দেশীয় খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষার উদ্যোগ
সীমান্তে জোর নজরদারি
- আপডেট সময় : ১৯৭ বার পড়া হয়েছে
আসন্ন ঈদ উল আজহা ঘিরে যশোরের বেনাপোল সীমান্তসহ দেশের সকল সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সীমান্তে সকল বর্ডার আউট পোষ্ট (বিওপি) নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দেশের সীমান্তবর্তী সকল জেলার এসপি ও সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের সতর্ক বার্তা দেয়া হয়েছে।
এদিকে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ ভাবে গরু ও কোরবানির পশুর চামড়া চোরাচালান ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী সকল জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের ক্ষুদে বার্তায় অবগত করানো হয়েছে। পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বলছে, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সীমান্তজুড়ে টানা নজরদারি চলছে। দেশীয় পশু উৎপাদকদের ক্ষতি রোধে সীমান্তে কোনো অবৈধ গরু প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এছাড়া ঈদের পরে চামড়া পাচার রোধেও বিজিবি কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।
এদিকে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর কোনো ঘাটতি হবে না বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে এক কোটিরও বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে, ফলে আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই। গতকাল রোববার সচিবালয়ের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত আসন্ন ঈদুল আজহা উদযাপন উপলক্ষে কোরবানির পশুর চাহিদা নিরূপণ, সরবরাহ এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোরবানির পশুর অবাধ চলাচল ও পরিবহন নিশ্চিতকল্পে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা জানান। তিনি বলেন, সরকারের কাছে থাকা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, খামারিদের কাছে গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ মিলিয়ে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বেশি। তাই এবার কোরবানির পশু নিয়ে কোনো সংকট বা ঘাটতির সম্ভাবনা নেই। মন্ত্রী বলেন, অতীতে কোরবানির সময় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পশু প্রবেশের কারণে দেশীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। তবে বর্তমানে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী হাটগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ করতে না পারে।
কোরবানির পশুর বাজার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, সারাদেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি হাট বসবে। এসব হাটে পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেটেরিনারি টিম মোতায়েন থাকবে। কোনো পশু অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হাটে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন বলেও জানান তিনি। পশু পরিবহনের সময় যাতে ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি থাকবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, তরুণ খামারিদের মধ্যে অনলাইনে পশু বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। এ ধরনের বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের খাজনা বা হাসিল আরোপ করা হবে না। চামড়া সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কোরবানির সময় চামড়া নষ্ট হওয়া রোধে কসাইদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে চামড়ার গুণগতমান বজায় রাখা সম্ভব হবে।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর মোট প্রাপ্যতা দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতি-যেমন উট, দুম্বা ইত্যাদি মোট ৫ হাজার ৬৫৫টি।
অন্যদিকে বিভাগীয় পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে কোরবানিযোগ্য পশুর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চলতি বছরে দেশে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। গত পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সম্ভাব্য প্রাপ্যতা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি। সে সময় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, ওই বছরে জবাইকৃত গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি, ফলে হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থেকে যায়।
অনুসন্ধান করে জানা গেছে, মহেশপুর উপজেলার শ্যামকুড় পূর্বপাড়া এলাকার ইদু শেখের ছেলে মোমিনুর শেখ, আনন্তপুর গ্রামের মনি মেম্বার, লড়াইঘাট গ্রামের রহিম মেম্বার, শ্যামকুড় পশ্চিমপাড়ার জহুরুল ইসলাম জুরু, স্বরুপপুর ইউনিয়নের হানিফপুরের জহু, স্বরুপপুর গ্রামের খেদের মেম্বার ভারতীয় গরু পাচারকারি হিসেবে কথিত আছে। এই চক্রটি বিএসএফের সহায়তায় সীমান্তের নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে গরু প্রবেশ করাচ্ছে।
সূত্র মতে, ভুটানি গরু ও ভারতের পান্ডুয়া বাজারের বিখ্যাত পান্ডু গরু ভারতের দক্ষিণ ২৪ পরগনার হাসখালি থানাধীন নদীয়া জেলার ওমরপুর, ছুটিপুর, ফতেহপুর, পাখি উড়া ও খাটুরা এলাকা হয়ে মহেশপুর উপজেলার লড়াইঘাটের হাড়িঘাটার দক্ষিণ পাশ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করার আশঙ্কা রয়েছে। এসব রুট মূলত রাতের আঁধারে ব্যবহার করা হয়।
সীমান্ত এলাকার মানুষ জানায়, গরু পাচারে বিএসএফের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন নয়। গরু পাচারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সীমান্ত এলাকার শরিফুল ইসলাম (ছদ্মনাম) জানান, মহাজনরা বাংলাদেশ থেকে বিএসএফের কাছে গরুর ছবি পাঠায়। বিএসএফ সবুজ সংকেত দিলে সন্ধ্যার আগেই তারা ভারতে অবস্থান নেয় এবং রাত গভীর হলে নির্দিষ্ট রুট ব্যবহার করে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে গরু পার করে দেয়। পাচারকৃত এসব গরু চুয়াডাঙ্গার শিয়ালমারি ও ডুগডুগির হাটে বিক্রি করা হয়।
ঝুঁঁকিপূর্ণ এই কাজে পারিশ্রমিক প্রসঙ্গে মহেশপুরের শরিফুল আরো জানান, ভারত থেকে একটি গরু সফলভাবে বাংলাদেশে আনতে পারলে সর্বোনিম্ন ৫০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। তবে গরুর জাত ও বাজারমূল্য ভেদে কখনো কখনো এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। এদিকে মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে গরু পাচারের সুযোগ সবচে বেশী। এ বছর ভারতীয় গরু পাচার হলে দেশীয় খামারিরা লোকসান গুনতে হবে। এ ভাবে চোরাই পথে যদি গরু আসতে থাকে তবে ঝিনাইদহের ১৮ হাজার খামারি পথে বসতে পারে বলে হরিণাকুন্ডুর হাফিজুর রহমান নামে এক খামারি জানান। গরু পাচারের সঙ্গে জড়িত মোমিনুর শেখ বলেন, গরু পাচারের বিষয়টি এখন আর আগের মতো নেই। একটা সময় ওপার থেকে গরু আসতো। এখন গরু পাচারের বিষয়টি কঠিন হয়ে গেছে।
গরু পাচার নিয়ে ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল আলম জানান, সীমান্ত দিয়ে গরু চোরাকারবারির বিষয়ে বিজিবি’র অবস্থান সর্বদা জিরো টলারেন্স নীতি। এ প্রেক্ষিতে সীমান্তে টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। গরু চোরাকারবারি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার জন্য সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
এবিষয়ে যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী এসপিপি, পিএসসি সাংবাদিকদের জানান, ঈদকে ঘিরে সীমান্ত দিয়ে গরু আসার চেষ্টা হতে পারে। এমন শঙ্কায় আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। কেউ যাতে অবৈধভাবে পশু আনতে না পারে, সেজন্য সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা টহলে রয়েছেন।
বিজিবি অধিনায়ক আরও জানান, সন্দেহজনক গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ডগ স্কোয়াড, চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সীমান্ত সুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা ও ঈদের নামাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে বিজিবি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, জনগণ যেন নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারে।
সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশে পুশ-ইন চালানোর অভিযোগ উঠলেও যশোর ব্যাটালিয়নের আওতায় থাকা সীমান্তগুলোতে এখনও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি। তবে এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তবাসীদের সহযোগিতায় সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো রকম গরু প্রবেশ বা চামড়া পাচারের মত ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না।

















