ঢাকা ০৫:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো ফসলী জমি, কৃষকের মূখে বিষাদের ছায়া

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ৩৮ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নেত্রকোনায় কৃষকের মূখে হাসির পরিবর্তে বিষাদের ছায়া। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর ও সমতলের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনায় ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ধান পানির নীচে তলিয়ে আছে। এদিকে জেলার কংস নদের পানি গত শনিবার সন্ধ্যে পর্যন্ত জারিয়ায় বিপৎসীমার ১ দশমিক ০০ সেন্টিমিটার এবং উদ্বাখালী নদীর পানি বিপদসীমার .৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সোমেশ্বরী, ধনু, মগড়া, মহাদেও, মগড়াসহ সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির এই তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, গত ক’দিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দার পাশাপাশি, পূর্বধলা, আটপাড়া, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা সদরের উঠতি রোরো ফসলী জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। রোরো ফসল কেটে যেখানে কৃষকের মূখে হাসি থাকার কথা সেখানে বিষাদে পরিনত হয়েছে। বোরো জমিতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, জেলার খালিয়াজুরী, মদন, আটপাড়া, কেন্দুয়া, কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা সদর, বারহাট্টাসহ বিভিন্ন উপজেলার ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। শনিবার পর্যন্ত ভানি বর্ষন কম হওয়ায় পানি আর বাড়েনি। কৃষকেরা এখন বেশ কিছু খেতের ধান কেটে ফেলছেন। এখনো ৮ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত আছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
নেত্রকোনা কৃষি বিভাগ, পাউবো, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার হাওরাঞ্চলসহ নিচু এলাকায় পানি জমে ক্ষেতের পাকা বোরো ধান ডুবে যায়। নেত্রকোনায় এ বছর ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর খেতের ধান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু খালিয়াজুরী উপজেলায় ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির পাকা ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণ খেতের ধান তলিয়ে গেছে। হাওরে ফসল রক্ষার জন্য এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। অবশ্য বাঁধের কারণে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে প্রবেশ করেনি।
নেত্রকোনার পূর্বধলার যোগিরগুহা গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম ফকির বলেন, আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি। আমাদের গ্রামের কৃষকরা দুই বন্ধে (ফসলের মাঠ) প্রায় ৫০০০ কাট জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। টানে ধানি জমি কশ থাকায় বিলের জমির উপরই বেশি নির্ভর কমি। এখন সব তলিয়ে গেছে। কৃষি ঋণ কিভাবে দিব, আর সন্তানের লেখা পড়ার খরচই কিভাবে চালাব বুঝতে পারছি না। একই গ্রামের
পূূর্বধলা উপজেলার বৈরাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান তালুকদার মোশারফ বলেন, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বোরো ফসলী জমিতে পানি লেগে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে যোগিরগুহা গ্রামের কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে বেশি। সরকারি বরাদ্ধ পেলে তালিকা করে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে।
আটপাড়ার খিলা গ্রামের কৃষক মঞ্জুরুল হক বলেন, আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। আর কয়েকদিনের মধ্যে ধান কাইটা ঘরে তুলতাম। এখন বৃষ্টির পানি লাইগা আমাদের সব ডুবাইয়া ফেলাইছে। কি যে করব ভেবে পাচ্ছি না। সারা বছরের সংসার খারচ। তার উপর ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া কিভাবে চালাব বুঝে উঠতে পারছি না।
খালিয়াজুরী উপজেলার বোয়ালী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, বৃষ্টির পানি জমে আমদের জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ স্মুইসগেট অকেজো। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে না পরার কারণে ফসল ডুবে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটা হয়নি। সারা বছর কি করে চলব বুঝতে পারছি না।
মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্ধেক জমির ধান পানির নিচে। যে জমিতে ধান এখনো ডুবছে না, সে ধান কাটনের জন্য ২ হাজার টাকা রোজ দিয়েও লোক পাওয়া যাইতাছে না। খুবই বিপদের মধ্যে আছি। চোখের সামনে এভাবে সর্বনাশ হচ্ছে।’
মোহনগঞ্জের সোয়াইর গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ডিঙাপোতা হাওরে ২০ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। এরমধ্যে কিছু জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান পানির নিচে তলাইয়া গেছে। কোন খড়ও শুকাইতে পারছি না।’
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা। ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। পানি বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবার বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতার কারণে এমন সমস্যা হয়েছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো ফসলী জমি, কৃষকের মূখে বিষাদের ছায়া

আপডেট সময় :

নেত্রকোনায় কৃষকের মূখে হাসির পরিবর্তে বিষাদের ছায়া। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর ও সমতলের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনায় ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ধান পানির নীচে তলিয়ে আছে। এদিকে জেলার কংস নদের পানি গত শনিবার সন্ধ্যে পর্যন্ত জারিয়ায় বিপৎসীমার ১ দশমিক ০০ সেন্টিমিটার এবং উদ্বাখালী নদীর পানি বিপদসীমার .৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সোমেশ্বরী, ধনু, মগড়া, মহাদেও, মগড়াসহ সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির এই তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, গত ক’দিনের ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দার পাশাপাশি, পূর্বধলা, আটপাড়া, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা সদরের উঠতি রোরো ফসলী জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। রোরো ফসল কেটে যেখানে কৃষকের মূখে হাসি থাকার কথা সেখানে বিষাদে পরিনত হয়েছে। বোরো জমিতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, জেলার খালিয়াজুরী, মদন, আটপাড়া, কেন্দুয়া, কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা সদর, বারহাট্টাসহ বিভিন্ন উপজেলার ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে ডুবে গেছে। শনিবার পর্যন্ত ভানি বর্ষন কম হওয়ায় পানি আর বাড়েনি। কৃষকেরা এখন বেশ কিছু খেতের ধান কেটে ফেলছেন। এখনো ৮ হাজার ৫৩৪ হেক্টর জমির ধান নিমজ্জিত আছে। তবে স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
নেত্রকোনা কৃষি বিভাগ, পাউবো, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে জেলার হাওরাঞ্চলসহ নিচু এলাকায় পানি জমে ক্ষেতের পাকা বোরো ধান ডুবে যায়। নেত্রকোনায় এ বছর ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে ৯ হাজার ৬২৫ হেক্টর খেতের ধান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু খালিয়াজুরী উপজেলায় ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির পাকা ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সরকারি হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণ খেতের ধান তলিয়ে গেছে। হাওরে ফসল রক্ষার জন্য এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। অবশ্য বাঁধের কারণে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরে প্রবেশ করেনি।
নেত্রকোনার পূর্বধলার যোগিরগুহা গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম ফকির বলেন, আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি। আমাদের গ্রামের কৃষকরা দুই বন্ধে (ফসলের মাঠ) প্রায় ৫০০০ কাট জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। টানে ধানি জমি কশ থাকায় বিলের জমির উপরই বেশি নির্ভর কমি। এখন সব তলিয়ে গেছে। কৃষি ঋণ কিভাবে দিব, আর সন্তানের লেখা পড়ার খরচই কিভাবে চালাব বুঝতে পারছি না। একই গ্রামের
পূূর্বধলা উপজেলার বৈরাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান তালুকদার মোশারফ বলেন, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বোরো ফসলী জমিতে পানি লেগে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে যোগিরগুহা গ্রামের কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে বেশি। সরকারি বরাদ্ধ পেলে তালিকা করে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে।
আটপাড়ার খিলা গ্রামের কৃষক মঞ্জুরুল হক বলেন, আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। আর কয়েকদিনের মধ্যে ধান কাইটা ঘরে তুলতাম। এখন বৃষ্টির পানি লাইগা আমাদের সব ডুবাইয়া ফেলাইছে। কি যে করব ভেবে পাচ্ছি না। সারা বছরের সংসার খারচ। তার উপর ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া কিভাবে চালাব বুঝে উঠতে পারছি না।
খালিয়াজুরী উপজেলার বোয়ালী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, বৃষ্টির পানি জমে আমদের জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ স্মুইসগেট অকেজো। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি নামতে না পরার কারণে ফসল ডুবে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাটা হয়নি। সারা বছর কি করে চলব বুঝতে পারছি না।
মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্ধেক জমির ধান পানির নিচে। যে জমিতে ধান এখনো ডুবছে না, সে ধান কাটনের জন্য ২ হাজার টাকা রোজ দিয়েও লোক পাওয়া যাইতাছে না। খুবই বিপদের মধ্যে আছি। চোখের সামনে এভাবে সর্বনাশ হচ্ছে।’
মোহনগঞ্জের সোয়াইর গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ডিঙাপোতা হাওরে ২০ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলাম। এরমধ্যে কিছু জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান পানির নিচে তলাইয়া গেছে। কোন খড়ও শুকাইতে পারছি না।’
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা। ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। পানি বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাওরে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। বাঁধ যাতে না ভাঙে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবার বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতার কারণে এমন সমস্যা হয়েছে।