ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রথমবার সাগরে, আর ফেরা হলো না আক্কাসের
- আপডেট সময় : ১৫ বার পড়া হয়েছে
সংসারের অভাব, মাথার ওপর ঋণের চাপ এবং একটি অটোরিকশা (বোরাক) কেনার স্বপ্ন—এই তিনটি কারণেই ২৫ বছর বয়সী মো. আক্কাস প্রথমবারের মতো গভীর সাগরে মাছ ধরতে যান। কিন্তু সেই যাত্রাই যেন হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ যাত্রা। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারডুবির প্রায় তিন দিন পার হলেও আক্কাসসহ ছয় জেলে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
গত রোববার রাতে কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উত্তাল বঙ্গোপসাগরে প্রবল স্রোত ও কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউয়ের আঘাতে একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে দুজন বাইরে থাকলেও বাকি নয়জন ব্রিজের ভেতরে আটকা পড়েন। তাদের মধ্যে ছয়জন বের হতে সক্ষম হলেও তিনজন বের হতে পারেননি। পরে পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও আক্কাসসহ ছয়জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজরা হলেন—এমাদুল খাঁ (৪৫), হারুন হাওলাদার (৪৫), ফোরকান সিকদার (৫৫), সায়েম (২০), আল-আমিন (২২) এবং মো. আক্কাস (২৫)।
গলাচিপা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরাস্তা মসজিদসংলগ্ন আক্কাসের ভাড়া বাসায় এখন শুধুই অপেক্ষা আর কান্না। মা শাহানাজ বেগম সন্তানের ফেরার আশায় অশ্রুসিক্ত চোখে দিন গুনছেন। স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম স্বামীর শোকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আর সাড়ে তিন বছরের ছেলে আলভি বুঝতেই পারছে না কী ঘটেছে। সে শুধু তার নানাকে ফোন করে বারবার বলছে, “বাবাকে নিয়ে আসো।”
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাবার মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ঢাকার একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন আক্কাস। পরে গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামে নানাবাড়ির সুবাদে বসবাস শুরু করেন। ছয় বছর আগে তিনি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মরহুম নাসির উদ্দীনের মেয়ে প্রাপ্তি বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আলভি নামে সাড়ে তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
আক্কাসের খালা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা. ফারআনা জানান, প্রায় ৬০ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধ এবং একটি বোরাক কেনার স্বপ্ন পূরণের আশায় প্রথমবারের মতো জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরার ট্রলারে যোগ দেন আক্কাস। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই প্রথম সমুদ্রযাত্রাই তাকে নিখোঁজের তালিকায় ঠাঁই করে দিয়েছে।
স্ত্রী প্রাপ্তি বেগম বলেন, “অভাবের কারণে আর কোনো উপায় ছিল না। লোনের টাকা শোধ করতে প্রথমবার সাগরে গিয়েছিল। ও ভালোভাবে সাঁতারও জানত না। এখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই, অন্তত ওর একটা খোঁজ যেন পাই।”
শ্বশুর হানিফ মিয়া জানান, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই তিনি কুয়াকাটা উপকূলের গঙ্গামতি, হাসাখালী, চাপালীসহ বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জামাইয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।
দিন যত গড়াচ্ছে, পরিবারের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এখন স্বজনদের একটাই আকুতি—যদি জীবিত ফিরে না-ও আসে, অন্তত যেন আক্কাসের মরদেহটি উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
















