আইনশৃংখলা বাহিনীর পোশাক খোলা মার্কেটে
দরজায় কড়া নাড়ার অতঙ্ক!
- আপডেট সময় : ১৪৭ বার পড়া হয়েছে
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পোশাক পরে ডাকাতির ঘটনায় জনমনে শঙ্কা ও উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে বড় ব্যবসায়ীরা রয়েছেন অনেকটা আতঙ্কে। অভিযানের কথা বলে কে কখন বাসায় কড়া নাড়ে সে ভয়ও কাজ করছে অনেকের মধ্যে। এদিকে সেনা র্যাব ডিবি বিজিবি ও পুলিশের পোষাক থেকে শুরু কওে সকল সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে খোলা বাজারে। রাজধানীর একাধিক অভিজাত মার্কেটে গিয়ে পরিচয়পত্র প্রর্দশন করে অপরাধিরা কিনে নিচ্ছে পোষাক ও এ সকল সরঞ্জাম!
গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর ডেমরা থেকে ডাকাত দলের দুজন সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। দুজনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড গুলি, একটি মাইক্রোবাস, দুটি ভুয়া নম্বর প্লেট, ছয়টি র্যাবের কটি, দুটি হ্যান্ডকাপ, একটি ওয়াকিটকি, ‘পুলিশ’ লেখা স্টিকার, একটি লেজার লাইট, দুটি পুলিশ বাটন, একটি পকেট ওয়াইফাই রাউটার, ৩১টি সেনাবাহিনীর মাস্ক এবং দুটি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর অভিজাত বিপনিবিতান পলওয়েল মার্কেটসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের আশেপাশের মার্কেটে সেনাবাহিনীর পোশাক কিনতে পাওয়া যায়। এক ধরনের অসৎ ব্যবসায়ী অতি মুনাফার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর এসব পোশাক বিক্রি করেন। যাদের কাছে বিক্রি করে তাদের বেশিরভাগই অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। রাজধানীর কচুক্ষেতে সেনাবাহিনীর পোশাক বিক্রি করে কিছু ব্যবসায়ী। শুধু সেনাবাহিনীর পোশাকই নয়, পুলিশ, ডিবি, র্যাব এমনকি বিজিবির পোশাক, ক্যাপ, হেলমেট, আইডি কার্ডও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হয়। অপরাধী চক্রের কিছু নির্দিষ্ট দোকান রয়েছে, সেখান থেকেও তারা এসব পোশাক বেশি দামে সংগ্রহ করে থাকে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিভিন্ন বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত সদস্যরা বাহিনীর পোশাক কোথায় কীভাবে কিনতে পাওয়া যায় তারা আগে থেকেই জানে। এছাড়া অস্ত্র-ওয়াকিটকি ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মতো কীভাবে অভিযান চালানো হয়, সে সম্পর্কেও ধারণা রয়েছে তাদের।
র্যাব জানায়, রাজধানীর ডেমরায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তাদের কাছে থাকা থানা থেকে লুট হওয়া হ্যান্ডকাপ, বিদেশি পিস্তল, গুলি, র্যাবের কটি, ওয়াকিটকি সেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী এসব তথ্য জানান।
র্যাব জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাস থামিয়ে কখনও র্যাব, কখনও পুলিশের পরিচয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করত। অনেক সময় তারা যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানোর ভান করে সেনাবাহিনীর মাস্ক ব্যবহার করত।
ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে শুক্রবার সকালে ডেমরা থানাধীন আমান মার্কেট, মেন্দিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. আলামিন ওরফে মোটা আলামিনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বেলা ১১টার দিকে হাজী সিএনজি পাম্প এলাকা থেকে তার সহযোগী রায়হানকে আটক করা হয়।
তিনি আরও জানান, দুজনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড গুলি, একটি মাইক্রোবাস, দুটি ভুয়া নম্বর প্লেট, ছয়টি র্যাবের কটি, দুটি হ্যান্ডকাপ, একটি ওয়াকিটকি, পুলিশ লেখা স্টিকার, একটি লেজার লাইট, দুটি পুলিশ বাটন, একটি পকেট ওয়াইফাই রাউটার, ৩১টি সেনাবাহিনীর মাস্ক এবং দুটি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়।
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, আলামিন এই চক্রের নেতৃত্ব দিতেন। একসময় তিনি ইট-বালু ও মুরগির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে বন্ধ। অন্যদিকে রায়হান পেশায় চালক এবং ডাকাতির সময় যানবাহন সরবরাহ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন, পালানোর পরিকল্পনা এবং লুটের মালামাল পরিবহনের কাজেও যুক্ত ছিলেন।
আলামিনের বিরুদ্ধে এর আগে একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৭১ লাখ টাকা র্যাব পরিচয়ে ডাকাতির মামলার আসামি তিনি। এছাড়া ২০২৫ সালে একটি ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তার বিরুদ্ধে খিলগাঁও, কেরানীগঞ্জ, মুগদা, টাঙ্গাইল সদর এবং নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ডাকাতি, চুরি ও অস্ত্রসহ মোট আটটি মামলা রয়েছে।
অপরদিকে সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গভীর রাতে সেনাবাহিনী ও র্যাবের পোশাক পরে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল একটি বাসা থেকে সাড়ে ৭৫ লাখ টাকা ও ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে। অন্তর্বর্তী সরকারের দুই মাসের মাথায় এমন সংবাদ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যদিও এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও র্যাব। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে পাঁচজনই হলো বিভিন্ন বাহিনীর চাকরিচ্যুত সদস্য।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক বলেন, পুলিশের পোশাক বিক্রয়যোগ্য নয়। পুলিশের পোশাক যারা বিক্রি করছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিজিবির মিডিয়া উইংয়ের উপ-মহাপরিচালক কর্নেল মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলেন, নির্দিষ্ট মাধ্যমে বিজিবির ইউনিফর্ম সাপ্লাই দেওয়া হয়। বাইরের কোনো দোকানে কিনতে পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ডাকাতিতে জড়িতরা কীভাবে সেনাবাহিনী ও র্যাবের পোশাকসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি পেলো সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, কচুক্ষেতসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টগুলোতে সেনাবাহিনীর পোশাক কিনতে পাওয়া যায়। এটা বিক্রি নিষিদ্ধ। যারা বিক্রি ও নকল তৈরি করে, এমন অনেকের বিরুদ্ধে অভিযানও পরিচালনা হয়েছিল।


















