টেকসই গণতন্ত্রের পথে দেশ
- আপডেট সময় : ২৭ বার পড়া হয়েছে
স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে সরকার তথা নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের মতে, দ্রুতই স্থানীয় সরকার ওসিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়ার পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছে ক্ষমতাসীনরা। নাগরিক সেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার দ্রুত নির্বাচনের আলোচনা এবং প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্বাচন শুরু করার। একই সঙ্গে সরকার একসঙ্গে না করে এ নির্বাচন ধাপে ধাপে করার চিন্তাও করছে।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ও বামদলগুলোর পক্ষ থেকে সিটি কপোরেশন ও জেলা পরিষদ এবং উপজেলা নির্বাচনে কোনো কার্যক্রম নেই। রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তাদেও পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইছে সংসদ অধিবেশনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের ভোটে দলীয় প্রতীক ব্যবহৃত হবে কি না, সে ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত আসুক। তা হলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হবে। আগামী এপ্রিল-মে মাস থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন শুরু করার চিন্তাভাবনা রয়েছে ইসির। এরই অংশ হিসেবে জাতীয় নাগরিক পরিষদ এনসিপি ও জামায়াতে ইসলাম দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা পরিষদ এবং উপজেলা চেয়ারম্যান মেম্বার নির্বাচন শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এনসিপি দালের মনোনীত প্রার্থীও খসড়া তালিকা প্রনয়ন করেছে। পাশাপাশি প্রার্থী ঘোষনাও দিয়েছে দলের পক্ষ থেকে। জামায়াতে ইসলামী তালিকা প্রস্তুত প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে।
অপরদিকে গত ১৭ মার্চ সরকার গঠনের পর বিএনপি বর্তমানে এমপি পদে মনোনয়ন বঞ্চিত মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করার দিকে এগোচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ১১ সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের পর বিএনপিকে বর্তমানে বিভিন্ন নির্বাচনী ও উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত স্থানীয় সরকার কাঠামো দ্রুত গড়ে তোলা দরকার। সে কারণে সরকার চাইছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাঠপ্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলতে। পাশাপাশি চলছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি।
অপরদিকে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত এবং অবস্থান শক্ত করতে ক্ষমতা নেওয়ার এক মাসের কম সময়ের মধ্যে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের ১১টিতে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করেছে বিএনপি সরকার। অন্য একটিতে বা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বিএনপির নেতা শাহাদাত হোসেন আদালতের রায় অনুযায়ী মেয়রের শপথ নিয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন দলটি সরকার গঠনের আগে থেকেই। শুধু সিটি করপোরেশন নয়, ৬৪ জেলার মধ্যে ৪২ জেলাতেও নিয়োগ করা হয়েছে দলীয় প্রশাসক। বাকিগুলোতেও ঈদের পর প্রশাসক দেওয়া হতে পারে। পৌরসভাতেও সরকারের নীতিনির্ধারকরা একই পন্থা অবলম্বন করার কথা ভাবছেন।
এছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেরও কম সময়ে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দলীয় প্রশাসক নিয়োগ করার কারণে এসব স্থানে নির্বাচন আপাতত আর হচ্ছে নাÑ এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে সচেতন মহলে। তবে এসব নিয়োগে দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বকে প্রাধান্য দেওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন সেই ধারাবাহিকতায় উপজেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের আলোচনা শুরু হওয়ার পর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সুসংগঠিত নীতিগত প্রবণতার অংশ।
অন্যদিকে গত ৩ মার্চ একই ধরনের কথা বলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ‘সংসদে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীকের বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচন হবে না। আইন আকারে পাস হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে আইন সংশোধন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছিল, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীকের বিধান বাতিল করে। কোন কোন অধ্যাদেশ গৃহীত হবে, তা সংসদই নির্ধারণ করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয় প্রতীকে হবে, এর জন্য আমরা সংসদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি। সংসদ সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেগুলো করতে হবে।’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সারা বছর নির্বাচন কমিশন ব্যস্ত থাকবে বলেও জানান তিনি।
অপরদিকে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পথে হাঁটতে চাইছে বিএনপি সরকার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সব জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তাতে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে কারা দায়িত্ব পালন করছেন, তার তালিকা তৈরি করে পাঠাতে বলা হয়েছে। কতটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন, কতটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন, কতটি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন সেসব তথ্যও পাঠাতে বলা হয়েছে ওই চিঠিতে। এই তথ্য আসার পরেই পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে সরকার।
প্রসঙ্গত, মেয়াদ শেষে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর এবং পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন। পরে জনপ্রতিনিধিরা আত্মগোপনে থাকায় কিংবা পরিষদে না যাওয়ায় নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছেÑ এমন কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে।
ইতিহাস ঘেটে জানা গেছে, দেশে ইউনিয়ন পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচনের প্রথম ধাপে ভোট হয়েছিল ২০২১ সালের ২১ জুন। পঞ্চম ধাপে নির্বাচন হয় ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি। সে হিসেবে প্রথম ধাপে নির্বাচিত ইউপি প্রতিনিধিদের বিদায়ের ক্ষণগণনা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে নির্বাচন হয় ২৫টি পৌরসভায়। পরে কয়েক ধাপে নির্বাচন হয় অন্যগুলোতে। সে হিসাবে পৌরসভার পাঁচ বছর মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। আর ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের মধ্যে ৫৭টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগেরই মেয়াদ শেষ হয়েছে বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্বে নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসকদের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, সে বিষয়টি সংসদ থেকে চূড়ান্ত হতে হবে।


















