ডিবি পানির ট্যাংকিতে লাশ গুমের ২৭ বছর
সোর্স মানির বিরোধেই জালাল হত্যা
- আপডেট সময় : ২০১ বার পড়া হয়েছে
২ পুলিশ ও ডিবির ক্যান্টিন মালিকের যাবজ্জীবন
১৯৯৯ সালের মার্চের ঘটনা। রাজধানীর মিন্টুরোডের লাল দোতালা বিল্ডিংয়ে প্রধান ডিবি কার্যালয়। দোতালায় দুপাশে রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের দুই জোনের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়। পূর্ব পাশে তৎকালিন হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং পশ্চিমপাশে বসেন মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। তবে মিডিয়া বান্ধব হাসান মাহমুদের চেম্বারেই জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনের সাংবাদিকরা নিউজের সন্ধানে সেখানে যেতেন। সেদিনও ব্যতিক্রম ছিল না। উপস্থিত ছিলেন পারভেজ খান, ফখরুল আলম কাঞ্চন, কামরুল ইসলাম, শংকর কুমার দে, আমিনুর রহমান তাজ, গাফফার মাহমুদ আরো সিনিয়র অনেকে। দুপুরে বিস্কুটের সঙ্গে চা দেয়া হয়। পানি পান করার সময় তাজ ভাই বলেন, পানিতে দুর্গন্ধ পাচ্ছি। সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসান মাহমুদ খন্দকারও পানিতে দুর্গন্ধ পান। এরপরই বিকেলে এক সময় ছাদে পানির ট্যাংকিতে তল্লাশীর সময় সোর্স জালালের পচা মরদেহ দেখতে পান। এ ঘটনায় ডিবি কার্যালয়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। পরদিন সকাল থেকেই লাশ উদ্ধারের পক্রিয়া হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের ডোম শহিদুলসহ জনকে নেয়া হয়। লাশ উদ্ধারের পর মর্গে নেয়া হয়। মরদেহের সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে পচা লাশ সনাক্ত করা হয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহনগর পোয়েন্দা বিভাগের ইমেজ চরম ভাবে ক্ষুন্ন হয়। এই হত্যা মামলাটি তৎকালিন সিআইডির কর্মকর্তা মুন্সী আতিকুর রহমানকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। এই ঘটনাটি ছিল ওই সময়ের সবচে আলোচিত ঘটনা। ২৭ বছর পর এই জালাল হত্যা মামলায় দুই পুলিশসহ তিন জনের যাবজ্জীবন রায় দেন আদালতের বিচারক। তবে এঘটনার মুল নায়ক ডিবির পরিদর্শক জিয়াউল আহসানের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে শোনা যাচ্ছে না। জিয়াই জালালকে বাসা থেকে ডেকে আসে ডিবি কার্যালয়ে। এঘটনার পরই এ মামলায় এসি হুমায়ুন কবিরের টীমের সকল সদস্যকে গ্রেফতার করে আইনের কাঠগড়ায় দাড় করানো হয়। শুধু তাই নয়, ডিবির ক্যান্টিনে বসে জালালকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই শলাপরামর্শের সময় ক্যান্টির মালিক আনোয়ার হোসেনও ছিল। সিআইডি জড়িতদের রিমাণ্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর অভিযোগ পত্র দাখিল করলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন হিমাগারে ছিল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর মিন্টু রোডে ডিবি কার্যালয়ে সংঘটিত জালাল আহমেদ শফি হত্যা মামলায় দীর্ঘ ২৭ বছর পর রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে দুই পুলিশ সদস্যসহ তিন জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ এবং ডিবির ক্যান্টিন পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন। পাশাপাশি প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মোসাদ্দেক মিনহাজ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন। বিষয়টি রবিবার জানা যায়। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী সায়েদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, নিহত জালাল আহমেদ শফি পেশায় মাইক্রোবাস চালক ছিলেন এবং গোয়েন্দা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার মরদেহ গুম করা হলেও পরে তা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রথমে রমনা থানার তৎকালীন এক উপ-পরিদর্শক অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরবর্তীতে মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পর নিহতের ছেলে আব্বাস উদ্দিন ১৯৯৯ সালের ৪ এপ্রিল পৃথকভাবে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর সিআইডি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এতে বলা হয়, ডিবির কিছু সদস্য জালালকে ব্যবহার করে চোরাচালান সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতেন। তবে অভিযুক্তরা উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ ও মাদক নিজেদের দখলে রাখতেন এবং জালালকে তার প্রাপ্য অংশ দিতেন না। এ নিয়ে বিরোধের জেরে ১৯৯৯ সালের মার্চে তাকে বাসা থেকে ডেকে এনে হত্যা করে ডিবি কার্যালয়ের ছাদে পানির ট্যাংকিতে লাশ গুস করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

















