সদস্যদের ১০ রাউন্ড গুলি, প্রায় ৫০ জন আনসার সদস্যের ব্যক্তিগত মালামাল, আসবাবপত্র, রেশন ও নগদ অর্থ লুট করা হয়। পাশাপাশি খনন কাজে ব্যবহৃত ৭টি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করে অকেজো করে দেওয়া হয়।
পরদিন ১ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় আবারও হামলা চালিয়ে আনসার সদস্যদের অস্ত্রের মুখে ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য করা হয়। অবশিষ্ট মালামাল লুট এবং সব স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।
দ্বিতীয় দিনের ঘটনার পর বিকেল ৫ টার দিকে বিপুল সংখ্যক সেনা সদস্যের সহায়তায় জলঢাকা ও ডিমলা থানার পুলিশ জবরদখল হওয়া আনসার ক্যাম্প পুনরুদ্ধার করে। তবে তখন ক্যাম্পে কার্যত কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। একটি পাকা ভবন উদ্ধার করা হলেও সেটির দরজা–জানালাও খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। লুট হওয়া গুলি ও মালামাল এখনো উদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন।
কিন্তু অভিযোগে রয়েছে, এই সহিংসতায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় জলঢাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জুলফিকার রহমান বাদী হয়ে ৩ জানুয়ারি জলঢাকা থানায় ৪১ জন নামীয়সহ অজ্ঞাতনামা প্রায় ৭ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন।
নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুর রহমান বলেন, বুড়িতিস্তা জলাধার খনন ঠেকাতে একটি অসাধু গোষ্ঠী মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধুমাত্র অধিগ্রহণকৃত ১ হাজার ২১৭ একরের মধ্যে ৬৬৭ একর জমিতেই কাজ করবে। ব্যক্তিগত তিন ফসলি জমি দখলের অপপ্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি আরও বলেন, কেপিআইভুক্ত বুড়িতিস্তা ব্যারেজ ও আনসার ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে হামলা ও লুটপাট সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি। আগের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়েছে। আমরা দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা প্রত্যাশা করছি।
এই ঘটনায় কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং সংগঠিত ভূমিদস্যু চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা নিয়ে সারাদেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।