ঢাকা ০৬:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬

পাটুরিয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিসি’র চাঁদাবাজি ব্যবস্থা নিতে দায়সারা বক্তব্য

ছাবিনা দিলরুবা, মানিকগঞ্জ
  • আপডেট সময় : ৪৪ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিআইডব্লিউটিসি’র মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে সরকার নির্ধারিত ভাড়া তোয়াক্কা না করে ট্রাক চালকদের জিম্মি করে গড়ে উঠেছে ‘দুর্নীতি সিন্ডিকেট’। বিআইডব্লিউটিসি’র এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই চক্রটি প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা,মাসে লাখ লাখ টাকা এবং বছরে কোটি কোটি টাকা। দুর্নীতির প্রমাণ হাতে আসার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার প্রক্রিয়ায় দায়সারা বক্তব্য দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাটুরিয়া ঘাটের এই বিশাল চাঁদাবাজি চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন বিআইডব্লিউটিসি’র কাউন্টার টিম লিডার রায়হান উদ্দিন, শাহ আলম ও নিজাম উদ্দিনের গ্রুপ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে রসিদ ছাড়াই অতিরিক্ত ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী চালক জসিম সিকদার ও তাজমির জানান, তারা অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হন, অন্যথায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়ালে আটকে রাখা হয় অথবা শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকে। মুরগির বাচ্চা বা জরুরি পণ্যের দোহাই দিয়ে ১৫৫০ টাকার পরিবর্তে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
অনুসন্ধান চলাকালীন টিম লিডার রায়হান উদ্দিন সাংবাদিকদের সামনে প্রতিটি গাড়ি থেকে অতিরিক্ত ৫০ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তিনি ভোল পাল্টাতে শুরু করেছেন। নিজেকে বাঁচাতে তিনি এখন দাবি করছেন, ওই সময় তিনি ডিউটিতে ছিলেন না। অথচ অনুসন্ধানী টিমের কাছে তার স্বীকারোক্তির প্রমাণ সংরক্ষিত আছে।
শুধু তাই নয়, দুর্নীতির দায় থেকে বাঁচতে রায়হান উদ্দিন এখন রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক প্রলোভনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ খেলছেন। পাবনার এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের ধমক দেওয়ার পাশাপাশি সংবাদটি প্রত্যাহার কিংবা প্রতিবাদ ছাপানোর জন্য আর্থিক সুবিধার প্রস্তাবও দিয়েছেন। এমনকি কতিপয় সাংবাদিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে অনবরত ফোন করিয়ে ‘বসে নেগোসিয়েশন’ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
এই নগ্ন দুর্নীতির বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুস সালামের বক্তব্য সাধারণ মানুষকে হতবাক করেছে। দুর্নীতির দায় স্বীকারকারী এবং প্রমাণ থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত দায়সারাভাবে বলেন, “তাদের ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।”
সচেতন মহল ও পরিবহন শ্রমিকদের মতে, যেখানে দুর্নীতির সরাসরি স্বীকারোক্তি রয়েছে, সেখানে বিভাগীয় মামলা বা সাময়িক বরখাস্তের পরিবর্তে কেবল ‘সতর্কবাণী’ দেওয়া প্রকারান্তরে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। আরিচা সেক্টরের প্রধান হিসেবে ডিজিএম-এর এই রহস্যজনক নীরবতা এবং শাস্তির পরিবর্তে প্রশ্রয়মূলক আচরণ ইঙ্গিত দেয় যে, এই চাঁদাবাজির টাকার ভাগ কেবল কাউন্টারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শেকড় অনেক গভীরে।
পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পাটুরিয়া ঘাটের এই চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুসংগঠিত ‘চেইন অব কমান্ড’। কাউন্টার থেকে সংগৃহীত এই অতিরিক্ত টাকার ভাগ আনসার সদস্য থেকে শুরু করে ঘাট ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে যায় বলেই কেউ অভিযোগ আমলে নেয় না।
অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যে ‘ম্যানেজ’ করার নীতি গ্রহণ করেছেন, তা মূলত সংবাদমাধ্যমকে থামিয়ে দিয়ে পুনরায় নির্বিঘ্নে দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। এই চক্রটি এতই শক্তিশালী যে, প্রতিবাদী চালকদের ভয় দেখাতে তারা স্থানীয় ক্যাডার বাহিনী ব্যবহারের হুমকিও দিয়ে থাকে।
পাটুরিয়া ঘাটের এই ‘ওপেন সিক্রেট’ চাঁদাবাজিতে সাধারণ ট্রাক চালকরা আজ দিশেহারা। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। বিআইডব্লিউটিসি’র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই ‘ম্যানেজ সংস্কৃতি’ ও ‘দায়সারা সতর্কবার্তা’ বন্ধ না হলে পাটুরিয়া ঘাট দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। ভুক্তভোগী ও সচেতন সমাজ এখন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এই চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট নির্মূলের দাবি জানিয়েছেন।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

পাটুরিয়া ঘাটে বিআইডব্লিউটিসি’র চাঁদাবাজি ব্যবস্থা নিতে দায়সারা বক্তব্য

আপডেট সময় :

বিআইডব্লিউটিসি’র মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে সরকার নির্ধারিত ভাড়া তোয়াক্কা না করে ট্রাক চালকদের জিম্মি করে গড়ে উঠেছে ‘দুর্নীতি সিন্ডিকেট’। বিআইডব্লিউটিসি’র এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই চক্রটি প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা,মাসে লাখ লাখ টাকা এবং বছরে কোটি কোটি টাকা। দুর্নীতির প্রমাণ হাতে আসার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার প্রক্রিয়ায় দায়সারা বক্তব্য দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাটুরিয়া ঘাটের এই বিশাল চাঁদাবাজি চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন বিআইডব্লিউটিসি’র কাউন্টার টিম লিডার রায়হান উদ্দিন, শাহ আলম ও নিজাম উদ্দিনের গ্রুপ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে রসিদ ছাড়াই অতিরিক্ত ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী চালক জসিম সিকদার ও তাজমির জানান, তারা অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হন, অন্যথায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়ালে আটকে রাখা হয় অথবা শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাকে। মুরগির বাচ্চা বা জরুরি পণ্যের দোহাই দিয়ে ১৫৫০ টাকার পরিবর্তে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
অনুসন্ধান চলাকালীন টিম লিডার রায়হান উদ্দিন সাংবাদিকদের সামনে প্রতিটি গাড়ি থেকে অতিরিক্ত ৫০ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তিনি ভোল পাল্টাতে শুরু করেছেন। নিজেকে বাঁচাতে তিনি এখন দাবি করছেন, ওই সময় তিনি ডিউটিতে ছিলেন না। অথচ অনুসন্ধানী টিমের কাছে তার স্বীকারোক্তির প্রমাণ সংরক্ষিত আছে।
শুধু তাই নয়, দুর্নীতির দায় থেকে বাঁচতে রায়হান উদ্দিন এখন রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক প্রলোভনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ খেলছেন। পাবনার এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের ধমক দেওয়ার পাশাপাশি সংবাদটি প্রত্যাহার কিংবা প্রতিবাদ ছাপানোর জন্য আর্থিক সুবিধার প্রস্তাবও দিয়েছেন। এমনকি কতিপয় সাংবাদিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে অনবরত ফোন করিয়ে ‘বসে নেগোসিয়েশন’ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
এই নগ্ন দুর্নীতির বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুস সালামের বক্তব্য সাধারণ মানুষকে হতবাক করেছে। দুর্নীতির দায় স্বীকারকারী এবং প্রমাণ থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত দায়সারাভাবে বলেন, “তাদের ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।”
সচেতন মহল ও পরিবহন শ্রমিকদের মতে, যেখানে দুর্নীতির সরাসরি স্বীকারোক্তি রয়েছে, সেখানে বিভাগীয় মামলা বা সাময়িক বরখাস্তের পরিবর্তে কেবল ‘সতর্কবাণী’ দেওয়া প্রকারান্তরে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। আরিচা সেক্টরের প্রধান হিসেবে ডিজিএম-এর এই রহস্যজনক নীরবতা এবং শাস্তির পরিবর্তে প্রশ্রয়মূলক আচরণ ইঙ্গিত দেয় যে, এই চাঁদাবাজির টাকার ভাগ কেবল কাউন্টারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শেকড় অনেক গভীরে।
পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পাটুরিয়া ঘাটের এই চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুসংগঠিত ‘চেইন অব কমান্ড’। কাউন্টার থেকে সংগৃহীত এই অতিরিক্ত টাকার ভাগ আনসার সদস্য থেকে শুরু করে ঘাট ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে যায় বলেই কেউ অভিযোগ আমলে নেয় না।
অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যে ‘ম্যানেজ’ করার নীতি গ্রহণ করেছেন, তা মূলত সংবাদমাধ্যমকে থামিয়ে দিয়ে পুনরায় নির্বিঘ্নে দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়ার একটি কৌশল। এই চক্রটি এতই শক্তিশালী যে, প্রতিবাদী চালকদের ভয় দেখাতে তারা স্থানীয় ক্যাডার বাহিনী ব্যবহারের হুমকিও দিয়ে থাকে।
পাটুরিয়া ঘাটের এই ‘ওপেন সিক্রেট’ চাঁদাবাজিতে সাধারণ ট্রাক চালকরা আজ দিশেহারা। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। বিআইডব্লিউটিসি’র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই ‘ম্যানেজ সংস্কৃতি’ ও ‘দায়সারা সতর্কবার্তা’ বন্ধ না হলে পাটুরিয়া ঘাট দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। ভুক্তভোগী ও সচেতন সমাজ এখন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এই চাঁদাবাজদের সিন্ডিকেট নির্মূলের দাবি জানিয়েছেন।