৬ই ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত দিবস
- আপডেট সময় : ২৬৩ বার পড়া হয়েছে
ফেনী প্রতিনিধি
পাক হানাদার মুক্ত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা স্বরনীয় দিন ৬ই ডিসেম্বর । দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও তীব্র গেরিলা অভিযানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানী দখলদার হটিয়ে এবং পরাজিত করে মুক্তিযোদ্ধারা এদিন ফেনীকে সন্পুর্ন হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন। পুর্ব বাংলার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী ছিল হানাদার বাহিনীর জন্য এই ফেনী ছিল একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক রুট, চট্টগ্রামের সাথে কুমিল্লা যোগাযোগের ফ্রন্ট রক্ষার প্রধানতম ঘাঁটি। ফলে এই ফেনীর বিলোনিয়া থেকে শুভপুর পযন্ত একের পর এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ সমর যুদ্ব সংঘটিত হয়েছে এই জেলায় , অগনিত মানুষ নারী শিশু সহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ কারীরা প্রাণ হারিয়েছে এবং অসংখ্য পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই শুভপুর, বিলোনিয়া, ছাগলনাইয়া, লেমুয়া ও মহিপাল এলাকায় মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুভপুরে লে. কর্নেল জাফর ইমাম, শামসুল আলম, রুহুল আমিনসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর অগ্রযাত্রা আটকে দেন। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয় সীমান্তঘেঁষা বিলোনিয়ায়। ক্যাপ্টেন আফসার, মহিউদ্দিন, খাজা আহম্মদ, শ্যামল বিশ্বাস, আবদুল মোতালেব, কাজী নুর নবীসহ অসংখ্য বীরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক আক্রমণ চালান। টানা লড়াইয়ের পর পাকিস্তানি সেনারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে পশ্চাদপসরণ করলে ফেনী শহরের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে।
এরপর ছাগলনাইয়া, লেমুয়া ও মহিপালে মুক্তিযোদ্ধারা রাত্রিকালীন গেরিলা হামলা পরিচালনা করেন। লেমুয়ার সেতুতে মাইন বিস্ফোরণে পাকিস্তানি বাহিনীর সাপ্লাই লাইন বিচ্ছিন্ন হয়। ছাগলনাইয়ায় অতর্কিত হামলায় বহু পাকসেনা হতাহত হয়। মহিপালের গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্টে আক্রমণ চালিয়েও মুক্তিবাহিনী হানাদারদের অবস্থান দুর্বল করে দেয়। এসব ধারাবাহিক আক্রমণে ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর হানাদারদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়তে থাকে।
যুদ্ধকালজুড়ে রাজাকার–আলবদর বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী হিসেবে ফেনী শহর ও গ্রামাঞ্চলে হত্যা, লুটপাট ও ধরপাকড় চালায়। ফেনী কলেজকে তারা ব্যবহার করে ঘাঁটি হিসেবে, যা পরিণত হয়েছিল এক চরম বধ্যভূমিতে। মুক্তিযোদ্ধা–শিক্ষক মুজিবর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী—মুক্তির পর কলেজ মাঠ, রেললাইন সংলগ্ন ডোবা ও অডিটোরিয়াম এলাকার নিচ থেকে অসংখ্য মরদেহ ও মানব অস্থি উদ্ধার করা হয়। নিহত মানুষের সঠিক সংখ্যা আজও অজানা।
৬ ডিসেম্বর সকালেই শহরময় ছড়িয়ে পড়ে ‘ফেনী মুক্ত’ হওয়ার সংবাদ। প্রথমে অনেকেই সংবাদটি বিশ্বাস না করলেও পরে মুক্তিযোদ্ধাদের শহরে প্রবেশ করতে দেখে জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। লে. কর্নেল জাফর ইমাম তাঁর গ্রন্থ ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’–তে লিখেছেন—ফেনী শহরে প্রবেশের মুহূর্তে চারদিক মানুষের কান্না, আলিঙ্গন আর বিজয়ের উল্লাসে মুখরিত হয়ে ওঠে। খাজা আহম্মদ, ক্যাপ্টেন মুজিবুর রহমান খান, ছাত্রনেতা জয়নাল আবদীন হাজারীসহ বহু নেতা–যোদ্ধা সেদিন এই বিজয়যাত্রায় অংশ নেন। ভারতীয় সেনারাও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী।
ফেনীর এই দীর্ঘ সংগ্রামে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জেলার ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হন—৪ জন বীরউত্তম, ৭ জন বীরবিক্রম ও ২০ জন বীরপ্রতীক।
এ বছরও ৬ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে রেলী শহীদ বধ্যভুমিতে পুস্পমাল্য অর্পন সহ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা ও বিভিন্ন সংগঠন শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, প্রার্থনা ও দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ফেনীর অবদান শুধু একটি জেলার গল্প নয়—এটি স্বাধীন বাংলাদেশের বীরত্ব, ত্যাগ ও মুক্তির অমর অধ্যায়। এই ফেনীকে কেন্দ্র করেই মুক্তি যুদ্ধের সফলতা তরান্বিত হয়েছে । যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে চট্রগ্রাম সন্পুন্ন বেকায়দা পড়ে কারণ ওর্য়ালেসের মুল পয়েন্ট ফেনীতেই ছিল যার কারনে সকল যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়ে ।























