হাটে নেই দাম, ডোবায় ভাসছে পেঁয়াজ
লোকসানের ভারে দিশেহারা ফরিদপুরের কৃষক
- আপডেট সময় : ৩৭ বার পড়া হয়েছে
মাঠে ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত সোনালি ফসলের শেষ ঠিকানা এখন বাজার নয়, ডোবা-খাল কিংবা পুকুরের পানি। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় ফরিদপুরের সালথা উপজেলার কৃষকরা পানিতে ফেলে দিচ্ছেন পেঁয়াজ। উৎপাদন খরচের তুলনায় অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্বে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা।
সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবায় কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দেওয়ার দৃশ্য স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য কৃষকের দুর্দশার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
কৃষক দাউদ মাতুব্বর জানান, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কারণে ওজনও কমে যায়। ফলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই ফেরত আসছে না।
একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, কৃষকের কান্না দেখার যেন কেউ নেই। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে একসময় মানুষ কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কৃষক বাঁচলে দেশের কৃষিও বাঁচবে।
শুধু সালথা নয়, ফরিদপুরের নগরকান্দা, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে পড়েছেন। ভালো ফলন হলেও বাজারে দাম না থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসানের বোঝা টানছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষ করবেন কি না, তা নিয়েই সংশয়ে রয়েছেন।
অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। ফলে দাম কমেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সালথায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। উপজেলার ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা বলছেন, গড় হিসেবে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়ে প্রায় ২৪ টাকা। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে নয়।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, কৃষক ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কষ্টে আছেন, বিষয়টি জানা রয়েছে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে তুলে ধরা হবে।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে। সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।
কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশায় কৃষকরা পেঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে ভবিষ্যতে দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
















