ঢাকা ০৮:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬

নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিলাম কেলেঙ্কারি

সাড়ে ৫ কোটি টাকার মালামাল ১৯ লাখে বিক্রি

গাজী রুবেল, নোয়াখালী ব্যুরোপ্রধান
  • আপডেট সময় : ১০৬ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় গোপনীয়ভাবে নিলামে বিক্রির অভিযোগে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা তাকে পলাতক দাবি করেছেন।
গত সোমবার (৬ জানুয়ারী) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম কার্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। দিনভর তার অপেক্ষায় নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন সাধারণ ঠিকাদাররা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অফিসের বাইরে অবস্থান নেন।
এর আগে রোববার বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলীকে তার নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের আওতায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি গুদামে সংরক্ষিত প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে নিলামে তোলা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নামমাত্র একটি অখ্যাত পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অধিকাংশ ঠিকাদারকে না জানিয়ে কথিত দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এতে অংশগ্রহণের সুযোগ না পেয়ে বঞ্চিত হন অধিকাংশ ঠিকাদার। এই সুযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেসার্স শাহনাজ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার মালামাল মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
সূত্র জানায়, নিলামে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের ৪৮ হাজার পাইপ ও তিন ইঞ্চি ব্যাসের ২৮ হাজার পাইপ মোট প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার ফুট বিভিন্ন মাপের পাইপ বিক্রি করা হয়। নিলাম শেষে রাতারাতি এসব সামগ্রী গুদাম থেকে সরিয়ে চরবাটা ও চরআমান উল্লাহ এলাকায় সংরক্ষণ করা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে গেলে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ঠিকাদাররা সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে তার কার্যালয়ের চেয়ারে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও স্লোগান দেন। পরে নিলাম বাতিলের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৯০ কোটি টাকা ফেরত চলে গেছে। এতে নোয়াখালীর সুবিধাবঞ্চিত মানুষ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, যারা মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে পারেননি তাদের কার্যাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে কমিশন দিয়ে কাজ পাওয়া ঠিকাদাররা নিম্নমানের ও দায়সারা কাজ করছেন, ফলে প্রকল্পগুলোর গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দুলাল বলেন, “আমার ঠিকাদারি জীবনে এভাবে প্রকাশ্য লুটপাট আগে কখনও দেখিনি। ফ্যাসিস্ট পতনের পর ভেবেছিলাম অনিয়ম বন্ধ হবে, কিন্তু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি পলাতক নই। অফিসের কাজেই সাইটে আছি। নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। আমি কোনো নিলাম দেইনি। তবে ঠিকাদারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিলাম কার্যাদেশ বাতিলের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।”

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিলাম কেলেঙ্কারি

সাড়ে ৫ কোটি টাকার মালামাল ১৯ লাখে বিক্রি

আপডেট সময় :

নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় গোপনীয়ভাবে নিলামে বিক্রির অভিযোগে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা তাকে পলাতক দাবি করেছেন।
গত সোমবার (৬ জানুয়ারী) সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম কার্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। দিনভর তার অপেক্ষায় নোয়াখালী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন সাধারণ ঠিকাদাররা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অফিসের বাইরে অবস্থান নেন।
এর আগে রোববার বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলীকে তার নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, ডানিডা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের আওতায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি গুদামে সংরক্ষিত প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে নিলামে তোলা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নামমাত্র একটি অখ্যাত পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে অধিকাংশ ঠিকাদারকে না জানিয়ে কথিত দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এতে অংশগ্রহণের সুযোগ না পেয়ে বঞ্চিত হন অধিকাংশ ঠিকাদার। এই সুযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেসার্স শাহনাজ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার মালামাল মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
সূত্র জানায়, নিলামে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের ৪৮ হাজার পাইপ ও তিন ইঞ্চি ব্যাসের ২৮ হাজার পাইপ মোট প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার ফুট বিভিন্ন মাপের পাইপ বিক্রি করা হয়। নিলাম শেষে রাতারাতি এসব সামগ্রী গুদাম থেকে সরিয়ে চরবাটা ও চরআমান উল্লাহ এলাকায় সংরক্ষণ করা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে গেলে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ঠিকাদাররা সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে তার কার্যালয়ের চেয়ারে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও স্লোগান দেন। পরে নিলাম বাতিলের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৯০ কোটি টাকা ফেরত চলে গেছে। এতে নোয়াখালীর সুবিধাবঞ্চিত মানুষ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, যারা মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে পারেননি তাদের কার্যাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে। অন্যদিকে কমিশন দিয়ে কাজ পাওয়া ঠিকাদাররা নিম্নমানের ও দায়সারা কাজ করছেন, ফলে প্রকল্পগুলোর গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মেসার্স এসএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দুলাল বলেন, “আমার ঠিকাদারি জীবনে এভাবে প্রকাশ্য লুটপাট আগে কখনও দেখিনি। ফ্যাসিস্ট পতনের পর ভেবেছিলাম অনিয়ম বন্ধ হবে, কিন্তু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি পলাতক নই। অফিসের কাজেই সাইটে আছি। নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়েছে। আমি কোনো নিলাম দেইনি। তবে ঠিকাদারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিলাম কার্যাদেশ বাতিলের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।”