অস্থিরতা টেনে ধরছে তাদের
- আপডেট সময় : ২৬ বার পড়া হয়েছে
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই বাড়ছে উত্তেজনা ও অস্থিরতা। নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং প্রচারণায় বাধা দেওয়ার ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পর্যবেক্ষক মহলেও। গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, একাধিক রাজনৈতিক দল অভিযোগ তুলেছে যে তাদের নির্বাচনী সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে, পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে এবং মাইকিং বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্য বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কয়েকটি জেলায় প্রচারণা কার্যক্রমে বাধার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো এলাকায় এক দলের কর্মীরা অন্য দলের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও সভা করতে দেওয়া হয়নি, আবার কোথাও পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি বড় রাজনৈতিক দলের এক শীর্ষ নেতা অভিযোগ করে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছাতে চাই। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে আমাদের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এতে নির্বাচনের সমান সুযোগ প্রশ্নের মুখে পড়ছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দল একই ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করে বলছে, তাদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। ফলে অভিযোগের পাল্লা ভারী হচ্ছে উভয় পক্ষেই।
নেতাদের বক্তব্যে ভাষার তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কথার লড়াই এখন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। টেলিভিশন টকশো, সংবাদ সম্মেলন এবং জনসভায় একে অপরের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও উসকানিমূলক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বাকযুদ্ধ যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে তা সহজেই মাঠের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে উত্তেজনাকর বক্তব্য অনেক সময় সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ কাউকে গণতন্ত্রবিরোধী, কেউ আবার অবৈধ শক্তির দোসর আখ্যা দিচ্ছেন। এসব বক্তব্য রাজনৈতিক সৌহার্দ্য নষ্ট করছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। রাজনীতিবিদদের এই বাগযুদ্ধ সাধারণ মানুষের মাঝেও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। ভোটাররা জানতে চাইছেন নির্বাচন কি আদৌ শান্তিপূর্ণ হবে? রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের সমস্যা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবে, নাকি কেবলই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগেই সময় ব্যয় হবে?
নির্বাচনের পরিবেশ ঘোলাটে হয়ে উঠছে মূলত পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে। নির্বাচন কমিশনের কাছেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল লিখিত অভিযোগ জমা দিচ্ছে। কোথাও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, তারা প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নির্বাচন ঘিরে গত এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত কয়েক ডজন ছোট-বড় উত্তেজনাকর ঘটনার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এর মধ্যে সভা ভণ্ডুল, পোস্টার ছেঁড়া, মাইকিং বন্ধ, সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকটি ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনী সময় যত ঘনিয়ে আসে, ততই সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা বেশি থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান অস্থিরতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, মাঠের দখল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংযম না দেখায় এবং নির্বাচন কমিশন যদি কঠোরভাবে আচরণবিধি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তারা বলছেন, নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় কথার লড়াই যে কোনো সময় মাঠের সংঘাতে রূপ নিতে পারে এমন শঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। সাধারণ ভোটাররা চান একটি নিরাপদ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সহিংসতা নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতা ও সংযমই পারে এই অস্থির পরিবেশকে স্থিতিশীল করতে।






















