রেকর্ড বিদ্রোহী প্রার্থী ১৯০ জনেরও বেশি
দ্বিমুখী চাপে বিএনপি
- আপডেট সময় : ১৯৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক ময়দানে পড়েছে ভেতর ও বাহির দ্বিমুখী চাপে। একদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। এই টানাপোড়েন দলের সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা, ভোটের সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের ঐক্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ১৯০ জনেরও বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচনী মাঠে নামায় শুধু কেন্দ্র নয়, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও তীব্র বিরোধ ও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলীয় বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই দুর্বল হচ্ছে দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের প্রতি আস্থা যা বিএনপির জন্য নির্বাচনী লড়াইকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিএনপি নেতৃত্ব এখন এসব বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিহাতে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। যারা দলীয় সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করতে চান, তাদের দল থেকে বহিষ্কারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং সম্ভাব্য বিভাজন এড়ানো। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, এক বিরোধী দলের মধ্যে যদি বিরোধী মনোভাবের নেতারা নিজেরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে সেটি ভোট কাটাছাঁটাই এবং সমন্বয়ের অভাবে কেন্দ্রীয় নীতি ও প্রচারণাকে দুর্বল করবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর দলটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানা, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম (নীরব) ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনসহ ৯ জনকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম ও হাসান মামুন তিনজনই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। রুমিন ফারহানার এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি।
সাইফুল আলমকে প্রাথমিকভাবে ঢাকা-২ আসনের জন্য প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছিল বিএনপি। পরে আরেক জোট শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ওই আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এরপর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সাইফুল আলম। আর ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি হাসান মামুনের বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। গলাচিপা-দশমিনা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী–৩ আসনটি যুগপৎ আন্দোলনের আরেক শরিক দল গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালিয়ে আসা হাসান মামুনও সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারবেন প্রার্থীরা। এরপর ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। দলের নেতারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন বলে আশাবাদী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যানের নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, তফসিলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের যে শেষ সময় দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন। আর তা না হলে ওই নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা আহ্বান জানিয়েছি তাঁদের যে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি যেন তাঁরা শ্রদ্ধাশীল হয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। আমরা আশা করছি যে তাঁরা প্রত্যাহার করবেন। অনেকেই অলরেডি (ইতিমধ্যে) প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন আমাদের। তো সে জন্য আমি মনে করি, প্রত্যাহার করার সময়ের মধ্যেই এই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়ে যাবে। নইলে দল তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।
দীর্ঘদিন বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে প্রভাবশালী এই নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও এলাকায় দলের নেতা কর্মীদের বড় অংশ তাঁদের পক্ষেই অবস্থান নিচ্ছেন। এটা প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন জোট শরিক দলের এক নেতা। অনেক পুরনো ও শক্ত অবস্থানের নেতার নাম প্রার্থী তালিকায় না থাকায় দলের অভ্যন্তরীণ স্তরে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব নেতা দীর্ঘদিন জেলা বা বিভাগীয় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন, তাদের বাদ পড়া কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি নেতৃত্ব একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও কেন্দ্রীকৃত সিদ্ধান্তে এগিয়ে যেতে চায়, অন্যদিকে অনেক নেতাই মনে করেন নিজেদের নির্বাচনী শক্তি আছে বলে স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করা উচিত। এই দ্বন্দ্ব দলকে ভেতর থেকেই এলোমেলো করছে। অনেকে যুক্তি দেন, যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রার্থীদের ওপর জিরো টলারেন্স নীতির জোর প্রয়োগ খুব শক্তভাবে করে, তাহলে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তেই প্রার্থীতা নির্ধারণ হবে, যা দলীয় শৃঙ্খলা শক্ত করবে সম্ভবত কিন্তু গ্রাসরুট স্তরে নেতাদের ক্ষোভ ও মতভেদ তৈরি করবে। আবার অনেকে ঠেকাচ্ছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার মতো অনেকেই হয়তো দলের জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিগত আস্থার জোরে জয় দিতে পারে, এমন আশা নিয়ে এগোচ্ছেন।
দলের মাঝে বিদ্রোহী প্রার্থীর বাড়াবাড়ি শুধু ইগো ইস্যু নয়, বরং ভোট বণ্টন ও সমর্থনেও বিভাজন ঘটাচ্ছে। ধর্মীয় ও এলাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছু নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াইতে সমর্থকরা বিভক্ত হচ্ছে। ফলে ভোটের মাঠে দলীয় সমন্বয় দুর্বল হচ্ছে, যা বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার বিপরীতে অনেক নেতা মনে করছেন, নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে নিজেদের শক্তিশালী প্রার্থীকে মাঠে রাখতে দিতে হবে বিরোধী দল থেকেও। এ কারণেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে, দলীয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছেন, বিভক্তি কোনোভাবেই দলকে সহায়ক হবে না। এজন্য জিরো টলারেন্স নীতিই দীর্ঘ মেয়াদি দলীয় স্থিতিশীলতা ও সমন্বয়ের পথে এক মাত্র উপায় বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই ১৯০ জন প্রার্থীর বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থেকে যান, তবে বিএনপির ভোট ব্যাংক কয়েক ভাগে বিভক্ত হবে। এর সরাসরি সুফল পাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। বিশেষ করে জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া ১৪টি আসনে যদি বিদ্রোহীরা শক্তিশালী থাকে, তবে জোটের ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল ধরবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ২০ জানুয়ারির মধ্যে এই বিদ্রোহীদের নিবৃত্ত করা। বিএনপি যদি এই ‘গলার কাঁটা’ উপড়ে ফেলতে না পারে, তবে আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দলটির জন্য এখন শাঁখের করাত অবস্থা- একদিকে দলের নেতাদের ত্যাগ করা, অন্যদিকে জোটের শর্ত রক্ষা করা। শেষ পর্যন্ত দলের হাই-কমান্ড এই বিদ্রোহী দাবানল কতটা নেভাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচনে বিএনপির ফলাফল।
























